ফের দখল হচ্ছে ফুটপাত
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ মে ২০২৬, ১:৩২:২২ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার: ফের হকারদের দখলে সিলেট নগরের ফুটপাত। সন্ধ্যা নামলেই ব্যস্ত সড়কগুলো যেন বদলে যায় অস্থায়ী বাজারে। ফুটপাতজুড়ে সারি সারি কাপড়, জুতা, প্রসাধনী, ফলমূল আর নিত্যপণ্যের পসরা। কোথাও হাঁটার জায়গা নেই, কোথাও আবার ফুটপাত ছেড়ে মানুষকে নামতে হচ্ছে মূল সড়কে। যানজট, ভোগান্তি আর বিশৃঙ্খলার মাঝে চলছে সিলেটবাসীর প্রতিদিনের লড়াই।
সবজি ও মাছ বিক্রেতাদের কেউ কেউ সিসিকের হকার শেডে গেলেও ভাসমান অন্যান্য ব্যবসায়ীদের বড় অংশ আবার ফুটপাতেই অবস্থান করছেন। ফলে প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগ পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না।
‘অভিযান-আটক-পণ্যজব্দ’ কোনো ভাবেই হকারদের বাগে আনতে পারছে না প্রশাসন। নগরের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই দেখা যায় প্রশাসন আর হকারদের এক অদ্ভুত ‘চোর-পুলিশ’ খেলা। পুলিশ কিংবা সিটি করপোরেশনের অভিযান শুরু হলেই মুহূর্তে গুটিয়ে যায় দোকান। কয়েক মিনিট পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতেই আবার দখলে চলে যায় ফুটপাত। অভিযোগ রয়েছে, অভিযানে জব্দ পণ্য পুলিশ ও প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মচারীর যোগসাজশে ফেরত আসেন ভাসমান ব্যবসায়ীরা। তাই তাদের দমানো যাচ্ছে না বলে মনে করছেন অনেকে।
বিশেষ করে জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, তালতলা, কোর্ট পয়েন্ট ও আম্বরখানা এলাকায় সন্ধ্যার পর ফুটপাতের বড় অংশ চলে যায় ভাসমান হকারদের নিয়ন্ত্রণে।
গতকাল শনিবার বিকেলে নগরের জিন্দাবাজার এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামন থেকে কোর্টপয়েন্ট পর্যন্ত পুরোটা ফুটপাত হকারদের দখলে। আবার সড়কের একাংশ অবৈধ লেগুনা ও সিএনজি চালিত অটোরিকশার দখলে। ফুটপাতে হাঁটার জায়গা না থাকায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে সড়কে নামছেন। কেউ কোনোমতে হকারদের পাশ কাটিয়ে হাঁটার জায়গা বের করছেন।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে পথচারীদের অনেকেই বলছেন, ফুটপাত মানুষের চলাচলের জন্য হলেও বাস্তবে সেটি এখন অস্থায়ী বাজারে পরিণত হয়েছে। বাধ্য হয়ে সড়কে হাঁটতে গিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
ফুটপাতে কাপড় বিক্রি করা হকার মিজান বলেন, ‘দিনে দুই-তিনবার দৌড়াতে হয়। পুলিশ এলে মালামাল নিয়ে পালাই, আবার চলে এলে বসি। না বসলে সংসার চলবে না।’
সিলেট সিটি করপোরেশন হকারদের জন্য নির্ধারিত শেড তৈরি করলেও সেখানে যেতে আগ্রহী নন অনেক ভাসমান ব্যবসায়ী। বিশেষ করে কাপড়, জুতা ও ফ্যাশনপণ্য বিক্রেতারা বলছেন, হকার শেডে ক্রেতা কম।
এক হকার জানান, ‘রাত ৯টার পর মিউনিসিপালিটি মার্কেট বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ওই এলাকায় মানুষ কমে যায়। আবার হকার শেডে অনেকটা পথ ঘুরে আসতে হয়। আর উল্টোপথে যাতায়াত বন্ধ থাকায় ক্রেতারা সহজে আসতে চান না। তাই বাধ্য হয়ে রাস্তায় বসতে হয়।’
নগরের মজুমদারি এলাকার বাসিন্দা হকার মার্কেটের ব্যবসায়ী ইমরান আহমদ জীবন বলেন, ‘হকারদের পুনর্বাসনে সিসিকের যে হকারশেড তাতে দেখা যায়, বাজারের মুখেই হকার বসে আছেন। রাস্তায় যেমন দেখি যেখানে সেখানে ফুটপাত ব্যবসায়ী, ঠিক তেমনই বাজারমুখেই একই অবস্থা। তাদের অভ্যাস পাল্টাচ্ছে না। আমরা যারা বাইক নিয়ে চলি, তাদের বাইক রাখার পার্কিং নেই। যে খালি জায়গা আছে, তা বাজার থেকে অনেক দূরে। সেখানে বাইক রাখলে চুরি যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাছাড়া রাতে যখন আমরা কাজ শেষে বাজার করতে যাব, তখন দেখা যায় বিকল্প পথ (কুদরত উল্লাহ মার্কেটের গেট) বন্ধ থাকে। সিটি মার্কেটের গেট সংলগ্ন যন্ত্রতত্র সিএনজি অটোরিকশা। উল্টো পথে গেলে আবার পুলিশি ঝামেলা। বাজারে যদি আসার পথ সহজ না হয় তাহলে ক্রেতারা আসবে কি করে।
সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, কেবল উচ্ছেদ অভিযান দিয়ে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। হকারদের জন্য কার্যকর ও ক্রেতাবান্ধব বিকল্প স্থান নিশ্চিত করা না গেলে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা কঠিন হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, হকারদের পুনর্বাসন, নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক ব্যবসার সুযোগ এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান মিলবে না।
এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম বলেন, ‘বিকল্প ব্যবস্থা না করে এ সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় নেই। আর্থসামাজিক বাস্তবতা জীবন-জীবিকার তাগিদে মানুষ বাধ্য হয়ে পথে নামছে। তাদের যে জায়গায় পুনর্বাসন করা হচ্ছে সেখানে ক্রেতাদের নিতে হবে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে আমরা সিলেট সিটি করপোরেশনকে একটা বড় প্রকল্পের প্রস্তাব করেছিলাম। হাসান মার্কেট, হকার মার্কেট ও লালদীঘির পাড় নিয়ে মাল্টিকমপ্লেক্স ভবন করার। যেখানে নিচ তলায় পার্কিংসহ ভাসমান ব্যবসায়ীদের বসার জায়গা থাকবে। এটা বাস্তবায়ন হলে এ সমস্যা অনেকাংশেই কমে যাবে।’
এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘হকারমুক্ত নগর গড়ার লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। হকারদের নির্ধারিত শেড দেওয়া হয়েছে তারা সেখানে ব্যবসা করবেন। রাস্তা বা ফুটপাতে বসে ব্যবসা পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না। আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। তা অব্যাহত থাকবে।’ এ সমস্যা থেকে স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। সেটা এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সেটা বাস্তবায়ন হলে এ সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে।’
এদিকে প্রতিদিনের মতো আবারও সন্ধ্যা নামছে সিলেট নগরে। ফুটপাতের একপাশে হাঁটছেন মানুষ, অন্যপাশে সাজানো হচ্ছে পসরা। প্রশাসনের বাঁশি শোনা পর্যন্ত চলবে বেচাকেনা- তারপর আবার দৌড়, আবার ফিরে আসা। যেন এক অনন্ত চক্র।




