চামড়া শিল্পে কালো হাত!
প্রকাশিত হয়েছে : ০১ জুন ২০২৬, ১২:০৮:৪৭ অপরাহ্ন
এদেশে গার্মেন্টস শিল্প প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে পাট, চা ও চামড়া ছিলো প্রধান রপ্তানি পণ্য। পরে গার্মেন্টস প্রধান রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়। কিন্তু বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্বেও বিগত সরকারগুলো চামড়া শিল্পের কোন উন্নয়ন করেনি। বিশেষভাবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে ভারতের স্বার্থরক্ষায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই শিল্পকে বাধাগ্রস্ত করা হয়, যার অন্যতম প্রমাণ প্রতি কোরবানির ঈদে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া ভারতে পাচার হওয়ার ঘটনা। স্বাধীনতার পর ভারতের স্বার্থ রক্ষায় পাট, পরে চামড়া ও চিনি শিল্পকে ধ্বংস করে আওয়ামী সরকার। গত বছর মিডিয়ায় ‘ভারতের স্বার্থ রক্ষায় দেড় দশক থমকে ছিলো চামড়া শিল্প’ শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক বছরে লক্ষ্য করা গেছে, কোরবানির ঈদের সময় দেশ জুড়ে সংগৃহীত বিপুল কাঁচা চামড়ার একটি বড়ো অংশ পাচার হয়ে যেতো সীমান্তের ওপারে ভারতে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার চামড়া পাচার করলেও সরকার তা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান বলেন, ‘সাভারে মোট ১৪২ টি কোম্পানী রয়েছে, এর একটিও এখনো কমপ্লায়েন্স অর্জন করতে পারেনি। এর ফলেই ইউরোপ ও আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলো বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্য কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছে। সাভারের জনৈক ট্যানারি মালিক বলেন, বিগত হাসিনা সরকারের পুরো সময়ে ট্যানারি শিল্পনগরীর কোন উন্নয়ন হয়নি বরং তারা ভারতের স্বার্থে পাচারের সব পথ খুলে দিয়েছিলো। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যখন সাভারের হেমায়েতপুরে প্রথমে ট্যানারি স্থাপন করা হয়, তখন থেকেই নীতিগত গলদের কারণে কাঙ্ক্ষিত পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের পর আশ্বাস দেওয়া হয়েছিলো আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর। কিন্তু এক দশকের কাছাকাছি হয়ে গেলেও এর কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘গ্রীণ ফ্যাক্টরী’ হিসেবে সনদ বা স্বীকৃতি মিলছে না।
বলা বাহুল্য, রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্পকে ২০১৭ সালে স্থানান্তর করা হয় সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্প নগরীতে। ৫৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সেখানে স্থাপন করা হয় সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (সিইটিপি) সেটি পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়ায় দূষিত পানি যাচ্ছে সরাসরি ধলেশ্বরী নদীতে। এ শিল্পের অব্যবস্থাপনায় মরণদশায় ধলেশ্বরী নদী। সিইটিপি পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এলডব্লিউজি সনদ পাচ্ছে না। ফলে এর প্রভাব পড়ছে সার্বিক রপ্তানিতে। বর্তমানে সাভারে সিইটিপি’র প্রায় ১৮ হাজার কিউবিক মিটার বর্জ্য শোধনের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু ঈদুল আজহার সময়ে অন্তত: ৪৫ হাজার কিউবিক মিটার বর্জ্য শোধনের প্রয়োজন পড়ে। এভাবে হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্প নগরের দূষণ বন্ধ না হওয়ায় ইউরোপ-আমেরিকার বিশ্বখ্যাত ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বাংলাদেশী চামড়া কিনছে না। বাংলাদেশী চামড়ার বড়ো ক্রেতা বর্তমানে চীন। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিকৃত চামড়ার সিংহভাগই সেখানে যাচ্ছে। সেখান থেকে দাম পাওয়া যাচ্ছে অনেক কম। কারণ দেশটিতে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া চামড়া প্রধানত: ক্রাস্ট লেদার। সেগুলোকে বিভিন্নভাবে প্রক্রিয়াজাত করে ফিনিশড্ লেদারে পরিণত করে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে চীন। অথচ বাংলাদেশ নিজেই যদি আধুনিক ট্যানারি শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে ফিনিশড লেদার রপ্তানি করতে পারতো, তাহলে আরো অনেক বেশী বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারতো। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেট ও ভারতীয়দের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে হাসিনা সরকার এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।
বিভিন্ন অনুৎপাদনশীল খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও চামড়া শিল্পের উন্নয়নে মাত্র কয়েকশ’ কোটি ব্যয় করেনি এই লুটেরা স্বৈরশাসক দল। অথচ চামড়া শিল্প হতে পারতো গার্মেন্টস শিল্পের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিমুখী শিল্প। বর্তমানে বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। জানা গেছে, ইতোমধ্যে শিল্পমন্ত্রী চামড়া শিল্পনগরী পরিদর্শন করে এই শিল্পের সমস্যা দূরীকরণের আশ্বাস প্রদান করেছেন। তবে মন্ত্রীর এই আশ্বাস যেনো বাস্তবে পরিণত হয়, এমন প্রত্যাশা শিল্প সংশ্লিষ্ট লোকজনসহ দেশবাসীর। চামড়া শিল্প একটি পূর্ণাঙ্গ রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে গড়ে উঠলে এই খাত থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা আয় সম্ভব। এর পাশাপাশি কয়েক লাখ মানুষের হবে কর্মসংস্থান। তাই দেশ ও জাতির স্বার্থে এদিকে দৃষ্টি ও মনোযোগ দিতে হবে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারকে।





