২৩ বছরে সিলেটে জলাভূমি কমেছে ৭৭ শতাংশ
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ জুন ২০২৬, ৮:৪৭:৩৮ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : গত দুই দশকেরও বেশি সময়ে দ্রুত বদলেছে সিলেট| এই সময়ে সিলেট জেলায় জলাশয় ও জলাভূমি কমেছে প্রায় ৭৭ শতাংশ এবং নগরায়ণ বেড়েছে ৩০০ শতাংশ| ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ন্যাচারে’-এ প্রকাশিত গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে| গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাহির উদ্দিন ও আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক এস এম নজমুল হক|
গবেষকরা বলছেন, এই পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করছে না, বরং আকস্মিক বন্যা, জলাবদ্ধতা ও দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলছে| গবেষণা বলছে, সিলেটে গত ২৩ বছরে দ্রুত বদলে গেছে ভূমির ব্যবহার ও প্রাকৃতিক পরিবেশের চিত্র| একদিকে কমেছে নদী, খাল-বিল, জলাভূমি ও উন্মুক্ত পানি ধারণকারী এলাকা, অন্যদিকে বেড়েছে নগরায়ণ, কংক্রিটের স্থাপনা ও অবকাঠামো|
গবেষণায় ২০০০, ২০০৫, ২০১০, ২০১৫, ২০২০ ও ২০২৩ সালের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে সিলেট জেলার ভূমি ব্যবহার ও ভূমি আচ্ছাদনের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে| গবেষণায় গুগল আর্থ ইঞ্জিন, ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইট ডেটা এবং র্যান্ডম ফরেস্ট ক্লাসিফায়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে| এতে সিলেটের ভূমিকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়- নগর এলাকা, খালি জমি, জলাশয় ও উদ্ভিদ আচ্ছাদন|
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিলেট জেলায় নগর এলাকা প্রায় ৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে| একই সময়ে জলাশয় ও জলাভূমি কমেছে প্রায় ৭৭ শতাংশ| গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ধ্বংস এবং অপরিকল্পিত নগর বিস্তারের ফলে সিলেটের মতো বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে ঝুঁকি আরো বাড়ছে| গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে সিলেট জেলার মোট ভূমির ৩৪ দশমিক ২৫ শতাংশ ছিল জলাশয় ও পানিপূর্ণ এলাকা| ২০২৩ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশে| অর্থাৎ ২৩ বছরে সিলেট তার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জলাভূমি হারিয়েছে|
গবেষণায় বলা হয়েছে, সিলেটের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলে জলাশয় কমে যাওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি| ফলে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধারণের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং অতিরিক্ত পানি দ্রুত প্লাবন ভূমিতে ছড়িয়ে পড়ছে| এতে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে| বিশ্বনাথ উপজেলায় জলাশয় কমেছে সবচেয়ে বেশি| সেখানে পানিপূর্ণ এলাকা হ্রাসের হার প্রায় ৯০ শতাংশ| এছাড়া, বিয়ানীবাজার, দক্ষিণ সুরমা, গোলাপগঞ্জ, জকিগঞ্জ ও সিলেট সদরেও জলাশয়ের বড় ধরনের সংকোচন দেখা গেছে|
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০০ সালের জলাশয়ের প্রায় ৭ শতাংশ এলাকা ২০২৩ সালের মধ্যে নগর এলাকায় রূপান্তরিত হয়েছে| এছাড়া ৫ দশমিক ৫ শতাংশ জলাশয় খালি জমিতে পরিণত হয়েছে| গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০০০ সালে সিলেট জেলার মোট ভূমির মাত্র ৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ ছিল নগর এলাকা| ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৪৬ শতাংশে| বিশেষ করে সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা, গোলাপগঞ্জ, বিশ্বনাথ ও বিয়ানীবাজার উপজেলায় নগর বিস্তার সবচেয়ে বেশি হয়েছে| গবেষকরা বলছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, গ্রাম থেকে শহরমুখী মানুষের চাপ, নতুন আবাসন প্রকল্প, বহুতল ভবন, হোটেল, বিপণিবিতান ও সড়ক অবকাঠামো বৃদ্ধির কারণে এই পরিবর্তন ঘটেছে|
উপজেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিয়ানীবাজার উপজেলায় নগর এলাকা বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ শতাংশ| সিলেট সদর উপজেলায় বেড়েছে প্রায় ২৪০ শতাংশ| ফেঞ্চুগঞ্জে নগরায়ণ বেড়েছে এক হাজার শতাংশের বেশি| ২০০০ সালে সিলেট সদরে নগর এলাকা ছিল প্রায় ২ হাজার ৩৮৫ হেক্টর| ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ১১১ হেক্টরে| একই সময়ে গোয়াইনঘাটে নগর এলাকা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৮৫৬ হেক্টর|
প্রকাশনায় ‘হটস্পট’ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেসব এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে ভূমি ব্যবহার সবচেয়ে বেশি বদলেছে| এতে দেখা যায়, বালাগঞ্জ, সিলেট সদর, কোম্পানীগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ভূমি রূপান্তর ঘটেছে|
বালাগঞ্জ উপজেলায় সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এলাকাকে ভূমি পরিবর্তনের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে| গবেষকদের মতে, এসব এলাকায় দ্রুত নগর বিস্তার, ভূমি উন্নয়ন ও মানবিক হস্তক্ষেপের কারণে পরিবেশগত পরিবর্তন বেশি ঘটেছে| অন্যদিকে কানাইঘাট, ˆজন্তাপুর ও জকিগঞ্জের কিছু এলাকায় তুলনামূলক কম পরিবর্তন হয়েছে| এসব এলাকাকে ‘কোল্ডস্পট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে| কানাইঘাটে সবচেয়ে বেশি স্থিতিশীল ভূমি পাওয়া গেছে| গবেষণায় ২০০৫ সালে উদ্ভিদ আচ্ছাদনের অ¯^াভাবিক হ্রাস এবং খালি জমির ব্যাপক বৃদ্ধির বিষয়টিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে|
গবেষকদের মতে, ২০০৪ সালের দীর্ঘস্থায়ী আগাম বন্যা সিলেট অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি ও সবুজ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল| এর ফলে বহু এলাকা সাময়িকভাবে খালি জমিতে পরিণত হয়| গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৫ সালে খালি জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় মোট ভূমির ৫৬ দশমিক ৬৬ শতাংশে| একই সময়ে উদ্ভিদ আচ্ছাদন কমে দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ৩৮ শতাংশে|
গবেষণায় বলা হয়েছে, সিলেট ভৌগোলিকভাবেই বন্যাপ্রবণ অঞ্চল| পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি ও নদীর প্রবাহের কারণে এখানে আকস্মিক বন্যা প্রায়ই দেখা যায়| তবে, সাম্প্রতিক নগরায়ণ ও জলাশয় ধ্বংস পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে|
গবেষকদের মতে, কংক্রিটের স্থাপনা ও অপরিবাহী ভূমি বাড়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত জমে যাচ্ছে| একই সঙ্গে প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা সংকুচিত হওয়ায় পানি নামতে পারছে না| এর ফলে নগর এলাকায় জলাবদ্ধতা এবং নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে|
এ বিষয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. জহির উদ্দিন বলেন, সিলেটকে ভবিষ্যৎ দুর্যোগ ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে এখনই টেকসই নগর পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি| একই সঙ্গে প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অনিয়ন্ত্রিত ভূমি ভরাট বন্ধে কঠোর উদ্যোগ প্রয়োজন|





