ফের শুরু লোডশেডিং, বিপর্যস্ত সিলেট
প্রকাশিত হয়েছে : ১৭ জুন ২০২৬, ১২:১৪:২৮ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : সিলেটজুড়ে ফের শুরু হয়েছে ভয়াবহ লোডশেডিং। ঘন্টায় ঘন্টায় লোডশেডিংয়ের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সিলেটের জনজীবন। বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধির পর ঘন ঘন লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে ৩৫ শতাংশ লোডশেডিংয়ের তথ্য জানানো হলেও মাঠের বাস্তব পরিস্থিতি বিভিন্ন। গড়ে অর্ধেক সময়ও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না গ্রাহক।
এদিকে রাত পোহালেই বুধবার সিলেট সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সময়ে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে সরকারের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাধারণ জনগণের মাঝে নেতিবাচক বার্তা যাবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহানগর ও জেলা সদর এলাকায় ১ ঘন্টা পর বিদ্যুতের দেখা মিললেও গ্রামাঞ্চলের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খুবই করুন। সেখানে দিনে রাতে গড়ে ৬ ঘন্টাও মিলছেনা বিদ্যুৎ। এতে গ্রামীন জীবনে চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এছাড়া বিশ^কাপ ফুটবল চলাকালে রাতে ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ না পাওয়ায় খেলা দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ফুটবল প্রেমীরা। ফলে জনমনে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে চলছে তীব্র সমালোচনা।
গরমের তীব্রতা ও লোডশেডিংয়ে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থরা পড়েছেন বিপাকে। তীব্র গরমে অতিরিক্ত ঘেমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন তাদের অনেকেই। অফিস-আদালতে কাজে নেমে এসেছে স্থবিরতা। একইসাথে ব্যবসা-বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে মন্দাভাব।
বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারণে দেশে হঠাৎ বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বৃদ্ধি না হওয়ায় লোডশেডিং বাড়ছে। তবে কবে নাগাদ পরিস্থিতির উত্তরণ হবে সেই তথ্য সংশ্লিষ্ট কারো কাছে নেই। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়ায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে বলে জানান তারা।
এদিকে গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পেলেও লোডশেডিং কমেনি বরং পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম এবং দৈনন্দিন জীবনে।
পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতি থাকায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো সিলেটেও লোডশেডিং বেড়েছে।
এদিকে গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লেও বিল অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকের দাবি, গত মাসে যেখানে তাদের বিল ছিল প্রায় ৩ হাজার টাকা, সেখানে চলতি মাসে তা বেড়ে ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। একইভাবে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকার বিল এখন ২ থেকে আড়াই হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।
গ্রাহকদের ভাষ্য, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুৎ ব্যবহার কম হওয়ার কথা। অথচ বাস্তবে বিল বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না করে অতিরিক্ত বিল আদায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
প্রিপেইড ও ডিজিটাল মিটারের বিভিন্ন চার্জ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন গ্রাহকরা। তাদের প্রশ্ন, নিজস্ব অর্থে মিটার কেনার পরও কেন মিটার চার্জ দিতে হবে। পাশাপাশি ‘ডিমান্ড চার্জ’ নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
গ্রাহকদের দাবি, ৫০ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের জন্য সহনীয় ও অভিন্ন মূল্যহার নির্ধারণ করা হোক। অন্যথায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে। তাদের আশঙ্কা, বিদ্যুৎ বিলের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলে জনঅসন্তোষ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (১৬ জুন) সিলেট বিভাগ বিদ্যুতের ২২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ১৪৫ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৭৫ মেগাওয়াট এবং লোডশেডিং হয়েছে ৩৫ শতাংশ।
এদিকে মঙ্গলবার সিলেট জেলায় ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ১০৫ মেগাওয়াট। জেলায় বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে ৫৫ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড সিলেট জোনের জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পরেশ চন্দ্র মন্ডল জানান, প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে তিনি মৌলভীবাজারে অবস্থান করছেন। চাহিদামতো সরবরাহ না পাওয়ায় লোডশেডিং কিছুটা বেড়েছে। বৃহস্পতিবার নাগাদ বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলেও জানান তিনি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেট বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসাইন জানান, গরম বাড়ায় চাহিদা বেড়েছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বাড়েনি, ফলে সরবরাহ কম থাকায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তাই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। আপাতত এ অবস্থার উন্নতির সম্ভাবনা নেই। কারণ জাতীয়ভাবে উৎপাদন না বাড়লে লোডশেডিং কমার সম্ভাবনা নেই। তবে আগামী শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটি হওয়ায় চাহিদা কমবে। এতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণও কমবে।




