মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে শীর্ষে ইন্দোনেশিয়া
প্রকাশিত হয়েছে : ০১ জুলাই ২০২৬, ৭:৫৬:৪৭ অপরাহ্ন
আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া : মাত্র চার বছরের ব্যবধানে মালয়েশিয়ার বিদেশি শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় সবচেয়ে বেশি শ্রমিক পাঠানো দেশ ছিল বাংলাদেশ। তবে বর্তমানে সেই অবস্থান দখল করেছে ইন্দোনেশিয়া। একই সঙ্গে বিদেশি কর্মী নিয়োগের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে এবং পুরো নিয়োগব্যবস্থা দ্রুত ডিজিটাল ও কঠোর নিয়ন্ত্রণভিত্তিক কাঠামোয় রূপ নিচ্ছে।
মঙ্গলবার মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেরি সাইফুদ্দিন নাসুশন ইসমাইল পার্লামেন্টে লিখিত জবাবে জানান, ২০২৫ সালে দেশটিতে মোট ৭৭ হাজার ৮০৭ জন বিদেশি কর্মী প্রবেশ করেছেন, যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৯১ শতাংশ কম।
২০২৫ সালে বিদেশি কর্মী পাঠানো দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। দেশটি থেকে এসেছে ৩৫ হাজার ১১ জন কর্মী, যা মোট আগমনের ৪৫ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নেপাল, সেখান থেকে এসেছে ২৫ হাজার ২৬ জন (৩২ দশমিক ২ শতাংশ)। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ভারত থেকে এসেছে ৬ হাজার ২৪৫ জন (৮ শতাংশ)। এবার শীর্ষ তিন উৎস দেশের তালিকায় নেই বাংলাদেশ।
কোভিড-১৯ মহামারির পর ২০২২ সালে শ্রমবাজার পুনরায় চালু হলে বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মী মালয়েশিয়ায় যান। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে রেকর্ডসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে প্রবেশ করেন। ইমিগ্রেশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মালয়েশিয়ায় মোট ৮ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩১ জন বিদেশি কর্মী প্রবেশ করেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই যান ৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫৪৮ জন, যা মোট আগমনের প্রায় ৪৬ শতাংশ। একই সময়ে নেপাল থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮৯৫ জন এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে ১ লাখ ২২ হাজার ৯০৮ জন কর্মী প্রবেশ করেন। তবে এই রেকর্ড সংখ্যার পাশাপাশি অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির আধিপত্য, চাকরি না পাওয়া, ঋণের বোঝা এবং শ্রমিক শোষণের অভিযোগ সামনে আসে। এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে মালয়েশিয়া সরকার নতুন বিদেশি কর্মী নিয়োগে কড়াকড়ি আরোপ করে। বিদ্যমান কোটার ব্যবহার, শ্রমবাজারের ভারসাম্য এবং নিয়োগব্যবস্থার সংস্কার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নতুন নিয়োগ সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে ওই বছর বিদেশি কর্মী আগমন কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৯৭২ জনে।
২০২৪ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে ১ লাখ ২৪ হাজার ১০৭ জন, ভারত থেকে ৭৮ হাজার ৪৭৫ জন এবং কাজাখস্তান থেকে ৫১ হাজার ৩৬২ জন কর্মী মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করেন। আর ২০২৫ সালে মোট বিদেশি কর্মী আগমন নেমে আসে মাত্র ৭৭ হাজার ৮০৭ জনে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিদেশি কর্মী নিয়োগের হার কমে যাওয়ার মাধ্যমে নিয়োগদাতাদের চাহিদাও হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে সরকার নিয়োগব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে ধারাবাহিক সংস্কার চালিয়ে যাচ্ছে।
অভিবাসন ও শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়ার এই পরিবর্তন সাময়িক নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কারের অংশ। ভবিষ্যতে শুধু বেশি সংখ্যক কর্মী পাঠালেই হবে না, বরং নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুসরণ, প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য যাচাই এবং অভিবাসন ব্যয় কমাতে পারলেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এটি বাংলাদেশের জন্য একদিকে সতর্কবার্তা, অন্যদিকে নতুন সুযোগ। দক্ষ জনশক্তি তৈরি, অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আবারও মালয়েশিয়ার অন্যতম প্রধান শ্রমশক্তির উৎস হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবে।






