‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগানে উত্তাল তেহরান
প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৯:০৭ অপরাহ্ন
শোকের সমুদ্রেও রাজনৈতিক বাগযুদ্ধ তুঙ্গে
জালালাবাদ রিপোর্ট : তেহরানে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজায় সর্বস্তরের মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি নজর কেড়েছে। বিদায়ী যাত্রায় দেশটির সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি লাখো লাখো সাধারণ মানুষ অংশ নিচ্ছেন।
শনিবার সকালে খামেনির মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে আনা হয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতাকায় মোড়ানো কফিনের ওপর রাখা ছিল তার চিরচেনা কালো পাগড়িটি। এই নেতার কফিনের পাশেই রাখা হয়েছিল একই হামলায় নিহত তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মরদেহ। এর মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছিল খামেনির ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি-র ছোট কফিনটি।
কর্তৃপক্ষের ধারণা, আগামী তিন দিনে কেবল তেহরানেই ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন (দেড় থেকে দুই কোটি) মানুষ এই শোকানুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন।
সকাল থেকে মোসাল্লা প্রাঙ্গণ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, শোকার্তদের হাতে ছিল প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত লাল ব্যানার। তারা ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ বলে স্লোগান দিচ্ছিলেন।
নেতাকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন সাধারণ ইরানিরা। ২৭ বছর বয়সী এক শোকাতুর ব্যক্তি বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) বলেন, ‘আমি আমার প্রিয় নেতা আলি খামেনিকে বিদায় জানাতে এসেছি। এমন দিন দেখতে হবে কখনো ভাবিনি। এই ট্র্যাজেডি দেখার আগে যদি আমার মৃত্যু হতো!’
বিলাপ করতে দেখা গেছে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও। পার্লামেন্ট স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়া শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে প্রকাশ্যে কাঁদতে দেখা যায়। শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নবনিযুক্ত প্রধান আহমদ ওয়াহিদি।
ইরানের জন্য এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজনৈতিক মুহূর্ত। এই সময়ে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের দেওয়া বার্তাগুলোর ওপর পুরো মধ্যপ্রাচ্য কড়া নজর রাখছে। এ অবস্থায় আমেরিকা ও ইরানের বাগ্যুদ্ধ তুঙ্গে পৌঁছেছে।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শোক ও দাফন অনুষ্ঠানের মধ্যেই এক তীর্যক মন্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘ইরানকে এক সপ্তাহের ছুটি দিয়েছে’।
শুক্রবার এক বক্তৃতায় ট্রাম্পের দেওয়া এ বক্তব্যকে ইরানের প্রতি একটি বড় ধরনের কটাক্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পারমাণবিক নীতি এবং সামরিক অবস্থান নিয়ে যখন দুই দেশের মধ্যে প্রতিনিয়ত বাদানুবাদ চলছে, ঠিক তখন ট্রাম্প এ মন্তব্য করলেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে ‘এক সপ্তাহের ছুটি’ দেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তবে ইরানের নেতৃত্ব এবং দেশটির পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে নিজের কঠোর অবস্থানের কথা জানান দিতেই তিনি এ মুহূর্তটিকে বেছে নেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের শুরুর দিকেই নিহত হন খামেনি। তাঁর মৃত্যুর পর ইরানজুড়ে সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক ও দাফন অনুষ্ঠান শুরুর পরপরই ট্রাম্পের এ মন্তব্য সামনে এল।
ওই হামলায় দীর্ঘদিন ধরে ইরানের দায়িত্বে থাকা এ সর্বোচ্চ নেতার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে তাঁর কন্যা, জামাতা, ১৪ মাস বয়সের নাতনি এবং পুত্রবধূ ছিলেন।
ট্রাম্পের এ মন্তব্য সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দুই দেশের মধ্যে চলমান বাদানুবাদকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে চলমান রাজনৈতিক মেরুকরণকেই স্পষ্ট করে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী হাওয়া যত গরম হবে, তেহরানের প্রতি দেশটির নীতি কেমন হওয়া উচিত-তা নিয়ে মার্কিন রাজনীতিকদের মধ্যে বাগ্যুদ্ধ ও বিতর্ক তীব্র রূপ নেবে।
উত্তেজনার মধ্যেই প্রতিশোধের ডাক :
রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তি হয়েছে। তা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো বেশ উত্তপ্ত। উভয় দেশের কর্মকর্তারাই সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি খারাপ হলে যেকোনো সময় আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে।
আয়াতুল্লাহ খামেনির শোক ও দাফন অনুষ্ঠানে ব্যাপক জনসমাগমের আহ্বান জানিয়ে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, জাতির এ প্রতিশোধের ডাক যেন পুরো বিশ্বের কান পর্যন্ত পৌঁছায়।
একই সুরে ইরানের সেনাপ্রধান আমীর হাতামি বলেন, আমাদের শহীদ নেতা এবং জাতির সব শহীদের রক্তের মূল্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই চড়া দামে দিতে হবে।
এদিকে, জনাকীর্ণ এই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা বা বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে ইরানের প্রশাসন। অতীতে এই ধরনের বিশাল জনসমাবেশে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্খিত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই এবার কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।






