তুরাব তুরাগের জল নয় সুরমা মাখা শহীদ
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১:১৬:৩৮ অপরাহ্ন
সালেহ আহমদ খসরু:
সেদিন শুক্রবার, বাতাসে পবিত্রতার এক মৌ মৌ গন্ধ। ফজরের সালাতের ডাক, ঘুম থেকে নামাজ উত্তম। প্রতিটি মুসলমান এই ডাকে সাড়া দিয়ে দিন শুরু করেন। বিশ্বাস করেন, জানেন আমার জন্য উত্তম ফয়সালা আজকের দিনে লেখা হয়ে যাবে নামাজ আদায়ের পরপর। তেমনি সেই প্রভাতে আবু তাহের মো. তুরাব নামাজ শেষে হয়তো একটু ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন এবং নিশ্চয়ই ভাবছিলেন পুরো দেশে চলছে তখন ফ্যাসিস্ট ও তার দোসরদের তান্ডবলীলা। একজন সাংবাদিক হিসেবে দম নিয়ে রাখছিলেন দুপুরে মিছিল হবে, প্রতিবাদ হবে, তার ফুটেজ নিবেন পুলিশের নির্মমতার চিত্র তাঁর ক্যামেরায় বন্দী করবেন। এমন নানান কথা ভাবতে ভাবতে কতোখানি ঘুমিয়েছিলেন জানি না কিন্তু নরপিশাচরা যে তাঁকে নিশানা করবে সেটি ঘুনাক্ষরেও না ভেবে হাতের ক্যামেরা কলম কাগজ আর প্রেস লেখা বুকের বর্ম লাগিয়ে বের হয়ে পড়েন সকালের সুর্য হেলান দেবার আগেই আমাদের সবার প্রিয় দৈনিক জালালাবাদ এর তরুণ রিপোর্টার এটিএম তুরাব। হ্যাঁ, আমি শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাবের কথা বলছি- আজ সেই ভয়াল ১৯শে জুলাই এবং আমি সেই দিনের কথা বলছি আজ।
দিনটি ছিল শুক্রবার-শুরুতেই বলেছি, বাতাসে মৌ মৌ গন্ধ কিন্তু এরমাঝেই এক আশঙ্কা মানুষের মনে, আমাদের মাঝে- আপামর বাংলাদেশি মুসলিম হিন্দু পাহাড়ি সবাই একেকটি সকাল হলে মনে করে রাত পেরুলো, দিন হয়তো শান্তির হবে। কারণ তখন রাত ছিল আরও ভয়ঙ্কর- কখন কোথায় কে গুমের শিকার হবে সেই অজানা আতঙ্ক ঘিরে থাকতো রাজনৈতিক কর্মী ছাত্র শ্রমিক জনতার। তেমনি দিনে আবু তুরাব ও অপরাপর সঙ্গী সংবাদকর্মী তটস্থ থাকতেন আজ কী সংবাদ! অথচ পবিত্র জুমার নামাজ শেষে নিজেই সংবাদের শিরোনাম হবেন একবারও কি ভেবেছিলেন! বা আর কেউ কি কল্পনা করেছিলেন!
না অথবা হ্যাঁ! কারণ কে যে কোথায় হায়েনার নির্বিচার গুলির শিকার হবেন সেজন্য একটা অস্থির তোলপাড় করা দিনরাত পার করতেন সকলে। সেই তোলপাড় করা পেন্ডুলামের কাটা বয়ে যাচ্ছে, মিছিল শুরু হয়েছে- সিলেট বিএনপি কর্মীরা জড়ো হয়ে গগনবিদারী আওয়াজ দিয়ে স্বৈরাচারের তখতশিনকে গুড়িয়ে দিতে কন্ঠকে বেছে নিয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচু করে বলছে- না তোকে আর চাই না, এবার তোর বিদায়ের পালা! তখনই ঐ হাত আর কন্ঠের যাদুকরী আওয়াজ সিলেটের কোর্ট পয়েন্ট প্রজ্জ্বলিত করছে ঠিক তখন হাসিনার পেটোয়া পুলিশ বাহিনী মুহুর্মুহু গুলিতে থামিয়ে দিতে চাইছে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইকে- গনতান্ত্রিক অধিকারকে।
আবু তুরাব ছিলেন সেই লড়াইয়ের প্রতিটি মুহুর্তের একেকটি চিত্রকল্প আঁকা শিল্পী, যিনি ক্লিক ক্লিক করে ডকুমেন্টারি করতে ছোটাছুটি করছিলেন এদিক-সেদিক চারিদিক। যেন একেকটি শট পিশাচের কালো থাবাকে পৃথিবীর মানচিত্রে তুলে ধরতে ব্যাকুল, মরিয়া অথচ কাউকে মারতে নয়। কেবল ইতিহাসের পাতায় তুলে ধরা – আমি তুরাব, এই দেখ আমার ক্যামেরায় নরপিশাচের ছবি। এরা সেই রক্তপিপাসু বাহিনী যারা মানুষের উপর বর্বরতা ও জিঘাংসায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, আর সিলেটের কোর্ট পয়েন্ট করছে বিভৎস রক্তাক্ত। সেদিন প্রায় দেড় শতাধিক বিএনপি কর্মী গুলিতে আক্রান্ত হয়েছে, অন্তত তিনজন চোখ হারিয়েছে কিন্তু আমাদের তুরাব নিজের জীবন বিপন্ন করে সেই সব ঘটনার স্বাক্ষর রাখছিলেন। তিনি কারও বিরুদ্ধে শ্লোগান দেননি অথবা বলেন নি- আমি তোর বিরুদ্ধে ক্যামেরা নয় পাল্টা গুলি নিয়ে এসেছি! কেবল তার ক্লিক ক্লিক চলছে অন্যায় অপরাধের চিত্র তোলায় ব্যস্ত- তিনি হয়ে উঠছিলেন এক চিত্রকর। তিনি পাবলো পিকাসো বা এস এম সুলতান হবার ইচ্ছায় নয়, কেবল ভবিষ্যতের পাতায় এঁকে রাখতে চাইছিলেন স্বপ্নের স্বদেশে স্বৈরাচারের তান্ডবলীলা। হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোনো আর্ট গ্যালারিতে ঐ ছবিগুলো দেখে জেনে নিতো পুরো দেশের মতো সিলেটও ছিল এক অবরুদ্ধ জনপদ, যার পথের নুড়ি কুড়ানো কোনো পথিক অনায়াসে বলতে পারতো ভয়াল জুলাইয়ের এটি এক রক্তাক্ত চিত্রকল্প আঁকা রক্তাক্ত ক্যানভাস কোনো এক চিত্রশিল্পীর। আমাদের আবু তুরাব সেই চিত্রশিল্পী যিনি শহীদ হয়েছেন পুলিশের নির্বিচার গুলির নিশানায়, রক্তাক্ত দেহ যখন এলিয়ে পড়ছে তখন তাঁর সতীর্থ সাংবাদিক পিছু না হটে বীরদর্পে বুকে তুলে নিয়ে ছুটে গেছে হাসপাতালে। অফুরান রক্তক্ষরণ যেন সুরমার জলের ধারার মতো ছুটে চলছে- থামে না, অতঃপর সেই আপন ঠিকানায় পৌঁছে গেলেন আমাদের প্রিয় তুরাব মা’বুদের প্রিয় হতে।
জানিনা তাঁর সেই ছবিগুলো কারও নিকট সংরক্ষিত আছে কি-না! না-কি রক্তের আখরে লেখা শহীদ আবু তুরাবের শেষ শ্বাসের পর আর কেউ খুঁজে নেয় নি তোরাবের জীবনের শেষ কর্মের স্বাধীন চিত্রকল্প! যদি থাকে সেই ছবিগুলো তা যেন কোনো একদিন প্রেসক্লাবে অথবা কোনো এক গ্যালারিতে গ্যালাক্সির আলো হয়ে জানিয়ে দেয় সেই বিভৎসতা – এর আয়োজন হোক এটি নিশ্চয়ই সাধারণ মানুষের আকাঙ্খা এবং এর দায়িত্ব নিতে হবে সতীর্থ স্বজন।
একইভাবে শহীদ আবু তুরাব হত্যার আসামী সেই পুলিশদের বিচার যেন তরান্বিত হয় এবং ন্যায়বিচার পায় তুরাবের পরিবার। এই কাজটুকু এগিয়ে নিতে অত্যন্ত সচেতনতার সঙ্গে কলম চালাতে হবে সেই সতীর্থদেরই। নাহলে তুরাবের আত্মার অভিশাপ হতে মুক্ত হবেন না আপনি আমি আমরা। ভুলে গেলে চলবে না ভাই আবু সাইদ, ওয়াসিম, মুগ্ধ, তুরাব, রুদ্র, তনিমা, আনাস সহ প্রায় দু’হাজার শহীদ হয়েছেন একটি ন্যায়বিচারের স্বদেশ গড়তে। এরা কেউ মন্ত্রী এম পি বা সরকারি বড় পদের জন্য জীবন বিলায়নি, এরা গণতন্ত্র ন্যায়বিচার দেখার আশায় পথে নেমেছিল। আজ যাদের গাড়িতে পতাকা কিংবা রাজনৈতিক মর্যাদায় অভিষিক্ত বিরোধী ও সরকার দলীয় সংসদ সদস্য ভাইবোন তাঁরা যদি এ কাজটি করতে ভুলে যান তবে অভিশাপের প্রায়শ্চিত্ত সকলকেই আরও কোনো একদিন করতে হবে এবং কোনো দায়মুক্তি এ দায় হতে কাউকে পার দিবে না। কারণ প্রকৃতি যেমন কলকল নদীর জল- তেমনি কখনো বড় নির্মম। এবং এই নির্মমতা সবাইকে ছুঁয়ে যাবে, যা আমার একেবারেই কাম্য নয়-কখনো না।
এবার বলি শহীদ আবু তুরাব জন্ম নিয়েছিলেন এই জুলাইয়ে। সেদিন পহেলা জুলাই ১৯৯০ বিয়ানীবাজার পৌরসভার ফতেহপুর গ্রামে। আমার বাড়িও বিয়ানীবাজার-মাঝেমধ্যে মন বলে বিয়ানীবাজার কি বীর জন্ম দেয়! কারণ নানকার বিদ্রোহের কথা স্মরণে এলো। এমনকি জুলাইয়ে ৬ জন বীর শহীদ হয়েছেন এই উপজেলায়। না কেবল বিয়ানীবাজার নয়, পুরো স্বদেশ বীর শ্রেষ্ঠ বীর বিক্রম জন্ম দেয় – এজন্যই মহান মুক্তিযুদ্ধ হতে সতেরো বছর লড়াই করা বিপ্লবী চব্বিশের জুলাই। মন বলে এ জাতি মাথা নোয়ায় না।
আচ্ছা কেউ কি বলতে পারি তুরাবের নতুন বিয়ে করা স্ত্রী অথবা তাঁর মা কেমন আছেন! তাঁর মা অথবা সেই বোন দেখুক এ মানচিত্রে বিচার হয় এবং এজন্যই বিচার চাইছি, ন্যায়বিচার। এই বিচার সহ প্রত্যেকটা হত্যাকাণ্ডের বিচার জরুরী। আবু তুরাব প্রায় একশো স্পিøন্টার গায়ে মেখেছিল! কেন! এতো গুলি ছোঁড়ার সাহস এডিসি সাদেক কাওসার দস্তগীর কীভাবে পেল! পুলিশ যদি মিছিল হটাতেই হয় তবে লাঠি টিয়ারগ্যাস চালালেই যথেষ্ট! অথচ এরা হায়েনার মতো আক্রমণ শানায়, এ যেনো ভিনদেশী কোনো পুলিশ! দস্তগীরের পেছনে কালো কালো চেহারার এরা কারা! কে তারা কি তার পরিচয় কোন দেশের ভয়ানক হত্যাকারী তারা! এসব আরও খোলাসা হওয়া জরুরী আজ।
শহীদ আবু তুরাব হত্যার আসামী যেনো কোনোভাবেই পার না পায় তেমনি ভাই ওয়াসিম, মুগ্ধ, তনিমা, রিয়া, আনাসের হত্যাকারী।
আজকের ১৯শে জুলাই যদি সত্যিই স্মরণ করতে হয় তবে চোখের জল বাধ মানবে না বটে কারণ ইতোমধ্যেই আমার বুকে তাঁদের আগলে রাখতে গিয়ে নয়নে জল! তবুও সেই জলে বাধ দিয়ে সেইখানে ন্যায়বিচারের স্বদেশ প্রতিষ্ঠায় একটি পতাকা পতপত করে উড়াতে হবে, জানান দিতে হবে শতমত সুন্দর করুক মানচিত্র। বিচার পাক শহীদ আবু তুরাব, ওয়াসিম, রুদ্র, তনিমা, আনাস, মুগ্ধ, আবু সাইদ সহ সকল শহীদের পরিবার। তবেই তখন তাঁদের আত্মা শান্তি পাবে, শান্ত হবে সোনার স্বদেশ।
এবং আজও প্রভাতে ডাক হয়েছে এবং রোজ হবে ঘুম থেকে নামাজ উত্তম, আর আমি আমরা সাধারণ মানুষ ডাক দিচ্ছি সকল রাষ্ট্র পরিচালকের উদ্দেশ্য ক্ষমতা থেকে মমতা উত্তম-তাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে চিরদিনের জন্য মানুষের মমতায় বাস করুন।
আমার স্থির বিশ্বাস মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর পিতামাতা যেভাবে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে মমতায় বেঁচে আছেন তিনিও একই পথে হাঁটবেন।
শহীদ আবু তুরাব সহ সকল শহীদ বিপ্লবীর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
লেখক: কবি প্রাবন্ধিক ও আবৃত্তি শিল্পী






