বন্দুকবেষ্ঠিত জানাজা
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১:১২:৪৮ অপরাহ্ন
আব্দুল মুকিত অপি এডভোকেট:
এটিএম আবু তাহের মুহাম্মদ তুরাব সিলেটের সংবাদপত্র জগতের অকালে ঝরে যাওয়া এক ফুল। তার মতো বয়সে অনেক ফুলই ঝরে, কিন্তু তার ঝরে যাওয়াটা তো অস্বাভাবিক। নিতান্তই হাসিনা সরকারের ফ্যাসিস্ট পুলিশের ঔদ্ধত্য গুলিতে মারা গেলো তরতাজা এই তরুণ।
পৃথিবীর মানুষ দেখেছে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কীভাবে সে গুলি খেয়েছিল এবং একটু একটু করে তার প্রাণ প্রদীপ নিভেছিল। ১৯ জুলাই ২০২৪ সালে ঘটনার দিন কালেক্টরেট মসজিদের সামনে থেকে সাধারণ ছাত্র জনতার যে মিছিল বেরিয়েছিল সেটি ছিল অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির একটা মিছিল, অথচ অতি উৎসাহী পুলিশ পেছন থেকে সেই মিছিলে গুলি করে। এমন যদি হতো যে, মিছিলটি পুলিশের দিকে তেড়ে আসছিল এবং পুলিশ প্রাণ রক্ষাথে গুলি চালিয়েছিল তাহলে একটা সান্ত্বনা পাওয়া যেতো।
সমবায় ভবনের সামনে রিকশার সঙ্গে আছড়ে পড়া তুরাব, হাত মুখ এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ার ছবি ও ভিডিও দেখলে নিজেকে স্থির রাখা কঠিন।
তুরাব অল্প বয়সেই সিলেটের সংবাদপত্র জগতে ফটোসাংবাদিক এবং রিপোর্টার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। সহকর্মীদের কাছে সে মাঠকেন্দ্রিক, সাহসী এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে সংবাদ সংগ্রহে আগ্রহী একজন সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত করেছিল। দৈনিক নয়াদিগন্ত এবং দৈনিক জালালাবাদের জন্য তার অকৃত্রিম প্রেম ও শ্রম দেখে মুগ্ধ হতাম। আর ভালো লাগতো এই ভেবে যে, আমার নিজের উপজেলা বিয়ানীবাজার একটা সম্ভাবনাময় তরুণের জন্ম দিয়েছে বলে। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৯০ সালের ১লা জুলাই বিয়ানীবাজারের ফতেহপুর গ্রামে তার জন্ম হয় এবং ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তার অকাল মৃত্যু হলো!
পরিবারে চার ভাইবোনের মধ্যে সে ছিল সর্বকনিষ্ঠ। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয় মূলত তার পিতাকে অনুসরণ করে এবং সিলেটে দীর্ঘ সময় মাঠে কাজ করে খুবই ভালো একটা পরিচিতি অর্জন করে তুরাব। একজন নির্ভীক, কর্মঠ ও পেশাদার মাঠের সাংবাদিক হিসেবে তার স্মৃতি দীর্ঘদিন মনে থাকবে সবার।
তুরাবের মৃত্যুর পর তার লাশ পাওয়া এবং জানাজার নামাজ পড়া–কোনো কিছুতেই স্বস্তি দেয়নি ফ্যাসিস্ট সরকার। এমনকি ফ্যাসিজমের আজ্ঞাবহ অন্ধ-বধির শ্রেণির কিছু কথিত সাংবাদিক তার মৃত্যুকে অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা এবং শান্তিপূর্ণ মিছিলকে উশৃঙ্খল মিছিল আখ্যা দিয়ে সাংবাদিকের মৃত্যুকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেছে–ফেইসবুক সহ অন্যান্য ডিজিটাল মিডিয়ায়। কথা হলো, বিবেক থাকলে সত্যকে সত্য এবং সাদাকে সাদা বলাই মানুষের কাজ। ভিডিওতে যেখানে দেখা যায় একটা মিছিল বন্দরবাজারের দিক থেকে জিন্দাবাজারের দিকে চলে যাচ্ছে এবং তুরাব সেই মিছিলের ছবি তোলার জন্য পেছনে পেছনে যাচ্ছে সেখানে কালেক্টরেট মসজিদের কোণায় দাঁড়িয়ে পুলিশের গুলি করার কী দরকার ছিল?
তুরাবের লাশ সিলেট প্রেসক্লাব হয়ে জানাজার জন্য নেওয়া হয় হজরত মানিকপীর (রহ.)-এর মাজারে। বাদ জোহর সেই জানাজায় গিয়ে দেখা গেলো মুসল্লীর চেয়ে পুলিশ-সোয়াট এবং অন্যান্য বন্দুকওয়ালাদের সংখ্যাই বেশি।
আতঙ্ক আর উদ্বেগের মধ্যে দিয়ে কোনোমতে আমরা জানাজা পড়ে চলে আসি। সুন্দর জীবনের স্বপ্ন নিয়ে শহরে আসা এক তরুণ বাক্সবন্দী হয়ে পিতার কবরের পাশে আশ্রয় নিতে চলে গেলো ফতেহপুরের পথে…
তুরাবের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগে তার পিতা মাস্টার আব্দুর রহিমের সঙ্গে অন্য সবার মতো আমারও পরিচয় ছিল। তিনি সফেদ কাপড় পরে অত্যন্ত ম্রিয়মান কণ্ঠে আমাদের সামনে হাজির হতেন। পত্রিকায় সংবাদ পাঠাতেন হলুদ খামে ভরে ডাকযোগে। বয়সে অনেক বড় হলেও ‘অপি ভাই’ বলেই সম্বোধন করতেন। তখন জানতাম না যে, তুরাব নামে ওনার একটা ছেলে সংবাদপত্র জগতের দিকে আসছে ধীরে ধীরে। হয়তো সে তখনো অনেক ছোটো। তুরাব তার বাবার মতোই নম্র ভদ্র ছিল। সে-ও ভাই ডাকতো এবং মজার ছলে বলতো, ‘এলাকার ছোটো ভাইর দিকে খেয়াল রাখবা!’
খেয়াল আর বেশিদিন রাখা হলো কোথায়। এখনো ভাবতেই পারি না–সে আর নেই আমাদের মাঝে!
বেঁচে থাকলে আজ হয়তো সে বিলেতের বহু রঙিন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠতো। মৃত্যুর দু’মাস আগে তুরাব বিলেতি কন্যা বিয়ে করেছিল। সংসার জীবন তার আর করা হলো না। ঘাতকের বুলেট তছনছ করে দিলো সবকিছু। বাবা বেঁচে থাকলে পুত্র হারানোর এই বেদনা কী করে সইতেন আল্লাহ মালুম, মা মমতাজ বেগমকে আল্লাহ সাহায্য করুন।
আমাদের সবার প্রিয় তরুণ সাংবাদিক তুরাব তার পরকালের যাত্রায় শান্তিতে থাকুক এবং তার খুনির দ্রুত বিচার নিশ্চিত হোক–এই প্রত্যাশা…
লেখক : এডিশনাল পিপি, মহানগর দায়রা জজ আদালত এবং যুগ্ম সম্পাদক-১, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতি।






