বৃষ্টিহীন দিনে রোদের দাপট
প্রকাশিত হয়েছে : ২৭ জুলাই ২০২৬, ১:২১:২৮ অপরাহ্ন
কুশিয়ারা এখনও দুই পয়েন্টে বিপদসীমার ওপরে

স্টাফ রিপোর্টার: এই ভর শ্রাবণে আরো একটি বৃষ্টিহীন দিন দেখল সিলেট। গতকাল রোববার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোদের দাপট আর ভ্যাপসা গরমে জনজীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক, পথচারী, স্কুলগামী শিশু ও বৃদ্ধরা। তবে গরম বাড়লেও কুশিয়ারা নদীর পানি এখনও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যদিও সামগ্রিকভাবে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত রয়েছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় আকাশ আংশিক মেঘলা থেকে অস্থায়ীভাবে মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে। অনেক স্থানে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। তবে রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কোনো বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়নি। আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ০ দশমিক ৮ মিলিমিটার। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন ২৪ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
রাতের আকাশে বিজলী চমকালেও রোববার রাত ৮টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে, দিনের তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, ভ্যানচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পথচারীরা। সকালের সূর্য যত ওপরে উঠেছে, ততই যেন আগুন ঝরিয়েছে আকাশ। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নগরীর ব্যস্ত সড়কগুলো অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায়। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হননি। যারা জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে ছিলেন, তাদের অনেককে গাছের ছায়া কিংবা দোকানের সামনের ছাউনিতে আশ্রয় নিয়ে বারবার বিশ্রাম নিতে দেখা গেছে। ঠান্ডা পানীয়, ডাব ও রাস্তার পাশে বিক্রি হওয়া শরবতের দোকানগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়।
চলমান তীব্র গরমে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি, বিশেষ করে ‘হিটস্ট্রোকের’ আশঙ্কা মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গরমে দীর্ঘ সময় রোদে অবস্থান করা, পর্যাপ্ত পানি পান না করা এবং মাত্রাতিরিক্ত কায়িক পরিশ্রমের ফলে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে ‘হিট এক্সহসশন’ এবং পরবর্তীতে ‘হিটস্ট্রোকের’ মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া আশঙ্কা থাকে।
চিকিৎসকেরা জানান, হিটস্ট্রোকের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, তীব্র শারীরিক দুর্বলতা, মানসিক বিভ্রান্তি, দ্রুত হৃদস্পন্দন এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। পরিস্থিতি গুরুতর হলে আক্রান্ত ব্যক্তির খিঁচুনিও হতে পারে।
এই স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে চিকিৎসকেরা বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রোদে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। জরুরী প্রয়োজনে বাইরে যেতে হলে ছাতা বা টুপি ব্যবহার করা, হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান এবং পর্যাপ্ত পানি ও ওরস্যালাইন পান করা উচিত। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বনের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসকদের মতে, কারও মধ্যে হিটস্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে তাকে দ্রুত ছায়াযুক্ত বা শীতল স্থানে নিয়ে যেতে হবে এবং শরীরের আঁটসাঁট পোশাক ঢিলা করে দিতে হবে। একই সাথে রোগীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিকটস্থ চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে সিলেটে ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্ত (শংকর) বলেন, ‘খুব প্রয়োজন ছাড়া রোদে বের না হওয়াই ভালো। প্রয়োজনে বের হলে ছাতা-ক্যাপ ব্যবহার করতে হবে। ডিহাইড্রেশন সমস্যার জন্য প্রচুর পরিমাণ তরল খাবার, সেটা পানি, স্যালাইন কিংবা ডাব, ফলের জুস যাই হোক পান করতে হবে। যারা বাইরে কাজ করেন তারা দুই থেকে আড়াই লিটার পানি ও যারা ঘরে কাজ করেন তারা দেড় থেকে দুই লিটার পানি পান করতে হবে। যদি কারও মধ্যে হিটস্ট্রোকের লক্ষ¥ণ দেখা যায় তাহলে তাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে।
এদিকে, সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানি নেমে এসেছে ১২ দশমিক ৪১ মিটারে, যা বিপদসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার নিচে। সিলেট পয়েন্টে পানি রয়েছে ৯ দশমিক ৯১ মিটারে। কুশিয়ারা নদীর আমলশীদ, শেওলা ও অন্যান্য পয়েন্টেও পানি কমেছে। তবে ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানি এখনও ৯ দশমিক ৭৭ মিটার, যা মৌসুমি বিপদসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার ওপরে। একইভাবে সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে পানি ৭ দশমিক ১০ মিটার, যা বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি আরও কমেছে এবং আগামী তিন দিনও এ ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, উজানে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত না থাকায় নদ-নদীর পানি কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে। তবে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ আরও সুস্পষ্ট হলে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। তাই নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের পরিস্থিতির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।






