রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু ইসির : সবার চোখ বঙ্গভবনে, কে হচ্ছেন পরবর্তী অভিভাবক
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩০:৫৫ অপরাহ্ন

জালালাবাদ রিপোর্ট : রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরই অংশ হিসেবে গতকাল রোববার (৯ আগস্ট) মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করেছে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি। প্রথম দিনে গতকাল রোববার সরকারি দল বিএনপি ২টি ও বিরোধী দল ১টি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৩ আগস্ট পর্যন্ত মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়া যাবে। ১৬ আগস্ট হবে যাচাই-বাছাই। ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। আর ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হওয়ায় দেশবাসীর চোখ এখন বঙ্গভবনের দিকে। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি তথা অভিভাবক নির্বাচিত কে হচ্ছেন, সেই কৌতুহল এখন সবার মাঝে।
সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। ফলে বিএনপির বিপুল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রেক্ষাপটে দল যাকে মনোনয়ন দেবেন, বাস্তবে তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। এ কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটি বিএনপির জন্য শুধু একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি সরকারের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভারসাম্য, দলের নেতৃত্বের কাঠামো এবং রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
তথ্য মতে, সংসদ সদস্যদের ভোটে দ্বিতীয় বারের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবার সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্রার্থী থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমান সংসদে সরকারি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল অনেকটাই আগে থেকে অনুমান করা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।
তথ্য বলছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কেবল একবার রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট হয়েছিল। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর সংসদ সদস্যদের ভোটে আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। এরপর অনুষ্ঠিত সব রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেই প্রার্থী একজন থাকায় তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
জানা গেছে, গতকাল রোববার (৯ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ২টি ফরম সংগ্রহ করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। বিএনপির পক্ষে একটি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। অন্যটি সংগ্রহ করেছেন সরকারদলীয় চীফ হুইপ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মনি। ২টি ফরম সংগ্রহ করায় কৌতুহল বেড়েছে, শেষ পর্যন্ত কে হচ্ছেন রাষ্ট্রের অভিভাবক? তবে দুটি ফরম নেওয়া মানেই দুটি নির্দিষ্ট প্রার্থী চূড়ান্ত, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ বিএনপির হাতে এখনো কয়েক দিন সময় রয়েছে। ফরম সংগ্রহ করলেও এখনো জমা দেওয়া হয়নি। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে কৌতুহল জিইয়ে রাখলো ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। নির্বাচন কমিশনে ফরম জমা দেওয়ার আগ পর্যন্ত বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর নাম জানতে অপেক্ষা করতে হবে।
তবে সূত্র বলছে, বিএনপি দুটি ফরম সংগ্রহ করায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে হিসাব-নিকাশ। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামকেই বেছে নেবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, এমনটাই বলছে বিশ^স্থ সূত্র। কারণ এই দুই নেতার মধ্যে রাজনৈতিক বোঝাপড়া বেশ পুরোনো। ফ্যাসিবাদ বিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে বোঝাপড়ার কোনো ঘাটতি তৈরি হয়নি এই দুই নেতার মধ্যে। ফলে বেশ জোরেশোরেই উচ্চারিত হচ্ছে মির্জা ফখরুলের নাম। এছাড়া অধ্যাপক ড. আব্দুল মঈন খান ও মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম আলোচনায় থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোন দিকে যাচ্ছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে শেষ পর্যন্ত আলোচনায় থাকা কোনো নাম, নাকি একেবারে অপ্রত্যাশিত কাউকে বঙ্গভবনের জন্য বেছে নেয় বিএনপি, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে ফাইনাল উত্তর মিলতে অপেক্ষা করতে হবে মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার দিন পর্যন্ত। আর সেই অপেক্ষার সবচেয়ে বড় জায়গাটি এখন বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহল এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের দিকে। এখানেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল প্রকাশ্যে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দলীয় নীতিনির্ধারণী ফোরামের মাধ্যমে ঠিক হবে। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে দলীয় সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত সমন্বয়কারীর ভূমিকা যে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের হাতে থাকবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। আগের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও শেষ মুহূর্তে প্রত্যাশার বাইরে নাম আসার নজির তৈরি হয়েছে। স্পিকার হিসেবে মঈন খানের নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত হাফিজ উদ্দিন আহমদ নির্বাচিত হন। ফলে রাষ্ট্রপতি পদেও একই ধরনের কৌশল দেখা যাবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তার ওপর দুটি ফরম সংগ্রহের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে, বিএনপি কি আগে থেকেই একজনকে চূড়ান্ত করেছে, নাকি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সম্ভাবনার দরজা খোলা রাখা হয়েছে ? উত্তর মিলতে অপেক্ষা করতে হবে মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার দিন পর্যন্ত। আর সেই অপেক্ষার সবচেয়ে বড় জায়গাটি এখন বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহল এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের দিকে। বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, এই দুটি ফরম কার নামে জমা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
অপরদিকে আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। গতকাল রোববার সকাল সাড়ে ১১টায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের সরকারি বাসভবনে ১১ দলের বৈঠক শেষে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। ঐক্যের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন। এর আগে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে গত শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সাংবিধানিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে নতুন একটি প্রক্রিয়ার প্রস্তাব ছিল, যার মাধ্যমে সর্বজনগ্রহণযোগ্য একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা। জোটের প্রত্যাশা ছিল, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে সংস্কারকৃত সংবিধানের আলোকে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হবে। কিন্তু সরকার গণভোটের রায়কে অস্বীকার করেছে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ ও অধিবেশন এখনো হয়নি উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের অভিযোগও তোলেন তিনি।
নাহিদ বলেন, এমন পরিস্থিতিতে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং একজন অভিন্ন প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, অলি আহমদ বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং একাধিকবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দেশের চলমান সংকটে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার অভিভাবকত্ব প্রয়োজন বলে মনে করে জোট।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করায় সর্বসম্মতিক্রমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যে সুযোগ ছিল, তা তৈরি হয়নি। তবে ১১ দলীয় জোট প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বার্তা দিতে প্রার্থী দিয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য যোগ্য প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ১১ দলীয় জোটের বিবেচনায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
পরে অলি আহমদ বলেন, তাকে প্রার্থী করায় তিনি ১১ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ ও দেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞ। সবাই মনে করেছে, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এবং পরীক্ষিত একজন লোক, যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নাই, বলেন তিনি। অলি আহমদ বলেন, মানুষের জন্য যেটা ভালো, আমরা হারব বা জিতব, এটা প্রশ্ন না। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা জনগণের পাশে সবসময় তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য দাঁড়াব।
ব্রিফিংয়ে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্যের জন্য রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়া ১১ দলীয় জোটের দায়িত্বের অংশ। আমরা মনে করি, সর্বক্ষেত্রে রাজনীতি স্বচ্ছ হওয়া উচিত। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়া উচিত। তাহলে গণতন্ত্রের গতি এবং তার সুস্বাস্থ্য ফিরে আসবে। তিনি বলেন, দেশের কল্যাণের কথা বিবেচনা করেই রাষ্ট্রপতি পদে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আমরা দেশের কল্যাণের জন্য আমাদের বিবেচনায় সর্বোত্তম ব্যক্তিটাকেই এই দেশের প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দিয়েছি।






