গ্যাস-বিদ্যুতে স্থবির সিলেটের চা শিল্প
প্রকাশিত হয়েছে : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ২:০০:০৭ অপরাহ্ন
পচে নষ্ট হচ্ছে কাঁচা পাতা
লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অনিশ্চয়তা

মামুন পারভেজ: সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে চা শিল্পে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে। দেশের প্রধান চা উৎপাদনকারী এ অঞ্চলের বিভিন্ন বাগানের কারখানায় সময়মতো কাঁচা চা পাতা প্রক্রিয়াজাত করা যাচ্ছে না। বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে কাটিং, রোলিং, উইদারিং, সর্টিংসহ অধিকাংশ যন্ত্রপাতির কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্যাসের চাপ কম থাকায় ড্রায়িং বা চা পাতা শুকানোর প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি জুলাই-আগস্ট চা উৎপাদনের পিক-সিজন। এ সময়ে উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতিই নয়, চায়ের গুণগত মান ও বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
গত শুক্রবার রাতে সিলেট বিসিকের একটি সূত্র জানায়, শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছিল জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ। তবে পরে জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানায়, সাগর উত্তাল থাকায় এলএনজি খালাসে সাময়িক সমস্যা হয়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় গ্যাস সরবরাহও স্বাভাবিক হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ হলেও চাপ কম। আর বিসিক গোটাটিকর এলাকায় আজও (শনিবার) লোডলেডিং হয়েছে ৭ থেকে ৮ বার।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগে রয়েছে বিপুলসংখ্যক চা বাগান। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ১৯টি, মৌলভীবাজারে ৯১টি ও হবিগঞ্জে ২৫টি বাগান রয়েছে। প্রতিটি বাগানে আলাদা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা না থাকলেও বড় ও কেন্দ্রীয় কারখানায় আশপাশের একাধিক বাগানের কাঁচা পাতা প্রক্রিয়াজাত করা হয়। পুরো সিলেট অঞ্চলে চা উৎপাদনের জন্য নিবন্ধিত ও সক্রিয় কারখানার সংখ্যা আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০টি। এ অঞ্চলে এক লাখের বেশি স্থায়ী ও অস্থায়ী চা শ্রমিক কর্মরত। চা জনগোষ্ঠীসহ সংশ্লিষ্ট মানুষের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ।
চা কারখানা সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে দিনে গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এতে কারখানার মেশিনারি সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে কাটিং, রোলিং ও অন্যান্য মেশিন বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ ফিরে এলেও সব মেশিন তাৎক্ষণিকভাবে চালু করা সম্ভব হয় না।
সিলেটের চা শ্রমিকদের ভ্যালী সভাপতি রাজু গোয়ালা বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে সাত-আটবার লোডশেডিং হচ্ছে। ফ্যাক্টরিতে একবার মেশিন বন্ধ হলে তা আবার চালু হতে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লাগে। এর মধ্যে গ্যাসের চাপও কম। ফলে ড্রায়িং প্রসেসে চা পাতা ঠিকমতো শুকাচ্ছে না। এতে চায়ের গুণগত মানও খারাপ হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বিদেশে যদি চা রপ্তানি করা না যায়, তাহলে এ শিল্পে বিপর্যয় নেমে আসবে। শিল্পের ক্ষতি মানে শ্রমিকদেরও ক্ষতি।’
ন্যাশনাল টি এস্টেটের আওতাধীন লাক্কাতুরা চা বাগানের ব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে চা শিল্প ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বাগান থেকে চা পাতা সংগ্রহের পর ৮ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে তা প্রক্রিয়াজাত করা প্রয়োজন। সময়মতো প্রক্রিয়াজাত করা না হলে চায়ের গুণগত মান নষ্ট হবে।’
আনোয়ার হোসেন জানান, চা প্রক্রিয়াজাতকরণের শুরুতে কারখানায় কাঁচা পাতা এনে বাতাসের সাহায্যে অতিরিক্ত আর্দ্রতা কমিয়ে উইদারিং করা হয়। এরপর পাতা কাটিং ও রোলিং করা হয়। কালো চা তৈরির ক্ষেত্রে সিটিসি পদ্ধতিতে পাতাকে পিষে দানাদার করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময় ফার্মেন্টেশন বা জারণের মাধ্যমে পাতার রং ও সুগন্ধে পরিবর্তন আনা হয়। সবশেষে উচ্চ তাপমাত্রায় গরম বাতাসের মাধ্যমে ড্রায়িং করে পাতার আর্দ্রতা কমানো হয়। পরে সর্টিং ও গ্রেডিং শেষে চা প্যাকেটজাত করা হয়।
তিনি বলেন, ‘এসব প্রক্রিয়ার প্রায় পুরোটা বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। শুধু ড্রায়িং প্রক্রিয়ায় গ্যাসের ব্যবহার হয়। ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট একসঙ্গে দেখা দেওয়ায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’
‘সফিসটিকেটেড মেশিন পর্যাপ্ত লোড না পেলে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। প্রতিবার লোডশেডিংয়ের পর মেশিন পুনরায় চালু করতে হচ্ছে। এতে আমরা বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। এবার কাক্সিক্ষত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে,’ বলেন তিনি।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিকল্প হিসেবে অনেক কারখানাকে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে বাগান মালিকদের। ফলে চায়ের উৎপাদন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
জেরিন চা বাগানের ব্যবস্থাপক সেলিম রেজা বলেন, ‘আমাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া আগে থেকেই জেনারেটরনির্ভর। তবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস বন্ধ হয়ে গেলে ড্রায়িং প্রসেস ক্ষতির মুখে পড়বে। যার প্রভাব পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর পড়বে।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, কাঁচা চা পাতা দীর্ঘ সময় পড়ে থাকলে তা পচে যেতে পারে। ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে কারখানায় পাতা জমে থাকায় একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান কাঁচামাল।
চা উৎপাদনের দিক থেকে জুলাই ও আগস্ট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে উৎপাদন ব্যাহত হলে পুরো বছরের উৎপাদনে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ চা বোর্ড সারা দেশে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি বা ১০৪ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় চা বাগানের মালিকরা যেমন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, তেমনি শ্রমিকদের আয়, দৈনিক মজুরি ও রেশন ব্যবস্থাপনাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গ্যাস সংকটের বিষয়ে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিসন এ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের জিএম আতিকুর রহমান বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সাগর উত্তাল থাকায় এলএনজি খালাস করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘গতকাল শুক্রবার রাত থেকেই আল্লাহর রহমতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে।’
তবে চা শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত না করা গেলে চলতি মৌসুমে চা উৎপাদন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি এড়াতে পিক-সিজনে চা বাগান ও কারখানাগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।






