২১ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৩ লাখ কোটি টাকা
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬:০৬:৪৮ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক : খেলাপি ঋণ এবং প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা বাড়ায় চলতি বছর মার্চ প্রান্তিকে ২১টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা, যা তিন মাস আগে ডিসেম্বর প্রান্তিক পর্যন্ত ছিল ২ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। কিছু ব্যাংকে মূলধন উদ্বৃত্ত থাকায় ঘাটতির একটি অংশ সমন্বয় হয়। তবে এরপরেও মার্চ শেষে দেশের ৬১টি ব্যাংকের সার্বিক নিট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২.৩৯ লাখ কোটি টাকায়। ডিসেম্বরে এই নিট ঘাটতি ছিল ২.১৭ লাখ কোটি টাকা, অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে নিট ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, মূলধন ঘাটতি থাকার অর্থ হচ্ছে ব্যাংক খাতের বড় অংশ দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। আর এই অবনতির পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে ক্রমবর্ধমাণ খেলাপি ঋণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে পুরো ব্যাংকিং খাতের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২,০৫,৬৬৫ কোটি টাকায়, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ছিল ১,৯৮,২৬০ কোটি টাকা। পরবর্তীতে জুন মাস শেষে এই প্রভিশন ঘাটতি আরও বেড়ে ২,২২,৩৫৭ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫,৮৮,৭০৪ কোটি টাকায়, যা ব্যাংকিং খাতের মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩২.২৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, আর্থিক সক্ষমতার অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক ‘ক্যাপিটাল-টু-রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও’ বা সিআরএআর মার্চ শেষে আরও কমে ঋণাত্মক ৩.১৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশ।
মূলধন পর্যাপ্ততা বা সিআরএআর হলো ব্যাংকের মূলধন এবং তার ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাত। আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর জন্য ন্যূনতম ১২.৫ শতাংশ সিআরএআর বজায় রাখা আবশ্যক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে পাকিস্তানের ব্যাংকিং খাতে সিআরএআর ছিল প্রায় ২১ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় এটি ছিল ১৯ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে ভারতে ব্যাংকগুলোর গড় সিআরএআর ছিল ১৭.২০ শতাংশ।
২০২৬ সালের মার্চ শেষে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৬ হাজার ২৬৪.৮০ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি নিয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ৩১ হাজার ৬৮৭.১৭ কোটি টাকার ঘাটতি নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ৩০ হাজার ৯৩৬.৬৭ কোটি টাকা।
উচ্চ খেলাপি ঋণে জর্জরিত অন্যান্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ৩০ হাজার ৫৯৪.৫৬ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ৩০ হাজার ৩০২.২৩ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকের ১৮ হাজার ৩৫৪.৯০ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৬ হাজার ২৯৭.৬১ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ১১ হাজার ৯৮৪.৯৮ কোটি টাকা, এবি ব্যাংকের ৮ হাজার ৪৮৭.৫৯ কোটি টাকা এবং অগ্রণী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২৩৪.৯২ কোটি টাকায়।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, আর্থিকখাতে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার অংশ হিসেবে চলতি অর্থবছরে দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধন পুনর্গঠনে সরকার প্রায় ৪০,০০০ কোটি টাকা ব্যয় করছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকখাতে মূলত দুটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। প্রথমত, যেসব ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে তাদের ওপর আমানতকারীদের এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, যেসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো, মূলধন ঘাটতিতে নেই তারাও এক ধরনের চাপের মধ্যে পড়ে।







