মেধাবীদের প্রথম পছন্দ হোক শিক্ষকতা: প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশিত হয়েছে : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৫:০০ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক: শিক্ষকতা কোনোভাবেই ‘উপায়হীন বিকল্প’ বা সাধারণ চাকরির মতো পেশা হতে পারে না। শিক্ষা-দীক্ষায় সবচেয়ে মেধাবীরা যাতে কর্মজীবনে শিক্ষকতাকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেন, সে লক্ষ্যে শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি জড়িত। তাই শিক্ষকতার পেশাকে আরও সম্মানজনক, প্রতিযোগিতামূলক ও আকর্ষণীয় করতে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বেতন-ভাতা ও অবসরভাতা পেতে হয়রানি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ের ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত শিক্ষকরা অনুষ্ঠানে সম্মাননা পান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি জড়িত। সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা অক্ষুণœ থাকলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বাড়ে।’
দেশের সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষকরা যদি শিক্ষার্থীদের ‘প্রয়োজন এবং প্রিয়জন’ হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা আরও সহজ হবে।
শিক্ষা খাতকে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ বাজেট আরও বাড়ানো হবে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে দেশে প্রায় ২১ হাজার প্রতিষ্ঠান এবং তিন লাখের বেশি শিক্ষক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিচ্ছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ পর্যায়ের শিক্ষার বড় অংশই বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। শহর ও গ্রামের মধ্যে শিক্ষার সুযোগের যে পার্থক্য রয়েছে, তা দূর করে সব এলাকার শিক্ষার্থীর জন্য দক্ষ শিক্ষক ও আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পারিবারিক পাঠশালার গ-ি পেরোনোর পর প্রতিটি শিক্ষার্থীর সামনে শিক্ষক-শিক্ষিকারাই আদর্শ রোল মডেল। তাই শিক্ষকরা যাতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সামনে নিজেদের রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরতে পারেন, সে ধরনের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে সরকার।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের এ সময়ে প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির বাইরে এসে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য ‘শিখন’ ও ‘শিক্ষণ’ পদ্ধতির কৌশল পরিবর্তনের পাশাপাশি সিলেবাস আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।
বাস্তবতার নিরিখে সরকার নতুন সিলেবাস প্রণয়ন করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বছরের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা নতুন সিলেবাস অনুযায়ী বই হাতে পাবে। শুধু মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের মনে ‘কেন’ ও ‘কীভাবে’Ñএই প্রশ্ন জাগিয়ে তুলতে হবে। কৌতূহল তৈরি হলে একজন শিক্ষার্থী নিজেই নিজের শিক্ষক হয়ে উঠতে পারে।
শিক্ষার্থীদের বইবিমুখ হওয়া ঠেকাতে আনন্দময় শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সারা বিশ্বে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছে এ পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও এবার প্রথমবারের মতো ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ শিরোনামে নতুন একটি বই তুলে দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শ্রেণিতেও এ ধরনের বই দেওয়া হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জ্ঞান অর্জনের সুযোগকে অবারিত করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্টিফিকেটনির্ভর জ্ঞানের পরিবর্তে কারিগরি ও ব্যবহারিক জ্ঞান এখন অপরিহার্য। তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে শিক্ষকদের সামনেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোকে আরও আধুনিক করা জরুরি।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিকে শিক্ষকতার বিকল্প হিসেবে দেখতে চায় না সরকার। বরং প্রযুক্তি হবে শিক্ষকের শক্তি। এ লক্ষ্যেই ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় একজন শিক্ষক ট্যাবের মাধ্যমে ডিজিটাল লেসন প্ল্যান, প্রশ্নব্যাংক, শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষণসামগ্রী ব্যবহার করতে পারবেন। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সম্প্রসারণ ও ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে কোনো শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না। শিক্ষাজীবনের যেকোনো পর্যায়ে কেউ ঝরে পড়লেও যেন বেকার না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের মূল ভিত্তি হচ্ছে সমান সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার। কর্মমুখী শিক্ষা প্রয়োজন হলেও কর্মসংস্থানই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনও শিক্ষার অন্যতম মূল উদ্দেশ্য। সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও অন্যের প্রতি সম্মানকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন শিক্ষককে শুধু বেতন বা অবসরভাতার জন্য কষ্ট করে অফিসে ঘুরতে হবে না। যথানিয়মে যথাসময়ে তাঁর প্রাপ্য অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে পৌঁছে দিতে হবে।
এ ছাড়া স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অন্তত একজন করে শিক্ষককে বাধ্যতামূলকভাবে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য চলতি বছর থেকে নীতিমালার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন শিক্ষক কর্মরত থাকুন কিংবা অবসর জীবনে, তাঁর মহান পেশার কারণেই আমৃত্যু তিনি রাষ্ট্রের কাছে সম্মানীয়। দেশের শিক্ষকরাই জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া।





