ইউএনওকে আপা ডাকায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ জুন ২০২৬, ৮:৪৬:২৮ অপরাহ্ন

ওসমানীনগর প্রতিনিধি : ওসমানীনগরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে আপা ডেকে অভিজাত মিষ্টির শো-রুম কর্মচারীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করার খবর পাওয়া গেছে| অন্যদিকে মিষ্টির শো-রুমে জরিমানা করায় ঐ কর্মচারীকে চাকুরী থেকে বহিষ্কার করা হয়| পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে ঐ কর্মচারীর চাকুরী বহাল হলেও তাকে শো-রুম থেকে কারখানায় স্থানান্তর করা হয়েছে| ইউএনও’র একটার পর একটা বিতর্কিত কর্মকান্ডে বর্তমান সরকারকে কৌশলে বিতর্কিত করার অভিযোগ করছেন অভিজ্ঞমহল|
জানা যায়, ঈদুল আযহার আগে পার্শ্ববর্তী বালাগঞ্জ’র ইউএনও তাজপুর বাজারস্থ বনফুল শো-রুম থেকে মিষ্টি কিনে নেন| বাসায় নেওয়ার পর দেখেন, মিষ্টিগুলো পুরাতন| এরপর বালাগঞ্জ ইউএনও বিষয়টি ওসমানীনগর ইউএনও’কে জানান| ঈদের পরদিন শুক্রবার বিকালে ওসমানীনগর ইউএনও একা সাধারণ ক্রেতা হিসেবে তাজপুর বাজার বনফুল শো-রুমে আসেন| এসময় তিনি কর্মচারী মান্নানকে জিজ্ঞেস করেন, এই মিষ্টিগুলো কি নতুন? কর্মচারী মান্নান ক্রেতা হিসেবে (ইউএনকে) জানায়, ড্রাই মিষ্টিগুলো ঈদের আগের আর নরমাল মিষ্টিগুলো আজকের| ইউএনও তখন কর্মচারী মান্নানকে বলেন, তোমরা মানুষকে বাজে মিষ্টি দাও, আমার কাছে অভিযোগ আছে| তখন কর্মচারী মান্নান বিষয়টি ম্যানেজারকে জানাতে বলেন| তাৎক্ষণিক ইউএনও উত্তেজিত হয়ে বলেন, এই তুমি বেয়াদবি করছো, চেনো আমি কে? আমি ইউএনও, আমি তোমাকে জেলে দেবো! একথা শুনে কর্মচারী মান্নান ভয়ে শো-রুম থেকে পালিয়ে যায়|
খবর পেয়ে শো-রুমের প্রধান ম্যানেজার সুহেল বড়ুয়া এসে বিষয়টি জেনে ইউএনও’কে শান্ত করেন এবং কর্মচারী মান্নানকে আনতে বাসায় লোক পাঠান| বাসায় গিয়ে দেখা যায় মান্নান মসজিদে নামাজে চলে গেছেন| ম্যানেজার তখন ঐ লোককে মসজিদে পাঠান| মসজিদে গিয়ে মান্নান নামাজে দাঁড়িয়েছেন দেখে ম্যানেজারকে জানালে নামাজ শেষ হলে তাকে নিয়ে আসতে বলা হয়| এসময় সহকারী ম্যানেজার ক্যাশ টেবিলে চেয়ারে বসে কথা বলছিলেন| তখন ইউএনও রেগে প্রধান ম্যানেজারকে বলেন, এইটাও বেয়াদব, দেখেন চেয়ারে বসে কথা বলছে|
এরপর ম্যানেজার ইউএনওকে সরি বলে ক্ষমা চান| ততক্ষণে কর্মচারী মান্নানকে নিয়ে আসা হয়| ম্যানেজার সুহেল মান্নানকে ইউএনও’র কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন| মান্নান তখন ‘আপা ভুল হয়েছে, আমাকে মাফ করে দেন’ বললে, ইউএনও রেগে পুলিশ ডেকে মান্নানকে পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা করেন| বিষয়টি বনফুল কর্তৃপক্ষ জেনে মান্নানকে চাকুরী থেকে বরখাস্ত করেন|
১ জুন দুপুরে স্থানীয় সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা উপজেলা পরিষদে আসলে কর্মচারী মান্নান বিষয়টি নিয়ে এমপি লুনার দ্বারস্থ হন| এমপি লুনা তার চাকুরী বহাল রাখতে স্থানীয় বিএনপির দুই নেতাকে বনফুল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে দায়িত্ব দেন| বর্তমানে মান্নানকে সিলেট নগরীর খাদিম বিসিক শিল্প এলাকায় বনফুলের কারখানায় বদলি করা হয়েছে|
বনফুল শো-রুম কর্মচারী মান্নান বলেন, তিনি সাধারণ ক্রেতা হিসেবে শো-রুমে এসে মিষ্টিগুলো কি বাসি এমন প্রশ্ন করেন| আমি তখন বলি, ড্রাই মিষ্টি আগের ও নরমাল মিষ্টি আজকের| তখন তিনি বলেন, বালাগঞ্জ ইউএনও অভিযোগ করেছেন, তোমরা বাসি মিষ্টি দিয়েছো, তাছাড়া আমার কাছে আরো অভিযোগ রয়েছে| তখন আমি ক্যাশে ম্যানেজার স্যারের সাথে কথা বলতে বলি| এতে ক্ষেপে গিয়ে তিনি বড় অফিসার বলে আমাকে জেল দেবেন বলেন| আমি তখন ভয়ে পালিয়ে যাই| এরপর ম্যানেজার স্যার আমাকে ডেকে এনে তার কাছে মাফ চাইতে বললে, আপা আমাকে ক্ষমা করে দেন বলি| এতে তিনি আরো ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশ ডেকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন| আমি ৩২ বছর ধরে বনফুলে চাকরি করছি, আমার কোন বাজে রেকর্ড নেই| এটা আমার উপর অবিচার করা হয়েছে| আমি এখন সিলেট কারখানায় আছি|
বনফুলের তাজপুর বাজার শো-রুম ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়া বলেন, দোকান কর্মচারী মান্নান ইউএনও ম্যাডামকে না চিনে গুরুত্ব দেয়নি| তাই তাকে ক্ষমা চাইতে বলি| সে তখন আপা ক্ষমা করে দেন বলে ফেলে| এতে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়| আপনারা বাসি মিষ্টি বিক্রি করেন এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ড্রাই মিষ্টি একদুই দিন আগের থাকে, নরমাল মিষ্টি নতুনই থাকে| কখনো গরমে কোন মাল নষ্ট হলে আমরা সাথে সাথে চেক করে আউট করে দেই|
ওসমানীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস টি এম ফখর উদ্দিন বলেন, ভুক্তভোগী ব্যক্তি বিষয়টি নিয়ে সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনার কাছে এসেছিলেন| এমপি উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনেছেন| তবে ঘটনার বিস্তারিত জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করলে ভালো হবে|
বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, আমি অথবা আমার কোন স্টাফ হয়তো মিষ্টি কিনতে পারি| ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমার কলিগ| তিনি আপা ডাকার জন্য জরিমানা করতে পারেননা| হয়তো ক্রেতা হিসেবে গিয়ে ঐ আউটলেটে কোন সমস্যা দেখতে পেয়ে তিনি জরিমানা করেছেন| আর বিচারকার্য পরিচালনার সময় পক্ষপাত এড়াতে ইউএনও মহোদয় বা যাস্ট ইউএনও বলাই ভালো| ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশা’র সরকারি মোবাইলে কল দিলে তিনি কল রিসিভ করেননি|
উল্লেখ্য বর্তমান ইউএনও ওসমানীনগরে যোগদানের পর তার বিরুদ্ধে নির্বাচনী সিসিটিভি ক্যামেরা প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ হয়| ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকার ক্রয়কৃত সরকারি চাল রাখার অভিযোগে উপজেলা ছাত্রদল নেতা আবিরকে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা করেন| বারুনী মেলায় লটারির টিকেট বিক্রির অভিযোগে যুবদল নেতাকে জেল জরিমানা করেন আবার পরদিন তার নাকের ডগায় লটারির টিকেট বিক্রি ও ড্র সম্পন্ন হয়| সিসিটিভি প্রকল্পের বিরুদ্ধে কথা বলায় তাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে সরিয়ে ছুটির দিনে তড়িঘড়ি করে ইউনিয়নে প্রশাসক বসানো হয়| ইউএনওকে প্রত্যাহারের দাবীতে ইতোপূর্বে তাজপুর বনফুলের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়|





