সাংবাদিক তোরাব : একটি রক্তাক্ত স্মৃতি
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১:২১:৪৫ অপরাহ্ন
নিজাম উদ্দীন সালেহ:

সত্তরের দশকে একটি বাংলা ম্যাগাজিনে একটি কার্টুন ছাপা হয়েছিল। কার্টুনে স্ট্যান্ডের ওপরে একটি ক্যামেরা বসানো এবং ক্যামেরার সামনে একটি কালি কলমের অগ্রভাগ অঙ্কিত ছিল। কার্টুনটিতে কোনো মন্তব্য লেখা ছিল না। আমি কার্টুনটি নিয়ে বেশ ভেবেছিলাম মনে হলো, একজন ক্যামেরাম্যান তথা ফটো সাংবাদিকের ক্যামেরাই তার কলম বা লেখনী। সাংবাদিকরা কলম দিয়ে লেখেন, আর ফটো সাংবাদিকরা লেখেন ক্যামেরা দিয়ে। উভয়টিই গুরুত্বপূর্ণ, উভয়টিই ঝুঁকিপূর্ণ। আমার এই অনুভূতি বর্তমান সময়ে কিছুটা সংশোধিত হয়েছে। আমি বুঝতে পারছি, ফটো সাংবাদিকদের পেশা এখন অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষভাবে যারা যুদ্ধ বিগ্রহ ও আন্দোলন সংগ্রামকালে মাঠে ময়দানে ও রাজপথে কাজ করেন, দায়িত্ব পালন করেন। এমনি এক ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশের জনগণের জীবনপণ সংগ্রামে জুলাইয়ের এক উত্তাল দিনে আমরা হারিয়েছি আমাদের পত্রিকার তারুণ্যদীপ্ত উদ্যমী ও সাহসী সাংবাদিক আবু তুরাবকে। তুরাব শুধু ফটো ফটো সাংবাদিকই ছিলেন না, আঞ্চলিক ও জাতীয় পত্রিকার কলম সাংবাদিকেরও দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু তাকে শাহাদাত বরণ করতে হয়েছে ফটো সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও স্বৈরাচার বিরোধী বিপ্লব আন্দোলনকালে রাজপথে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। হত্যাকারী স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের সশস্ত্র লাঠিয়াল পুলিশ বাহিনী। সিলেট নগরীর বন্দর বাজার ও জিন্দাবাজারের মধ্যবর্তী কাল্টেরেট মসজিদের নিকটে দাঁড়িয়ে জালিম পুলিশ কর্মকর্তা গুলি করে রক্তাক্ত করে তাকে হত্যা করে। তুরাব তখন স্বৈরাচারী বিরোধী আন্দোলনকারীদের মিছিলের ছবি তোলার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। যুগ যুগ ধরে বিশ^জুড়ে তুরাবের মতো সৈনিকেরা এভাবে হতাহত হয়ে আসছেন জালিম শাসকগোষ্ঠী ও তাদের লালিত পালিত খুুনিদের হাতে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরাক যুদ্ধের সময় মার্কিন বিমান ও অন্যান্য বাহিনী কর্তৃক ইরাকী সাংবাদিক হত্যার লোমহর্ষক দৃশ্য আজো শিহরিত করে বিশে^র সকল সচেতন ও বিবেকবান মানুষকে। যারা হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে সাংবাদিকদের হত্যা করেছিল, তারাই এমন দৃশ্য ধারণ করে পত্র পত্রিকায় দিয়েছিল ছাপতে। কী হৃদয়হীন অমানবিকতা! আর গাজা যুদ্ধে ইসরাইল তো তালিকা তৈরি করে একে একে সব ফিলিস্তিনী সাংবাদিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেছে। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্ট’ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সাল পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলী বাহিনীর হাতে নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা দুই শতাধিক। অপরদিকে ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্ট’-এর তথ্য মতে গাজা যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ২৬৩ জন সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মী নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২৩৬ জনই ফিলিস্তিনী। অনেকের মতে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। এ কারণ নিয়ে যাচাই বাছাই ও অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি।
যা-ই হোক, বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লব ছিল দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর অতি অল্প সময়ে বিপুল প্রাণোৎসর্গ ও রক্তদানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্বৈরশাসক খুনি হাসিনা সরকারের সতেরো বছরের খুন গুম ছাড়াও শুধু আন্দোলনকারীদের নির্বিচার হত্যাকান্ডটি একটি দুনিয়া কাঁপানো ঘটনা। ভিন্নমত দমনে স্বৈরশাসক হাসিনা এমন কোনো অন্যায় অপকর্ম ও অপরাধ নেই, যা সে করেনি। গোটা দেশের মিডিয়াকে কঠিন শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রেখেছিল সে। কিছু সংখ্যক সাংবাদিক ও মিডিয়া মালিককে অর্থ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দিয়ে বশ করেছিল সে। যাদের এভাবে বশ করতে পারেনি, তাদের নির্যাতন নিপীড়ন ও ভয়ভীতির খড়গের নিচে নিয়ে এসেছিল। এরপরেও যাদের কোনোভাবেই সে নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলিত করতে পারেনি, তাদের গুপ্ত হত্যা ও মিছিলে গুলি করে নিশ্চিহ্ন করার পন্থা অবলম্বন করেছিল। দুর্দমনীয় সাংবাদিক তুরাব ছিলেন এমনি এক গভীর চক্রান্তের শিকার। সেই চক্রান্তকারী ও তাদের সহযোগীরা আজো এদেশের মাটিতে টিকে আছে, নিঃশ^াস নিচ্ছে। কিন্তু তুরাব নেই। যৌবনেই তার তারুণ্যের মিশন থামিয়ে দিয়েছে ঘাতকরা। আজ তার পরিবার পরিজন ও স্বজন নিয়ে সুখে দুঃখে দিন কাটানোর কথা ছিল। কিন্তু তার গতি চিরতরে স্তব্ধ করে স্বৈরাচারের নখর। তথ্য প্রযুক্তির এই নখরগুলোর অনেকটাই এখন সনাক্তকৃত। তাদের বিষদাঁত ওপড়ে ফেলার দাবি জানিয়েছেন এদেশের জনগণের। ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরাচারী শাসক যেনো এমন দানব বা ডাইনী হয়ে ওঠতে না পারে, এজন্য স্বৈরশাসনের এই বিষবৃক্ষ শেকড় শুদ্ধ ওপরে ফেলতে হবে। তুরাবের শাহাদাতের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে আমরা তার মাগফেরাত কামনা করি। একই সঙ্গে প্রত্যাশা করি সাংবাদিক তুরাব হত্যার ন্যায় বিচার ও অপরাধীদের উপরোক্ত শাস্তি।
লেখক: সহকারী সম্পাদক দৈনিক জালালাবাদ।





