ধ্বংসের পথে এমসি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মুরারী সেনের বাড়ি
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭:৩৯:৫৮ অপরাহ্ন

বালাগঞ্জ সংবাদদাতা: সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারী চাঁদ (এমসি) কলেজ ও রাজা জিসি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা রাজা গিরিশ চন্দ্র রায়ের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি এখন ধ্বংসের পথে। ঐতিহাসিক এ বাড়িটি বালাগঞ্জ উপজেলার বালাগঞ্জ ইউনিয়নের বোয়ালজুড় বাজারসংলগ্ন চরভিতা গ্রামে অবস্থিত। বর্তমানে বাড়িটি স্থানীয়ভাবে ‘তফাদার বাড়ি’ নামে পরিচিত।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চরভিতা গ্রামের কৃতী সন্তান মুরারী চাঁদ সেন ছিলেন একজন জমিদার। তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। পরবর্তীতে তাঁর পালকপুত্র রাজা গিরিশ চন্দ্র রায় এ জমিদারি সম্পত্তির দায়িত্ব নেন।
রাজা গিরিশ চন্দ্র রায় ১৮৪৫ সালের মার্চ মাসে চরভিতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন দ্বীপচন্দ্র নন্দী। পাঁচ বছর বয়সে তিনি ‘মুরারী চাঁদ এস্টেট’-এর মালিক মুরারী চাঁদের পরিবারের মাধ্যমে দত্তকপুত্র হিসেবে গৃহীত হন।
জানা যায়, যৌবনে গিরিশ চন্দ্র রায় কুসংসর্গে বিপথে চলে গেলেও ১৮৭৪ সালে লর্ড নর্থব্রুক সিলেটে আসার সময় তাঁকে দরবারে আমন্ত্রণ না জানানোর ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে পরিবর্তিত হন। এরপর তিনি সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন।
১৮৮৬ সালে তিনি ‘মুরারী চাঁদ স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠানটি কলেজে উন্নীত হয়, যা পরবর্তীতে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে কলেজটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি নিজের ঘরবাড়ি মেরামত না করে কলেজ পুনর্নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন।
এ ছাড়া রাজা গিরিশ চন্দ্র রায় রাজা জিসি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়ও ভূমি দান করেন। তিনি বাঙালিদের মধ্যে প্রথম চা-বাগান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন বলেও স্থানীয়ভাবে জানা যায়। ন্যায়পরায়ণ, ধার্মিক, সমাজসেবক ও পরোপকারী হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘রায় বাহাদুর’ এবং ১৮৯২ সালে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯০৮ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এ জমিদার বাড়িকে ঘিরে নানা গল্প প্রচলিত ছিল। জমিদার বাড়িতে সাধারণ মানুষের প্রবেশেও নানা বিধিনিষেধ ছিল বলে প্রবীণরা জানান। বাড়ির পাশে থাকা একটি কুয়া নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে বিভিন্ন কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে।
পরবর্তীতে মুরারী চাঁদ ও ব্রজ সুন্দরীর পর রাজা গিরিশ চন্দ্র রায়ের ভাগ্নে ‘সীতা বাবু’ বাড়িটির মালিক হন বলে স্থানীয়রা জানান। পরে তিনি সুলেমান খাঁর সঙ্গে বাড়ি বিনিময় করে ভারতে চলে যান। সুলেমান খাঁ পরবর্তীতে বাড়িটি আজাদ মিয়া ও আব্দুল হক (মাস্টার) গংয়ের কাছে বিক্রি করেন। তবে সময়ের পরিক্রমায় ঐতিহাসিক এ বাড়ির কোনো উল্লেখযোগ্য স্থাপনা বা পুরোনো নিদর্শন এখন আর অবশিষ্ট নেই। বাড়িটি বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় ধ্বংসের পথে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সিলেটের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এ স্থাপনাটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হলে এটি বালাগঞ্জের অন্যতম ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।







