গণতন্ত্র রক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াই এখন বড় দায়িত্ব : নাগরিক সংবর্ধনায় রাষ্ট্রপতি
প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯:২৬:০৫ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে দেশে যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা রক্ষা করে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এখন সবার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। সরকারি ও বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা, সংসদকে কার্যকর করা এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা। গণতন্ত্রের এই সুযোগ কোনোভাবেই অবহেলায় নষ্ট করা যাবে না।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নগর ভবন প্রাঙ্গণে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি উপরোক্ত কথা বলেন। সিলেটবাসীর দেওয়া এ সংবর্ধনায় রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগমও উপস্থিত ছিলেন।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে নগর ভাবনে বর্ণিল আয়োজনে অনুষ্ঠিত নাগরিক সংবর্ধনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এমপি, জাতীয় সংসদের হুইপ জিকে গউছ এমপি ও রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি বলেন, গত ১৫-১৬ বছর দেশের ইতিহাসে একটি জটিল সময় গেছে। গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে। অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন, অনেকে আহত হয়েছেন। বহু ত্যাগ, রক্তপাত ও সন্তানদের প্রাণের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়ে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির সুযোগ এসেছে। এখন নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়েছে। সরকারের সামনে বড় দায়িত্ব ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে পুনর্গঠন করে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা।
তিনি বলেন, শুধু নির্বাচন আয়োজন করলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না; গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে হয়। সংসদকে যথাযথভাবে কাজ করতে হবে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, সেটিই স্বাভাবিক। তবে তা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। দেশের পুনর্গঠন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এখনকার বড় চ্যালেঞ্জ।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘গণতন্ত্র পেয়েছি। গণতন্ত্রকে রক্ষা করা এখন আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ, সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।’ তিনি দল-মত নির্বিশেষে দেশের অভিন্ন স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের যে সাধারণ বিষয়গুলো আছে, সেই বিষয়গুলোতে আমরা একমত হই। একমত হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাই।’
বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশংসা করে তিনি বলেন, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। এই সম্প্রীতি বাংলাদেশের অন্যতম সৌন্দর্য। দেশের অগ্রযাত্রায় এ ঐক্য ও সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রাখতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সিলেটের মানুষ সংগ্রামী ও সাহসী:
সিলেটের সঙ্গে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, সিলেট তাঁর অত্যন্ত প্রিয় এলাকা। সুযোগ পেলেই তিনি সিলেটে আসেন। অতীতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে সিলেটে এসেছেন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনেও এখানকার মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তিনি বলেন, সিলেটের মানুষ যেমন অতিথিপরায়ণ ও শান্তিপ্রিয়, তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহসও রাখেন। গণতন্ত্রের আন্দোলনে সিলেটবাসী অতীতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সিলেটের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি, সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য। হাছন রাজা, রাধারমণ দত্ত, শাহ আবদুল করিম, হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো বহু গুণী মানুষের জন্ম ও কর্মের সঙ্গে এ অঞ্চল জড়িত। মুক্তিযুদ্ধেও সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, সিলেটের সন্তান এম সাইফুর রহমান এ বিভাগের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। নিখোঁজ জননেতা এম ইলিয়াস আলীও সিলেটের সন্তান, তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সিলেটের মানুষ অতীতে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছে, আগামীতেও নেতৃত্ব দেবে।
পর্যটন, কৃষি ও প্রবাসী বিনিয়োগে বড় সম্ভাবনা:
সিলেটের উন্নয়ন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, পাহাড়, নদী, ঝরনা, চা-বাগান, বন ও হাওর সবমিলিয়ে সিলেট দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন অঞ্চল। পরিকল্পিতভাবে এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে পর্যটন খাতে বড় ধরনের উন্নয়ন সম্ভব।
তিনি বলেন, সিলেটের প্রবাসী সমাজ শুধু এ অঞ্চলের অর্থনীতিতেই নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তাঁদের বিনিয়োগ পর্যটনের পাশাপাশি কৃষি, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত শিল্প, চা, মৎস্য, গ্যাস, তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে কাজে লাগাতে হবে। হাওর ও জলাশয়কে কেন্দ্র করে মৎস্য চাষ এবং প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর নতুন শিল্প গড়ে তোলারও সুযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি ও প্রবাসী বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে কাজ করছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কয়েকটি শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ খাত আগামী দিনে আরও এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সিলেটের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ অঞ্চলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিরা বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন। বেশ কিছু বড় উন্নয়ন প্রকল্পও এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, নিজেদের অধিকার ও উন্নয়নের জন্য নিজেদেরও উদ্যোগী হতে হবে। নিজেদের সামর্থ্য ও ঐক্যকে কাজে লাগাতে হবে। ‘আমরা যদি নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে না পারি, আমরা যদি নিজেদের দাবি নিজেরা আদায় করে নিতে না পারি, কেউ এসে আমাদের জন্য করে দিয়ে যাবে না’-বলেন তিনি।
সিলেটের মানুষের ভালোবাসা ভুলব না:
সিলেটবাসীর উষ্ণ আতিথেয়তার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সিলেটের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে। সিলেটের মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতা তিনি সবসময় স্মরণ করবেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি বলেন, দীর্ঘদিন রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে তাঁরা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। সেই আন্দোলনের সফলতার পর এখন জাতির প্রত্যাশা অনেক। তিনি জানান, চলতি শীতেই সিলেটের রাস্তাঘাটের কাজ শুরু হবে এবং ছয় লেনের কাজ ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। ন্যায় ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় অধ্যবসায়ের মাধ্যমে কাঙ্খিত সাফল্য অর্জনের উদাহরণ হিসেবে রাষ্ট্রপতির সংগ্রামী ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এমপি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি সিলেটের প্রতিটি এলাকায় ঘুরেছেন। রাষ্ট্রপতিকে দেখতে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে তিনি সিলেটের পাথরখাত, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী সিলেট নগরীকে ‘গ্রিন ও ক্লিন সিলেট’ হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার। বক্তব্য দেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. কামাল আহমদ চৌধুরী, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. জিয়াউর রহমান চৌধুরী, সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকবাল আহমদ সিদ্দিকী, ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিনিধি আমিরুজ্জামান চৌধুরী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি প্রশান্ত কুমার সিংহ এবং সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম ইয়াহিয়া চৌধুরী সুহেল। তাঁরা সিলেটের উন্নয়ন, নাগরিক সুবিধা ও সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য, বঙ্গভবনের কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, পেশাজীবী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবর্ধনা শেষে সিলেটের স্থানীয় সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির সম্মানে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।






