কারিগরি শিক্ষায় কমছে আগ্রহ
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ৭:০৯:৩০ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট: দেশে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে। শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ, কৃষি ও টেক্সটাইলÑ প্রায় প্রতিটি খাতেই দক্ষ কর্মীর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে। সরকারও কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো প্রবণতা। একদিকে বাড়ছে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আসন, অন্যদিকে শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে না অনেক প্রতিষ্ঠানেই।
এ পরিস্থিতির বড় উদাহরণ দেশের ৮৬টি বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। টানা তিন বছর ধরে এ সব প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়নি। ফলে আগামী ২০২৭-২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের ভর্তি কার্যক্রম স্থগিতসহ পাঠদানের অনুমোদন বাতিল বা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (বিটিইবি)। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে।
বিটিইবির পরিদর্শক প্রকৌশলী বিএম আমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, অনুমোদনের শর্ত অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠান পরপর তিন বছর শিক্ষার্থী ভর্তি না করলে তার পাঠদানের অনুমোদন বাতিল করা হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১ অক্টোবরের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
বোর্ডের তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৮৬টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩৪টি জেলায়। সবচেয়ে বেশি রাজশাহীতে ৯টি। এরপর রংপুরে ৮টি, খুলনায় ৭টি ও ঢাকায় ৫টি। ফরিদপুর ও সিরাজগঞ্জে রয়েছে ৪টি করে। গাইবান্ধা, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর ও কুমিল্লায় ৩টি করে প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
তবে ৮৬টি প্রতিষ্ঠানের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো চিত্র নয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বেসরকারি পলিটেকনিকগুলোতে ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি আসন থাকলেও ভর্তি হয়েছে মাত্র ৩০ হাজার ৬১৪ জন। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক আসন খালি পড়ে রয়েছে।
কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী না আসার পেছনে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্মসংস্থান। এসএসসি পাসের পর একজন শিক্ষার্থী ও তার পরিবার কয়েক বছর সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করে ডিপ্লোমা করতে চায়। কিন্তু পড়াশোনা শেষে চাকরির নিশ্চয়তা কতটাÑ সেটিই এখন তাদের বড় উদ্বেগ।
ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা কারিগরি শিক্ষা নিচ্ছি মূলত দ্রুত কর্মজীবনে প্রবেশের জন্য। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করার পর চাকরির সুযোগ কতটা আছে, সেটি নিয়ে আমাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অনেক সময় যে চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখি, সেখানে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। আবার বেতনও প্রত্যাশার তুলনায় কম। ফলে অনেকেই শুরুতেই সাধারণ শিক্ষার দিকে চলে যেতে চায়।’
এদিকে, বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানে পড়ার ক্ষেত্রে অভিভাবককে ভর্তি ও টিউশন ফি ছাড়াও যাতায়াত, থাকা-খাওয়া, শিক্ষা উপকরণ ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের খরচ বহন করতে হয়। কয়েক বছর পড়াশোনার পরও যদি চাকরি নিশ্চিত না হয়, তাহলে পুরো বিনিয়োগ নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
শিক্ষাবিদ ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, কারিগরি শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে হলে প্রথমে এর ফলাফল দৃশ্যমান করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী ডিপ্লোমা শেষ করে কী ধরনের চাকরি পাচ্ছে, কী বেতন পাচ্ছে এবং আরও উচ্চশিক্ষার কী সুযোগ রয়েছেÑ এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে। শুধু প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দিয়ে আসন তৈরি করলেই শিক্ষার্থী সেখানে ভর্তি হবে না।
এই শিক্ষাবিদের মতে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদার সঙ্গে পাঠ্যক্রমের সমন্বয় না থাকলে কারিগরি শিক্ষা তার মূল উদ্দেশ্য হারাবে। আধুনিক ল্যাব, দক্ষ প্রশিক্ষক এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
বিটিইবির কর্মকর্তারা জানান, কারিগরি শিক্ষার মূল শক্তি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানের ল্যাব ও প্রশিক্ষণ সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হলেও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে পুরনো প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের সংকটও বড় সমস্যা। দক্ষ শিক্ষক ছাড়া শুধু যন্ত্রপাতি থাকলেই ব্যবহারিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আবার শিক্ষক থাকলেও পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা না থাকলে সেই শিক্ষা বাস্তবমুখী হয় না।
জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি পলিটেকনিকগুলোতে ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি আসনের বিপরীতে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে মাত্র ৩০ হাজার ৬১৪ জন। অর্থাৎ আসনের বড় অংশই খালি। এর মধ্যে আবার ৮৬টি প্রতিষ্ঠানে টানা তিন বছর একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়নি। তাই এখন প্রশ্ন শুধু ওই ৮৬টি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন থাকবে কিনা, তা নয়। এটি দেশের শিক্ষা পরিকল্পনা ও শ্রমবাজারের মধ্যে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতারও ইঙ্গিত।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন যখন এত বেশি, তখন কারিগরি শিক্ষার বিপুলসংখ্যক আসন খালি পড়ে থাকা শুধু শিক্ষার্থীর অনীহার বিষয় নয়। কারিগরি শিক্ষার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে তাই শুধু নতুন প্রতিষ্ঠান খোলা বা পুরনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিল নয়; প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, শিল্পের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ এবং ডিপ্লোমা শেষে নিশ্চিত কর্মসংস্থানের পথ।






