বাল্যবিয়ে সর্বনিম্ন সিলেটে, সর্বোচ্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জে
প্রকাশিত হয়েছে : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ৯:১৪:৪৮ অপরাহ্ন

জালালাবাদ রিপোর্ট : দারিদ্র্য ও শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে দেশের অন্য অঞ্চলগুলোর তুলনায় এগিয়ে রয়েছে সিলেট। জাতীয় পর্যায়ে ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ের হার যেখানে ৪৭ শতাংশের বেশি, সেখানে সিলেট বিভাগে এ হার সবচেয়ে কম। অন্যদিকে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হিসাবে বাল্যবিবাহের সর্বোচ্চ হার পাওয়া গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে।
২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ক্ষুদ্র-এলাকাভিত্তিক প্রাক্কলনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
এমআইসিএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। এদের মধ্যে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়সের আগেই। আর জরিপের সময় ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ বিবাহিত ছিলেন।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি রাজশাহীতে, ৬৭ শতাংশ। এরপর খুলনায় ৬৫, রংপুরে ৬৩, বরিশালে ৬১, ঢাকায় ৫৩ এবং চট্টগ্রামে ৫১ শতাংশ। বিপরীতে সিলেটে এ হার ২৯ শতাংশ, যা দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহের হার ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ; শহরাঞ্চলে তা ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ।
জানা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানেও বাল্যবিবাহ কমার গতি ধীর বলে প্রতীয়মান হয়। ১৯৯৩-৯৪ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) অনুযায়ী, সে সময় ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৭৩ শতাংশের বিয়ে হয়েছিল ১৮ বছর হওয়ার আগে। ২০১৯ সালে এ হার ছিল ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ। আর ২০২২ সালের হিসাবে তা প্রায় ৫১ শতাংশে নেমে আসে। সর্বশেষ এমআইসিএস জরিপে হার দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশে।
অর্থাৎ কয়েক দশকে বাল্যবিবাহের হার কমলেও এখনও দেশের প্রায় প্রতি দুই তরুণীর একজনের বিয়ে হচ্ছে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই। ইউনিসেফের শিশু সুরক্ষাবিষয়ক তথ্যেও বাংলাদেশের বাল্যবিবাহের জাতীয় হার হিসেবে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষা ও সচ্ছলতাও পুরোপুরি সুরক্ষা দিচ্ছে না:
সাধারণভাবে শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতাকে বাল্যবিবাহ কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বাংলাদেশের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি থাকলেও বাল্যবিবাহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এমআইসিএস ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করা ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ২৫ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে।
এমনকি সবচেয়ে সচ্ছল পরিবারগুলোর মধ্যেও ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ নারীর বাল্যবিবাহের তথ্য পাওয়া গেছে। শহর ও গ্রামের মধ্যে এ ক্ষেত্রে ব্যবধানও তুলনামূলক কম। শহরে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রামে ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ নারীর বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে।
জানা গেছে, বিবিএসের ২০২৪ সালের ক্ষুদ্র-এলাকাভিত্তিক প্রাক্কলনে দেশের ৫৪১টি উপজেলায় ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের বাল্যবিবাহের হার ৩৮ দশমিক ৩ থেকে ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে পাওয়া গেছে। এ হিসাবে সিলেট বিভাগের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো। বিভাগের প্রতিটি উপজেলায় বাল্যবিবাহের হার ৪৩ শতাংশের নিচে; সর্বনিম্ন ৩৮ দশমিক ৩ এবং সর্বোচ্চ ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ।
উপজেলাভিত্তিক হিসাবে দেশের সর্বনিম্ন হার সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে, ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ। জেলা পর্যায়েও সুনামগঞ্জে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে কম বলে প্রাক্কলনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের সর্বোচ্চ হার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরে, ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক চিত্রে খুলনা ও রাজশাহীতে বাল্যবিবাহের বিস্তার বেশি। খুলনা বিভাগের ৬৪টি উপজেলাতেই হার ৬০ শতাংশের ওপরে। রাজশাহী বিভাগের ৭০টি উপজেলার মধ্যে ৬৯টিতে একই ধরনের উচ্চ হার দেখা গেছে। বগুড়া, জয়পুরহাট ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকাতেও বাল্যবিবাহের হার বেশি।
বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রংপুর ও ঢাকা বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় এ হার ৪৮ থেকে ৫৩ শতাংশের মধ্যে। ঢাকা বিভাগের মধ্যে শাহবাগে সর্বনিম্ন ৩৯ শতাংশ এবং মিরপুরে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ বাল্যবিবাহের হার পাওয়া গেছে।
বিডিএইচএস ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের নারীদের প্রথম বিয়ের মধ্যক বয়স ১৬ বছর। অর্থাৎ এসব বিভাগের অর্ধেক নারীর বিয়ে হয়েছে ১৬ বছর বা তারও কম বয়সে। একই সঙ্গে এসব অঞ্চলে এমন নারীর হারও বেশি, যারা মনে করেন তাঁদের আরও পরে বিয়ে হলে ভালো হতো।
এধরনের মত প্রকাশ করেছেন রাজশাহী বিভাগের ৪৭ শতাংশ, খুলনার ৪২ শতাংশ এবং রংপুরের ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ নারী। বিপরীতে সিলেট বিভাগে প্রথম বিয়ের মধ্যক বয়স ১৮ বছরের বেশি-১৮ দশমিক ৮ বছর, যা দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
পরিসংখ্যান বলছে, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে বিভাগ ও অঞ্চলভেদে এ হারের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে সিলেটের তুলনামূলক কম হার এবং জগন্নাথপুরের অবস্থান বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আঞ্চলিক সাফল্যের ইঙ্গিত দেয়।






