জনবল সংকটে স্থবির মশক নিধন অভিযান
প্রকাশিত হয়েছে : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৯:২৪:৪৩ অপরাহ্ন
# খাতায়-কলমে কার্যক্রম, মাঠে দৃশ্যমানতা কম
# ডেঙ্গু আক্রান্ত ৬৮৫, হাসপাতালে ৫৯
মামুন পারভেজ:
জনবল সংকটে সিলেট নগরে স্থবির হয়ে পড়েছে মশক নিধন অভিযান। খাতায়-কলমে কার্যক্রম চলমান থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর দৃশ্যমানতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সিলেটে মশার উপদ্রব ও ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে মশক নিধন কার্যক্রমের ধীরগতিতে উদ্বেগ বাড়ছে জনমনে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নগরের ২৭টি ওয়ার্ডে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। বর্তমানে মাত্র ৫০ জন কর্মী দিয়ে চলছে মশক নিধন কার্যক্রম। অথচ কার্যক্রম কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে অন্তত শতাধিক কর্মী প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ মার্চ নগরের আটটি ওয়ার্ডে বিশেষ মশক নিধন কর্মসূচি শুরু করা হয়। ওয়ার্ডগুলো হলো-১, ২, ৪, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭ ও ১৮। নগরের পরিচ্ছন্নতা ও মশার উপদ্রব কমানোর লক্ষ্যে নেওয়া এ কর্মসূচি পর্যায়ক্রমে অন্য ওয়ার্ডগুলোতেও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ছিল।
পরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ২৩ সেপ্টেম্বর নগর ভবনে আয়োজিত এক পরিকল্পনা সভায় মশক নিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। সভায় এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করা, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা এবং নগরবাসীর মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নগরের একটি ওয়ার্ডে মশক নিধনের জন্য স্প্রে কার্যক্রম পরিচালনা করতে কমপক্ষে ছয়জন কর্মীর প্রয়োজন হয়। একটি ওয়ার্ডে এক দফা স্প্রে কার্যক্রম শেষ করতেও ১০ থেকে ১৫ দিন লেগে যায়। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে একের পর এক ওয়ার্ডে কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। তাঁদের মতে, একসঙ্গে ২৭টি ওয়ার্ডে সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা না গেলে মশক নিধনের সুফল পাওয়া কঠিন।
এদিকে, মশক নিধন কার্যক্রমে নিয়োজিত কর্মীদের সবাই দৈনিক মজুরিভিত্তিক চুক্তিতে কাজ করেন। তাঁদের কর্মপরিবেশ, পারিশ্রমিক ও কাজের চাপ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রায় ২০ লিটার ওজনের কীটনাশক মিশ্রিত স্প্রে মেশিন বহন করে কাজ করতে হয় কর্মীদের। কিন্তু সেই তুলনায় পারিশ্রমিক সন্তোষজনক না হওয়ায় এ কাজে তাঁদের আগ্রহ কমছে। এতে জনবলসংকটের পাশাপাশি কার্যক্রম পরিচালনায়ও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
নগরের দাঁড়িয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা শফিক আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মশার যন্ত্রণায় ঘরে-বাইরে কোথাও স্বস্তি নেই। সন্ধ্যা নামলেই মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। অথচ মশা মারার কার্যক্রম চোখে পড়ে না বললেই চলে। নগরবাসী মশার কামড় খাবে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ভয় নিয়ে দিন কাটাবে, আর কর্তৃপক্ষ শুধু অভিযান চলছে বলেই দায়িত্ব শেষ করবে—এভাবে তো চলতে পারে না। মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে এমন অবহেলা মেনে নেওয়া যায় না। আমরা লোকদেখানো অভিযান চাই না, চাই প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত ও কার্যকর মশক নিধন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিসিকের স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, জনবলসংকটের কারণে মশক নিধন কার্যক্রম কার্যত গতি হারিয়েছে। এ কাজে নিয়োজিত কর্মীরা সবাই দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন। তাঁদের পারিশ্রমিক ও কাজের চাপের কারণে কর্মীদের মধ্যে অনীহা তৈরি হচ্ছে। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মশক নিধন কার্যক্রম নিয়ে এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সিলেটে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে নতুন করে আরও ১০ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর বিভাগে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮৫ জনে। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫৯ জন। চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ডা. মো. মাহবুবুল আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত ১০ জনের মধ্যে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচজন, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনজন এবং মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুজন রয়েছেন।
বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৫৯ জনের মধ্যে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৭ জন, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ জন, বানিয়াচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন, লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছয়জন, মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুজন, ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুজন, হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে ১৩ জন, শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুজন এবং সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চারজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত বিভাগে শনাক্ত ৬৮৫ জনের মধ্যে হবিগঞ্জে ২৯১ জন, সুনামগঞ্জে ১৫৬ জন, সিলেটে ১৪৫ জন এবং মৌলভীবাজারে ৬৭ জন রয়েছেন। এ ছাড়া অন্যান্য জেলা থেকে এসে সিলেট বিভাগে চিকিৎসা নিতে গিয়ে আরও ২৬ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
এর আগের ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ১১ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ, নতুন শনাক্তের সংখ্যা সামান্য কমলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।
সিসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম জনবলসংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, “আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে জনবলসংকটের কারণে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। আমরা আপাতত ২৭টি ওয়ার্ডে কার্যক্রম পরিচালনা করছি। কিন্তু সব কটি ওয়ার্ডে একসঙ্গে অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। কারণ, একটি ওয়ার্ডে ওষুধ ছিটালে মশা অন্য ওয়ার্ডে চলে যেতে পারে। এ কারণে বিচ্ছিন্নভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, সিসিক প্রশাসকের কাছ থেকে অর্থসহায়তাসহ সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে। জনবলসংকট কাটিয়ে উঠতে পারলে মশক নিধন কার্যক্রম পূর্ণোদ্যমে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মীদের পারিশ্রমিক ও কাজের পরিবেশের উন্নয়ন, নিয়মিত ওয়ার্ডভিত্তিক অভিযান এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে আনা এবং ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানো কঠিন হয়ে পড়বে।






