পাঁচ বছরে দুর্যোগে ২,৫৩৩ মৃত্যু, বজ্রপাতে ৬০ শতাংশ
প্রকাশিত হয়েছে : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৮:৩০ অপরাহ্ন
বজ্রপাতের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে সিলেট

জালালাবাদ রিপোর্ট : ছয় প্রাকৃতিক দুর্যোগে পাঁচ বছরে প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজার ৫৩৩ জন। তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৫৩০ জনেরই মৃত্যু হয়েছে বজ্রপাতে। অর্থাৎ, মোট প্রাণহানির প্রায় ৬০ শতাংশের কারণ বজ্রপাত। ঝুঁকিপূর্ণ এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির শিকার হচ্ছেন কৃষক ও দরিদ্র মানুষ। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি সিলেটসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। অন্যদিকে, প্রাণহানিতে বজ্রপাত এগিয়ে থাকলেও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটিয়েছে বন্যা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ‘দুর্যোগের ধরন, ক্ষয়ক্ষতি ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বজ্রপাত, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প ও পাহাড়ধসের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এতে। গত ৬ অক্টোবর সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত ওই প্রতিবেদনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রাখা হয়েছে বজ্রপাতকে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরে ছয় ধরনের দুর্যোগে মোট ২ হাজার ৫৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে বজ্রপাতে মারা গেছেন ১ হাজার ৫৩০ জন, যা মোট প্রাণহানির ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাণহানি ঘটেছে অগ্নিকাণ্ডে। এ সময়ে আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ৬৫৪ জন। পাঁচ বছরে দেশে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪৮৬টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়া নয়টি বড় বন্যায় ১৯৭ জন, পাহাড়ধসে ৯০ জন, ছয়টি ঘূর্ণিঝড়ে ৫২ জন এবং ভূমিকম্পে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ছয় ধরনের দুর্যোগের মধ্যে বজ্রপাত ও অগ্নিকাণ্ডেই অধিকাংশ প্রাণহানি ঘটেছে।
ক্ষয়ক্ষতিতে শীর্ষে বন্যা :
প্রাণহানির হিসাবে বজ্রপাত সবচেয়ে ভয়াবহ হলেও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে এগিয়ে বন্যা। সরকারি হিসাবে, পাঁচ বছরে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড, বজ্রপাত ও ভূমিকম্পে মোট ৪৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু বন্যায় ক্ষতি হয়েছে ২৯ হাজার ৮৬০ কোটি টাকার। ঘূর্ণিঝড়ে ১১ হাজার ৭৩৬ কোটি, অগ্নিকাণ্ডে ২ হাজার ২০ কোটি, ভূমিকম্পে ১০৮ কোটি এবং বজ্রপাতে ১০৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রাণহানি দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো বজ্রপাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত জাতীয় পরিকল্পনায় মোট ১৩টি প্রাকৃতিক দুর্যোগের উল্লেখ রয়েছে। তবে বিপুল প্রাণহানির পরও বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এপ্রিল-মে মাসে বেশি বজ্রপাত :
মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বজ্রপাতের ঘটনা তুলনামূলক কম থাকে। মার্চ থেকে তা বাড়তে শুরু করে। এপ্রিলে বজ্রপাতের তীব্রতা বাড়ে এবং মে মাসে পৌঁছায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এরপর জুন ও জুলাইয়ে কমতে শুরু করলেও সেপ্টেম্বরে আবার কিছুটা বাড়ে।
বজ্রপাতের প্রবণতা দেশের সব অঞ্চলে থাকলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে ঝুঁকি বেশি। দেশের উত্তরাঞ্চলেও তুলনামূলক বেশি বজ্রপাত হয়। এ দুর্যোগে নিহত ব্যক্তিদের বড় অংশ কৃষক। জীবিকার প্রয়োজনে খোলা মাঠে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা প্রায়ই বজ্রপাতের ঝুঁকিতে পড়েন। ফলে শুধু সচেতনতা বাড়ানো নয়, কৃষকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
কৃষকের সুরক্ষায় বাস্তবসম্মত উদ্যোগের তাগিদ :
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে হলে আগে মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সমস্যাগুলো বুঝতে হবে। তাঁর মতে, বজ্রপাত মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে। যাঁরা এ দুর্যোগে প্রাণ হারান, তাঁদের বড় অংশই দরিদ্র মানুষ। বজ্রপাতে যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার তিন থেকে চার গুণ গবাদিপশুর মৃত্যু হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাই প্রাণহানির পাশাপাশি গবাদিপশুর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব রাখা এবং বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রটোকল তৈরি করা প্রয়োজন।
বজ্রপাত থেকে সুরক্ষায় প্রচলিত সচেতনতামূলক পরামর্শের বাস্তব প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন গওহার নঈম ওয়ারা। তিনি বলেন, বৃষ্টির সময় কৃষককে মাঠে যেতে হয়। তাই শুধু সতর্কবার্তা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না; কৃষকের জন্য বাস্তবসম্মত সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তাঁর মতে, গ্রামাঞ্চলে পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কার্যালয়ে যে ধরনের সুরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, কৃষকদের ক্ষেত্রেও তেমন ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। কৃষকের বাড়ি ও মাঠ নিরাপদ করার পাশাপাশি গাছ কাটা বন্ধের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।





