স্বজনের লাশ গাড়িতেও ভারী!
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ৯:৪২:৪৮ অপরাহ্ন
যেসব ক্ষমতাসীন ক্ষমতাধর ব্যক্তি রাস্তায় অন্যান্য যানবাহন চলাচল বন্ধ করে গাড়িতে চলেন কিংবা যারা বিমান হেলিকপ্টারে নিয়মিত যাতায়াত করেন, তারা ছাড়া এদেশে কোন পদ বা পেশার মানুষই সড়ক দুর্ঘটনা থেকে নিরাপদ নন। এদেশের বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে প্রতিদিন মানুষকে প্রাণ দিতে হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। হতে হচ্ছে পঙ্গু ও আর্থিক দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। আর এই সড়ক দুর্ঘটনা কমার পরিবর্তে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কোন কার্যকর বড় পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না কর্তৃপক্ষ তথা সরকারকে। দেশের ত্রুটিপূর্ণ ও মান্ধাতা আমলের সড়ক ও ট্রাফিক ব্যবস্থা এখন দেশের মানুষের জন্য প্রাণসংহারি হয়ে ওঠতে দেখা যাচ্ছে।
শুধু গত ৩ দিনে সিলেটে সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সিলেটের ৪ জন, মৌলভীবাজারের ১ জন এবং সুনামগঞ্জের ১ জন। সর্বশেষ গত রোববার বিকেলে গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ট্রাকের চাপায় সিএনজি চালিত অটোরিকশার ৪ যাত্রী নিহত হন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বিয়ানীবাজার উপজেলার নয়াগ্রাম এলাকার অ্যাম্বুলেন্স চালক ফারুক আহমদের স্ত্রী রাশেদা বেগম (৩৮) ও তার মেয়ে ফারিয়া আক্তার (১৬)।
জানা গেছে, রোববার বিকেলে এওলাটিকর এলাকায় সিলেটগামী একটি সিএনজি অটোরিকশার সাথে একটি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ফারুকের স্ত্রী ও সন্তানসহ আরো ২ জন নিহত হন। এ ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্স চালক বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এতোদিন তিনি অন্য মানুষের স্বজনদের লাশ বহন করেছেন। কিন্তু এখন নিজের স্ত্রী ও মেয়ের লাশ নিয়ে বেশী দুর অগ্রসর হতে পারেননি। তাদের লাশ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স যেনো চালাতে পারছিলেন না তিনি। শেষ পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে যান তিনি অশ্রুসজল ও শোকার্ত হৃদয় নিয়ে।
ঘটনাটি সড়ক দুর্ঘটনার এক চরম বেদনাদায়ক দৃষ্টান্ত। এ রকম অসংখ্য মর্মান্তিক ঘটনা এদেশে ঘটছে প্রতিনিয়ত, প্রতিদিন। গতকাল মিডিয়ায় প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গেছে, এদেশের গ্রামীণ সড়কও প্রাণঘাতী হয়ে ওঠেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় গত এক বছরে শিশু মৃত্যুর ৪২ শতাংশই গ্রামে সংঘটিত হয়েছে। রোড সেইফটি ফাউন্ডেশন-এর প্রতিবেদন অনুসারে ২০২২ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে ১ হাজার ১৪৩ শিশু নিহত হয়েছে যাদের বয়স ৩ মাস থেকে ১৭ বছর। গত ৪ বছরের মধ্যে এ সংখ্যা সর্বোচ্চ। এসব মৃত্যুর ৪২ শতাংশই হয়েছে গ্রামীণ সড়কে। এভাবে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামাঞ্চল এখন একাকার হয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি নিসচার এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত বছর দেশে সড়ক, নৌ, রেল ও বিমানপথে ৭ হাজার ২৪ টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৮ হাজার ১০৪ জন ও আহত হয়েছেন ৯ হাজার ৭৮৩ জন। এগুলোর মধ্যে শুধু সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫ হাজার ৭৬০ জন। এই পরিসংখ্যানে এদেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর বিপজ্জনক ও চরম অরক্ষিত অবস্থার চিত্র ফুটে ওঠেছে।
সচেতন মহল মনে করেন, সড়কে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিংয়ের অভাবে দুর্ঘটনা বাড়ছে। প্রশাসনের চোখের সামনে দিয়ে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনার খবর আসছে। সচেতন মহল এক্ষেত্রে ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন এবং সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিশেষজ্ঞদের প্রদত্ত বিভিন্ন সুপারিশ কাজে লাগানোর আহবান জানিয়েছেন। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ তত্ত্বাবধানে উচ্চ পর্যায়ের মনিটরিং সেল গঠন, মহাসড়কে একমুখী চলাচলের সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘ ও উচ্চতাসম্পন্ন সড়ক বিভাজকের ব্যবস্থা করা। আমরা এদিকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগসহ সরকারের নীতি নির্ধারক মহলের দৃষ্টি ও মনোযোগ আকর্ষণ করছি।





