জামায়াতের ঐতিহাসিক সমাবেশ : রাজনীতিতে আলোচনা বিশ্লেষণ
প্রকাশিত হয়েছে : ২০ জুলাই ২০২৫, ১০:০৫:১৯ অপরাহ্ন

জালালাবাদ রিপোর্ট : ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রথমবারের মতো সমাবেশ করলো জামায়াতে ইসলামী। স্মরণকালের বড় এ সমাবেশ ঘিরে এখন রাজনীতির মাঠে নানা আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সমাবেশটি কি নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের বার্তা নিয়ে এলো-তা নিয়েও বিশ্লেষণ চলছে। বিশ্লেষকদের ভাষ্যে, জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব এত বড় সমাবেশ আয়োজনের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছে তারা বেশ শক্তপোক্তভাবেই রাজনৈতিক মাঠে নামছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ সমাবেশের মাধ্যমে জামায়াত একটি সম্মিলিত বিরোধী জোট গড়ার বার্তা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তারা অন্যান্য ইসলামী দলগুলোকেও কাছে টানবে। জুলাই অভ্যুত্থানের সংগঠকদের নিয়ে গটিত দল এনসিপিকেও জামায়াত জায়গা করে দেবে। আবার এনসিপিও জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে প্রায়। কেননা দুটি দলই লেভেল প্লেইং ফিল্ড, আইনশৃঙ্খলা, নির্বাচনের পরিবেশ নেই, পিআর পদ্ধতির নির্বাচন নিয়ে একসুরে কথা বলছে।
এ সমাবেশ থেকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক লড়াইয়ের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরেক লড়াইয়ের ঘোষণা দেন দলের আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, পুরোনো ব্যবস্থাপত্রে বাংলাদেশ আর চলবে না।
নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ :
এই সমাবেশে বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। আমন্ত্রণ পায়নি এবি পার্টি ও বাম রাজনৈতিক দলগুলোও। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদসহ আরো কিছু দলের নেতা আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে সমাবেশে উপস্থিত থেকেছেন। সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতিসহ জামায়াতের অন্য নানা দাবির সঙ্গে যেসব দল মোটামুটি একমত, তাদেরই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
সমাবেশে আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে অংশ নেয়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউর রহমান গাজী বলেন, আমরা যারা বিভিন্ন দলের ওখানে ছিলাম তারা সবাই সাত দফা দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছি। আমরাও মনে করি মৌলিক সংস্কার না করে নির্বাচন করলে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
তিনি বলেন, এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে সামনের রাজনীতিতে মেরুকরণ আরো স্পষ্ট হয়েছে। এটা ৫ আগস্টের পরই শুরু হয়েছে, এখন ধীরে ধীরে তা আরো বাড়ছে। আসলে আমরা যারা আগে মৌলিক সংস্কার চাই, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চাই, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চাই, তারা এক হয়েছি। এখানে ইসলামী দল ছাড়াও এনসিপির মত তরুণদের দল আছে। কিছু রাজনৈতিক দল আছে যারা মৌলিক সংস্কার ছাড়াই যেনতেন একটা নির্বাচন করে ক্ষমতায় যেতে চায়। তারা আমাদের সঙ্গে নাই। তাদের সমাবেশে দেখাও যায়নি।
আসলে যত দিন যাবে, রাজনীতিতে এই মেরুকরণ আরো বাড়বে, বলেন তিনি। এর আগে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসমাবেশে পিআর পদ্ধতির নির্বাচনকে সামনে নিয়ে আসা হয়। সেখানেও জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। সেখানেও বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. জাহেদ উর রহমান মনে করেন, জামায়াত আগে থেকেই চাইছে একটি সম্মিলিত বিরোধী দল গড়ে তুলতে, যার প্রধান ফোর্স হবে ইসলামী দলগুলো। ফলে যেসব কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক দলের সাথে তাদের বিরোধিতা ছিলো তাদের কাছে টানছে। এর বাইরে এনসিপির মতো আরো কিছু দলকে তারা সঙ্গে নিতে চায়। আর স্মরণকালের বড় সমাবেশের মধ্য দিয়ে জামায়াত তার অবস্থানের জানান দিলো ভালোভাবেই।
এনসিপি জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে বলেও মনে করেন জাহেদ। তিনি বলেন, সংস্কার তো সব দলই চায়। কিন্তু লেভেল প্লেইং ফিল্ড, আইনশৃঙ্খলা, নির্বাচনের পরিবেশ নাই, পিআর পদ্ধতির নির্বাচন এগুলো নিয়ে জামায়াত ও এনসিপি একসুরে কথা বলছে। জামায়াত পাটগ্রাম থানায় হামলার বিরুদ্ধে কথা বলেছে। মিটফোর্ডে প্রকাশ্যে হত্যার বিরুদ্ধে কথা বলেছে।
জামায়াতের এই সমাবেশে কয়েক লাখ লোকের সমাগম হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছাড়িয়ে আশপাশের সড়কে সমাবেশ বিস্তৃত হয়। একদিন আগে থেকেই সারাদেশ থেকে জামায়াত ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ঢাকায় আসতে শুরু করেন। জামায়াতের নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিভিন্ন জেলা থেকে ১১ হাজার বাস, আট হাজার গাড়ি, চারটি ট্রেনে নেতাকর্মী সমর্থকরা ঢাকায় আসেন। লঞ্চেও এসেছেন অনেকে।
এই প্রসঙ্গটি উল্লেখ করে জাহেদ উর রহমান বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে জামায়াত তার শক্তি দেখিয়েছে। আবার বিএনপিকে ওই সমাবেশে আমন্ত্রণ জানায়নি বা বিএনপি যায়নি। বিষয়গুলো নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নতুন ইতিহাস :
জামায়াতে ইসলামী এবারই প্রথম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করলো। আওয়ামী লীগ শাসনামলে ১১ বছর ঢাকায় এককভাবে সমাবেশ করার সুযোগ পায়নি জামায়াত। ২০০৯ সালের আগে দলটি সমাবেশ করত পল্টন ময়দানে। ২০১২ সালে ময়দানটিতে রাজনৈতিক সমাবেশ বন্ধ করে সরকার। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রাজনৈতিক সমাবেশ আয়োজন শুরু হয় একই বছর থেকে। বিএনপির জোটের সঙ্গে জামায়াত সমাবেশ করলেও এককভাবে কখনও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কর্মসূচি করতে পারেনি।
এবারের সমাবেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৩টি এলইডি স্ক্রিন সেট বসানো হয় যাতে নেতাকর্মীরা সরাসরি বক্তব্য শুনতে পারেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও তার আশপাশে তিন শতাধিক মাইক লাগানো হয়। সমাবেশস্থলে প্রায় ছয় হাজার স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করেন বলে জানিয়েছেন জামায়াতের নেতারা। আর ছিলো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক নিরাপত্তা।
বিএনপিই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী :
১৯৯১ সালে জামায়াতের সমর্থনেই ক্ষমতায় গিয়েছিলো বিএনপি। ১৯৯৯ সাল থেকে পরের দুই যুগ বিএনপি ও জামায়াত জোটসঙ্গী ছিল। ২০০১-২০০৬ পর্যন্ত একসঙ্গে সরকারও পরিচালনা করে দল দুটি।২০২২ সালের ডিসেম্বরে সমঝোতার ভিত্তিতে দুই দল আলাদা হয়ে যায়। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপির যুগপৎ আন্দোলন থেকেও সরে যায় জামায়াত।
জুলাই অভ্যুত্থানে দল দুটি অংশ নিলেও ৫ আগস্টের পর বিএনপির প্রধান নির্বাচনী প্রতিদ্ধন্ধি হিসেবেই আবির্ভূত জামায়াত। বিএনপির যুগ্ম মহাসসিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, এটা নিয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নাই। তারা তাদের দাবি তুলে ধরেছে। জনগণের কাছে তাদের এই দাবির কোনো সমর্থন আছে কী না সেটাই দেখার বিষয়। ক্যাডার কর্মীদের নিয়ে সমাবেশ করলে দাবীর গ্রহণযোগ্যতা নিরূপণ করা যায় না।
এমরান সালেহ মনে করেন, দেশের মানুষ পিআর পদ্ধতির নির্বাচন চায় না। তিনি বলেন, এতে দলের স্বৈরাচারী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে এটাকে সামনে নিয়ে আসছে। আমরাও সংস্কার চাই। দেশে এখন দ্রুত নির্বাচন দরকার।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, বিচার, মৌলিক, সংস্কার এবং নির্বাচন-এই তিনটি প্রধান দাবি। এখন বিচার ও মৌলিক সংস্কার ছাড়া নির্বাচন অর্থহীন। জামায়াতের সমাবেশে সেই কথাই বলা হয়েছে। আমরাও একমত। কিন্তু বিএনপি কেন যেন এই দাবি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আমরা চাই না রাজনীতিতে কোনো মেরুকরণ হোক। আমরা ঐক্য চাই। বিএনপি সেই ঐক্যের নেতৃত্ব নিতে পারতো। তিন্তু তারা দূরে সরে যাচ্ছে।
জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব বাড়ছে বলেও মনে করেন মনিরা। তিনি বলেন, বিএনপির দিক থেকে তাদের নানা ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে। এটা ঐক্যের পথে অন্তরায়। আমরা চাই সবাই মিলে জুলাইয়ের চেতনায় দেশ গড়তে।
বাম গণতান্ত্রিক জোটের কোনো দলও জামায়াতের সমাবেশে আমন্ত্রণ পায়নি জানিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, জামায়াত নির্বাচনকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে এই সমাবেশের মাধ্যমে তাদের দিকের একটি রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলারই চেষ্টা করেছে। তারা এবার সমাবেশের মাধ্যমে শক্তি প্রদর্শন করে সেই বার্তাই দিয়েছে।
তার কথা, তাদের নতুন রাজনৈতিক বলয় গড়ে তোলার প্রধান টার্গেট ইসলামী দলগুলো। এর বাইরেও আরো দল আছে যাদের তারা সঙ্গে নিতে চায়। নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা একটি মোর্চা গঠন করে শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হতে চায়।






