বাড়ছে নদীর পানি, বাড়ছে আতঙ্ক: সিলেটে তলিয়ে গেছে ৩৪ হাজার হেক্টর জমির ধান
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ মে ২০২৬, ১২:১৭:১৪ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার: সুনামগঞ্জের হাওরজুড়ে এখন শুধু পানি আর পানি। আকাশের অঝোর বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলের তোড়ে নদীগুলোর বুক ফুলে উঠছে ঘণ্টায় ১ থেকে ২ সেন্টিমিটার করে। সেই পানিই নিঃশব্দে গিলে খাচ্ছে কৃষকের মাসের পর মাসের পরিশ্রম, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার আশ্রয়।
নলজুর নদী ২৪ ঘণ্টায় ১৮ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ২৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। হবিগঞ্জের সুতাং নদী যেন আরও অস্থির। একদিনেই ২৪ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বিপদসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপরে। নেত্রকোনার ভুগাই-কংশ, সোমেশ্বরী ও মগরা নদীর অবস্থাও একই রকম। এ নদীগুলোর পানি বিপদসীমার ২৭ থেকে ৮৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
কোথাও পানি কিছুটা কমলেও আতঙ্ক কমেনি মানুষের মনে। কারণ, চারপাশে যে দৃশ্য-তা শুধুই ডুবে যাওয়ার গল্প।
হাওরের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত এখন পানির নিচে। যে জমিতে কয়েকদিন আগেও সোনালি ধান দুলছিল, সেখানে এখন কেবল ঢেউ খেলে যাচ্ছে। কৃষকের চোখে ভাসছে অসহায়তা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সিলেট বিভাগের চার জেলায় ইতোমধ্যে ৩৩ হাজার ৯১৩ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। হাওর অঞ্চলে এখনো প্রায় ২৫ শতাংশ পাকা ধান পানির নিচে যা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের গতকাল সকালের তথ্যানুযায়ী, পূর্বের ২৪ ঘণ্টায় পানি সমতল সবচেয়ে বেশি প্রায় ২৪ সেন্টিমিটার বেড়েছে হবিগঞ্জের সুতাং নদীতে। সুনামগঞ্জের নালজুর নদীতে বেড়েছে ১৮ সেন্টিমিটার।
এদিকে, সিলেট বিভাগে চলতি মৌসুমে গড়ে ৫৭ শতাংশ জমির বোরো ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ৭৫ শতাংশ এবং নন-হাওর এলাকায় ৩৩ শতাংশ ধান কাটা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যানুযায়ী, রোববার (৩ মে) পর্যন্ত চলতি মৌসুমে সিলেট বিভাগের চার জেলায় ৩৩ হাজার ৯১৩ হেক্টর জমির ধান অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় পানিতে তলিয়ে গেছে।
এদিকে বিভাগের বিভিন্ন হাওরে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ শতাংশ পাকা ধান ডুবে রয়েছে, যা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এ অবস্থায় বড় ক্ষতির শঙ্কায় রয়েছেন হাওরপাড়ের কৃষকরা।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কৃষক মো. জলিল মিয়ার কণ্ঠে সেই কষ্ট স্পষ্ট। তিনি বলেন, “টানা বৃষ্টিতে জমি ডুবে গেছে। শ্রমিক পাই না, মেশিনও নাই। তাই নিজেরাই পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে ধান কাটতেছি।”
তার ৩৩ কিয়ার জমির মধ্যে মাত্র ১২ কিয়ার ধান কাটা হয়েছে। এর মধ্যেও ৭ কিয়ার ধান খলায় পড়ে আছে রোদ না থাকায় শুকাতে পারছেন না। ধান ঘেড়া (চারা) হয়ে যাচ্ছে। বাকি ২১ কিয়ার জমি এখনো পানির নিচে, প্রতিদিনই বাড়ছে নষ্ট হওয়ার শঙ্কা।
এই গল্প শুধু জলিল মিয়ার নয় হাওরপাড়ের হাজারো কৃষকের একই আর্তনাদ। কেউ বুকসমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন, কেউ আবার চোখের সামনে ফসল ডুবে যেতে দেখে নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সুরমা-কুশিয়ারা, ধনু-বাউলাই, কালনি, সুতাং, জুড়ি ও মনু নদীর পানি আগামী দুই দিন আরও বাড়তে পারে। ফলে নতুন করে প্লাবিত হতে পারে নিম্নাঞ্চল, বাড়তে পারে দুর্ভোগ।
এই বন্যা শুধু জমি ডুবায় না, ডুবিয়ে দেয় একটি পরিবারের স্বপ্ন, সন্তানের পড়াশোনা, বছরের খাবারের নিশ্চয়তা। কৃষকের ঘরে ধান না উঠলে তার চুলায় আগুন জ্বলে না- এই সহজ সত্যটাই এখন হাওরের প্রতিটি ঘরে ঘরে কষ্ট হয়ে বাজছে।
তবুও কৃষক থেমে নেই। বুকভরা আশঙ্কা নিয়েও তারা পানিতে নেমে ধান কাটছেন। কারণ তারা জানেন-এই ধানই তাদের বাঁচার শেষ ভরসা।
হাওরের পানির ঢেউয়ের ভেতর তাই আজ শুধু বন্যার শব্দ নয়, শোনা যায় মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, আর একরাশ অপ্রকাশিত কান্না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আবহাওয়া পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। হাওর এলাকার এখনো ডুবে থাকা প্রায় ২৫ শতাংশ ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি মাড়াইয়ের সময় খোলা স্থানে থাকা ধানও বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার হিসাব করা হচ্ছে।’
তবে আবহাওয়া অনুকূলে এলে নন-হাওর এলাকার পাকা ধান দ্রুত কেটে ঘরে তোলা সম্ভব হবে বলেও জানান ড. মো. মোশাররফ হোসেন।




