সিসিকে বিশৃঙ্খল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৭ মে ২০২৬, ৯:০৭:৩৬ অপরাহ্ন
প্রক্রিয়া হচ্ছে না ৮৫ ভাগ, সংগ্রহের বাইরে ৩৭ ভাগ

স্টাফ রিপোর্টার : সময় বদলেছে, সরকারও বদলেছে, কিন্তু এখনো বিশৃঙ্খল রয়ে গেছে সিলেট সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। নগরে সংগৃহীত অপচনশীল সলিড বর্জ্যরে প্রায় ৮৫ ভাগই প্রক্রিয়া হচ্ছে না। আর উৎপাদিত বর্জ্যরে ৩৭ ভাগের বেশি রয়ে যাচ্ছে সংগ্রহের বাইরে। এগুলো যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে এবং ড্রেন, ছড়া, খাল গড়িয়ে নদী পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। এতে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে।
সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন নগরে গড়ে ৪৭৫ টন বর্জ্য উৎপাদন হয়। ১৭৫ টন বর্জ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে সংগৃহীত বর্জ্যরে মধ্যে মাত্র ৩০-৪০ টন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়। এদিকে, নেই পর্যাপ্ত বর্জ্য সংগ্রহে স্বাস্থ্য সুরক্ষা উপকরণ, নগরের বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের বর্জ্য সংগ্রাহকের কাজ করতে দেখা গেছে।
নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যখন বেহাল অবস্থা এমন সময় সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী গতকাল বুধবার ঘোষণা দিলেন আগামী ৫ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে বর্জ্য থেকে বায়ো-প্রোডাক্ট উৎপাদন ও সার্কুলার ইকোনমি বাস্তবায়নের। যে বর্জ্য সংগ্রহ, সংগ্রহের পর ৮৫ ভাগই থাকছে প্রক্রিয়ার বাইরে সেখানে এই প্রকল্প চ্যালেঞ্জিং এবং সময়সাপেক্ষ বলে মনে করছেন অনেকে।
জানা যায়, সংগৃহীত বর্জ্যরে মাত্র ১৫ শতাংশ বর্তমানে কো- প্রসেস করতে পারছে সিসিক। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ ও সিলেট সিটি করপোরেশন যৌথভাবে অপচনশীল বর্জ্য কো-প্রসেস প্রকল্প শুরু করে।
লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ সূত্র জানায়, এই প্রকল্পের আওতায় লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ সিলেট সিটি করপোরেশনের এর ১১ হাজার ৬০০ টন সলিড বর্জ্য কো-প্রোসেস করেছে (২০২৪ সালে পরীক্ষমূলকভাবে ১ হাজার ৬০০ টন এবং ২০২৫ সালে প্রায় ১০ হাজার টন)। সিলেট সিটি করপোরেশন প্রতি বছর ৭০ হাজার টনেরও বেশি অপচনশীল বর্জ্য এই ফ্যাসিলিটিতে প্রেরণ করে, সেই হিসেবে বর্তমানে লাফার্জহোলসিম সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রায় ১৫% সলিড বর্জ্য কো-প্রসেস করছে। ভবিষ্যতে এর পরিমান বৃদ্ধি করতে সিলেট সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আমরা কাজ করছি।
সূত্র আরও জানায়, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের ছাতক প্ল্যান্টটি দেশের একমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ সিমেন্ট প্ল্যান্ট যেখানে ক্লিংকার তৈরির সুবিধা রয়েছে। ক্লিংকার তৈরিতে উচ্চ তাপমাত্রার চুল্লিতে জিওসাইকেল প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য টেকসই ও পরিবেশসম্মত উপায়ে ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়াই হলো কো-প্রসেস। সিলেট সিটি করপোরেশন থেকে লাফার্জহোলসিম সলিড বা অপচনশীল বর্জ্য সংগ্রহ করে, এর বড় একটা অংশ হলো প্লাস্টিক।
সিলেট সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, নগরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ টনের উপরে সলিড বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। যার মধ্যে ৩০-৪০ টনের মতো লাফার্জ হোলসিমে প্রেরণ করা হয়। সলিড বর্জ্য মশচায়ের ফ্রি করার জন্য মন্ত্রণালয়ে এক শ’ ৭ কোটি টাকার বায়ো ড্রায়িং প্ল্যান্টের প্রকল্প প্রেরণ করা হয়েছে। যেটা বাস্তবায়ন হলে অপচনশীল বর্জ্য শুকিয়ে অর্থাৎ মশচায়ের ফ্রি করে ডিসপোজাল সক্ষমতা অনেকটা বাড়বে।
এদিকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, বর্জ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের নেই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা উপকরণ। শিশুদের বর্জ্য সংগ্রাহকের কাজও করতে দেখা গেছে।
নগরের রিকাবী বাজার এলাকায় দেখা যায়, সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িতে ময়লা বোঝাই করে দুই কিশোর রিকাবী বাজারের ডাম্পিং স্টেশনের দিক যাচ্ছিলেন। এসময় এক কিশোর গাড়ি টানছিলেন অপরজন গাড়ি ঠেলিছিলেন। পাশেই ডাম্পিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, তাদের সমবয়সীসহ বিভিন্ন বয়সের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা ময়লা ডাম্পিং করছেন। এসময় তাদের হাতে ছিল না কোনো গ্লাবস কিংবা পায়ের বুটস। নেই মুখে পড়ার মাস্ক। এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রতিদিনই কাজ করতে হয় তাদের জানালেন এক পরিচ্ছন্নতা কর্মী।
নামপ্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মী বলেন, ‘আমরা মজুরি ভিত্তিক কাজ করি। সিটি করপোরেশন থেকে কোনো স্বাস্থ্য সুরক্ষা-সামগ্রী দেওয়া হয় না। এভাবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করি আমরা।
এমন পরিবেশে কাজ করে অসুখ বিসুখ হয় না জানতে চাইলে সেখানে উপস্থিত অন্য এক কর্মী বলেন, ‘মাসে তিন চারদিনই অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকতে হয়। অনেক সময় অসুস্থ শরীর নিয়েই কাজে আসি। কাজ না করলে ভাত ঝুটবে না।
এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) একলিম আবদীন বলেন, ‘নগরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ টনের উপরে সলিড বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। যার মধ্যে ৩০-৪০ টনের মতো লাফার্জ হোলসিমে প্রেরণ করা হয়। তাদের প্রসেস সক্ষমতা রয়েছে ১ হাজার টনের মতো কিন্তু আবর্জনা মশচায়ের ফ্রি না হওয়ায় উল্লেখিত পরিমাণের বেশি ধ্বংস করা সম্ভব হয় না। তবে সিসিকের প্রবৌশর বিভাগ মন্ত্রণালয়ে বায়ো ড্রায়িং প্রকল্পের প্রস্তাব প্রেরণ এটি বাস্তবায়ণ হলে। সলিড বর্জ্য রিসাইকেলিংয়ের পরিমাণ বেড়ে যাবে।
সংগ্রহের বাইরে থাকা প্রায় ১৭৫ টন বর্জ্যে বিষয়ে তিনি বলেন, সলিদ বর্জ্যরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভাংগারি দোকানে চলে যায়। এছাড়া আমাদের অনেকেই আছেন যারা এখনো আগের মতো মাটি বা বাসার আশেপাশেই বর্জ্যে ফেলে দেন।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা উপকরণ ও শিশুদের বর্জ্য সংগ্রাহকের কাজে নেওয়ার ব্যাপারে সিসিকের এ কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় আমাদের বর্জ্য সংগ্রহের কাজ বিভিন্ন ক্লাবকে দেওয়া হয়েছে। তারা হয়তো অপ্রাপ্ত বয়স্কদের দিয়ে কাজ করাতে পারে। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে আমরা দেখবো। সুরক্ষা উপকরণ সিসিকের যা আছে তা অপ্রতুল। কিন্তু অনেক সময় পরিচ্ছন্নতা কর্মীরাও স্বাস্থ্য সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহারে অনিহা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, আমরা এ প্রকল্প নিয়ে শতভাগ আশাবাদী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সিলেট সফরে এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছেন। বর্জ্য থেকে আমরা ওয়েস্ট এনার্জি বাই প্রডাক্ট কিভাবে উৎপাদন করা যায় এ নিয়ে আমরা কাজ করবো। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রস্তাবও আসছে। আমরা সিসিকের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করব।




