টাকা ছড়াচ্ছে মারাত্মক রোগ-ব্যাধি!
প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ মে ২০২৬, ১:০০:৩৭ অপরাহ্ন
একথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশে অধিকাংশ প্রচলিত ব্যাংক নোট বা কাগুজী মুদ্রার অবস্থা অত্যন্ত জরাজীর্ণ। ছেঁড়া-ফাটা নোটে বাজার সয়লাব। কিছু বড় নোটের অবস্থা বেশ ভালো হলেও কম মূল্যমানের নোটগুলো যেমন ছেঁড়া-ফাটা, তেমনি ময়লা ও নোংরা। এসব ব্যাংক নোট দিয়েই চলছে দেশের নিম্নপর্যায়ে আর্থিক লেনদেন। কিন্তু সম্প্রতি একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় এসব জরাজীর্ণ ও নোংরা নোটের ক্ষতিকর দিক বিশেষভাবে স্বাস্থ্যগত ক্ষতির দিক ওঠে এসেছে। নিউইয়র্ক বিশ^বিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি কাগজের নোটে প্রায় তিন হাজার প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। এর মধ্যে ই-ফোলাই, স্ট্যাফাইলোকোক্কাস, নানা ধরনের ফাংগাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা বা সাধারণ সর্দি-কাশির ভাইরাস ইত্যাদি অন্যতম।
লক্ষণীয় যে, কাগজের নোটের সুক্ষুতন্তুগুলোয় ঘাম, ধুলোবালি ও আর্দ্রতা সহজেই আটকে থাকে, যা ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তারের জন্য উপযোগী। গত বছর ২২ সেপ্টেম্বর মিডিয়ায় ‘ছেঁড়া-নোংরা নোটে রোগের ঝুঁকি, বাজারে লেনদেন এখন জনস্বাস্থ্যের হুমকি’ শিরোনামে একটি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব বাজারে প্রতিদিন ছেঁড়া, বিবর্ণ ও দুর্গন্ধযুক্ত নোট হাতবদল হচ্ছে। আর এই নোটগুলো কেবল অর্থ প্রদানের মাধ্যম নয়, এগুলো এখন সংক্রমণের বাহকও হয়ে ওঠেছে। প্রয়োজনের তুলনায় বাজারে নতুন নোট কম আসায় সেলোটেপ দিয়ে জোড়াতালি দেয়া ও মলিন ছেঁড়া-ফাটা নোটই দেদারসে বাজারে চলছে। এসব নোট প্রতিদিন অগণিত মানুষের হাত বদল হয়, অনেকে এই নোটে খাবার কেনেন, শিশুরা বড়দের কাছ থেকে নোট নিয়ে খেলতে গিয়ে মুখে দেয়। এভাবে অদৃশ্য জীবাণু অজান্তেই শরীরে প্রবেশ করে।
বলা যায়, টাকা কেবল লেনদেনের মাধ্যম নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত। বাজারে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ নোংরা নোট চলাচল করছে, তার মাধ্যমে গোটা অজান্তেই রোগবাহী এক অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। গবেষকদের মতে, অনেক সময় এমনকি একটি ব্যবহৃত টয়লেট শীটে থাকা জীবানুর চেয়েও বেশী জীবানু থাকে টাকায়। এদেশে ব্যাংক থেকে শুরু করে সাধারণ দোকানদার, অনেকের মধ্যেই আঙ্গুলে থুতু লাগিয়ে টাকা গোনার একটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যায়। এর মাধ্যমে সরাসরি জীবাণু মুখে প্রবেশ করে। আবার লালার মাধ্যমে অসুস্থ মানুষের শরীরের জীবানু টাকার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। দেশের সুস্থ অসুস্থ লাখ লাখ এমনকি কোটি মানুষ প্রতিদিন এই ব্যাংক নোট ব্যবহার করেন। এভাবে বিভিন্ন রোগের জীবানুও সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।
টাকা অর্থাৎ কাগুজী মুদ্রা এদেশের মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই ছেড়া-ফাটা ময়লা যা-ই হোক ব্যক্তি পর্যায়ে কেউ চাইলেও এর ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পারবে না। শুধুমাত্র সরকারী পর্যায়ে ভিন্ন ও বিকল্প কোন ব্যবস্থা করা হলে কিংবা নোংরা ও পুরোনো-ময়লা নোট ঘন ঘন পাল্টানোর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নোংরা রোগ জীবানুপূর্ণ টাকা ব্যবহারের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। সচেতন মহল ডিজিটাল লেনদেনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন এ ধরনের বিপত্তি এড়াতে। মোবাইল ব্যাংকিং ও কার্ডের ব্যবহার অনেক বেশী নিরাপদ বলে তারা মনে করেন। অসুস্থ, বৃদ্ধ ও শিশুদেরকে নোংরা ময়লা নোট থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করার পরামর্শ দেন তারা। তাদের পক্ষ থেকে অন্যরা যেনো এসব ব্যাংক নোট ব্যবহার করেন।
টাকা নাড়াচাড়া করার পর কোন কিছু খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে খুব ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে। মাঝে মধ্যে মানিব্যাগ বা পার্স পরিস্কার করতে হবে। টাকার সঙ্গে রুমাল বা টিস্যু পেপার রাখা উচিত নয়। ইতোপূর্বে মিডিয়ায় ‘ক্যাশবিহীন লেনদেনে অভ্যস্থতা স্মার্ট প্রজন্মের চাহিদা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়েছে, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত জরুরী আর নতুন প্রযুক্তিকে স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করার জন্য নবীনেরাই কান্ডারী। তাদের দৈনন্দিন লেনদেনে নগদ টাকার চেয়ে ডিজিটাল পদ্ধতিই বেশী মানানসই। ক্যাশবিহীন লেনদেন যেমন সহজ তেমনি দ্রুত ও নিরাপদ। নগদ টাকা বহনের খরচ ও সময় অপচয় দু’টোই কমায়, লেনদেনে স্বচ্ছতা আনে এটা। ভাংতি ছেঁড়া-ফাটা জাল ও জীবানুযুক্ত টাকা ব্যবহারের ঝুঁকি দূর করে।
এছাড়া নগদ টাকা ছাপানো, সংরক্ষণ, পরিবহন ও নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রকে যে প্রচুর অর্থ ব্যয় ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হয়, ডিজিটাল লেনদেনে তা প্রয়োজন হবে না। এ অবস্থায় বাংলাদেশকেও অনেক উন্নত দেশের মতো ক্যাশবিহীন অর্থ লেনদেনের পদ্ধতি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। আর এটা করা সম্ভব হলে ছেঁড়াফাটা ও রোগ জীবানুপূর্ণ ময়লা ব্যাংক নোট ব্যবহার করে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকিও দূর হয়ে যাবে। বাংলাদেশ সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করবে, এমন প্রত্যাশা সচেতন মহলের।





