শিশু পরিবার থেকে দেড় বছরে ৮৩ শিক্ষার্থী ছাঁটাই
প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ মে ২০২৬, ৩:১২:০৭ অপরাহ্ন
# মানবেতর জীবন এতিম শিশুদের

মামুন পারভেজ: নগরের বাগবাড়িস্থ সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত সুবিধাবঞ্চিত এতিম শিশুদের আবাসিক প্রতিষ্ঠান সিলেট সরকারি শিশু পরিবার (বালক)-এ একের পর এক শিক্ষার্থী ছাঁটাই এবং আবাসন সংকটে শিক্ষার্থীদের মানবেতর জীবনযাপনের অভিযোগ উঠেছে।
একটি আবাসিক হল ভেঙে ফেলার পর থেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে শিক্ষার্থীদের নাম কেটে বের করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। গত দেড় বছরে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৮৩ জন শিক্ষার্থীকে ছাঁটাই করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে করে আশ্রয়হীন ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
জানা যায়, সরকারি শিশু পরিবার বালক শাখার আবাসিকে ১৭০টি আসন রয়েছে। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৫৩ জন। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৫ জনে। শিশু পরিবার বালক এর অধীনে তিনটি ভবন ছিল। যার মধ্যে দুটি ভবন ডরমেটরি -১ ও ডরমেটরি -২ তে শিক্ষার্থীরা বাস করতেন এবং অন্য একটি ভবনে ছিল অফিস। ভবন নির্মাণের জন্য ১৯৫৬ সালে স্থাপিত ডরমেটরি-১ ভবনটি ২০২৪ সালের জুন-জুলাই মাসে ভেঙে ফেলা হয়। এরপর থেকে আয়তনে ছোটো ডরমেটরি ২ ভবনে সব শিক্ষার্থীদের স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু জায়গা সংকুলান না হওয়ায় নানা অজুহাতে শিক্ষার্থীদের ছাঁটাই করা হয়।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ২০২৫ সাল থেকে ধীরে ধীরে বিভিন্ন অজুহাতে শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়া শুরু করে কর্তৃপক্ষ। আগে যেসব ছোটখাটো ভুলের জন্য সতর্ক বা শাস্তি দিয়ে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হতো, এখন একই ঘটনায় সরাসরি নাম কেটে দেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, মূলত আবাসিক সংকট সামাল দিতেই শিক্ষার্থীদের ছাঁটাই করা হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটি ভবনে গাদাগাদি করে বসবাস করছে শিশুরা। সংকুচিত কক্ষে বিছানার পর বিছানা পেতে কোনোমতে রাত কাটাতে হচ্ছে তাদের। কোথাও ৩টি বেডের রুমে ৭টি বেড ফেলা হয়েছে, কোথাও ৯ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী থাকছেন। রুমগুলোতে হাঁটারও জায়গা নেই। নেই পর্যাপ্ত পড়ার টেবিল, কাপড় রাখার আলনা কিংবা স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। ডরমেটরি ১ ভবনটিতে ছিল বিশাল হলরুম, নামাজের স্থান ও ডাইনিং স্পেস।
এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, “আগে একটা রুমে পাঁচজন থাকতাম। এখন নয়জন একসঙ্গে থাকতে হয়। ঠিকমতো পড়াশোনাও করা যায় না।”

নামপ্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় ৫ তলা ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে ডরমেটরি ১ ভবনটি ভাঙা হয়। নতুন ভবনের কাজ পায় খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠান। এরপর যথারীতি তারা ভবনের কাজ শুরু করলেও আশ্চর্যজনকভাবে হঠাৎ কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর মাস তিনেক পর পর আরও কিছু পাইলিং করা হয়। এরপর আর খবর নেই। এভাবে থেমে থেমে চলছে ভবনের পাইলিংয়ের কাজ। আবাসন সংকট সমাধানে নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠানের একটি টিন শেডের ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার কথাও ছিল, তারা তাও দেয়নি। এতে আবাসন সংকট তৈরি হয়।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, গত মাসের শুরুতে আবার পাইলিংরে কাজ শুরু করা হলেও এক সপ্তাহের মাথায় তা আবার বন্ধ হয়ে যায়। ভবনটির কাজ সম্পন্ন করে ২০২৭ সালের মধ্যে হস্তান্তর করার কথা। কিন্তু যে গতিতে কাজ এগুচ্ছে তাতে ২০৩০ সালের মধ্যেও কাজ শেষ করতে পারবে বলে মনে হয় না। এদিকে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা মানবেতর জীবন যাপন করছে।
বর্তমানে ভবনের নিচতলায় ২৬ জন, দ্বিতীয় তলায় ২৩ জন এবং তৃতীয় তলায় ২১ জন শিক্ষার্থী অবস্থান করছে। সংকটের কারণে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তিও প্রায় বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু সমাজসেবা অধিদপ্তরের সোনামনি নিবাস থেকে স্থানান্তরিত শিশুদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে আবাসন সংকটের পাশাপাশি প্রকট আকার ধারণ করেছে জনবল সংকটও। ২০টি পদের বিপরীতে মাত্র ৫ জন কর্মকর্তা কর্মচারী কাজ করছেন। যার মধ্যে সহকারী উপতত্ত্বাবধায়ক ১টি পদ আছে যা শূন্য, সহকারী শিক্ষকের দুই পদের বিপরীতে আছেন ১ জন, মেট্রন কাম নার্স একটি পদ শূন্য, কম্পাউন্ডার পদ সংখ্যা এক, যা শূন্য, ‘বড় ভাইয়া’ ৪ টি পদ থাকলেও আছেন একজন, খ-কালীন চিকিৎসক পদ একটি, যা শূন্য রয়েছে, অফিস সহায়ক পদ ছয়টির সবগুলোই শূন্য, কুক (রান্নার লোক) ২ জন থাকার কথা থাকলেও আছেন ১ জন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, রান্নার কাজে দুইজন কর্মী থাকার কথা থাকলেও এখন রয়েছেন মাত্র একজন। ‘ভাইয়া’ পদে ৪ জনের স্থলে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন। শিক্ষক দুই পদের মধ্যে কর্মরত আছেন একজন। সহকারী উপতত্ত্বাবধায়ক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটরকেই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। নৈশপ্রহরী, অফিস সহায়ক ও চিকিৎসক পদও শূন্য পড়ে আছে।
শিক্ষার্থীরা জানায়, আগে গৌরব, সৌরভ, আলোক, ধিমান, উজ্জ্বল, হীরক ও ঝলক নামে পৃথক ৭টি গ্রুপভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ছিল। কিন্তু জনবল ও অবকাঠামো সংকটে সেই শৃঙ্খলাও এখন ভেঙে পড়েছে। বর্তমানে মাত্র ৩টি গ্রুপে (উজ্জ্বল, হীরক ও ঝলক) শিক্ষার্থীরা বাস করছেন। এমনকি ইমামের জন্য নির্ধারিত কক্ষও আর নেই। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় তিনি বাইরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন এবং শুধু নামাজের সময় এসে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে সরকারি শিশু পরিবার (বালক)-এর উপতত্ত্বাবধায়ক মুনতাকিম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “২০২৬ সালে নতুন করে ১০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজন সোনামনি নিবাস থেকে এসেছে এবং পাঁচজন নতুন ভর্তি। বর্তমানে তালিকাভুক্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০৫ জন। তবে নিয়মিত উপস্থিত থাকে ৭০ থেকে ৮০ জন। বাকিরা ছুটিতে থাকে।”
তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, যদি আসন ও সুযোগ-সুবিধা পর্যাপ্তই থাকে, তাহলে কেন একের পর এক শিক্ষার্থীকে প্রতিষ্ঠান ছাড়তে হচ্ছে? আর কেনই বা একটি কক্ষে গাদাগাদি করে মানবেতর পরিবেশে থাকতে হচ্ছে এতিম শিশুদের?
এ বিষয়ে সিলেট জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আব্দুর রফিক বলেন, ‘ভবন নির্মাণের জায়গায় গাছ ছিল। সেগুলো নিলামে বিক্রি করতে সময় লেগেছে।’ কাজ ধীর গতিতে হচ্ছে স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘ভবন নির্মাণের প্রাক্কলন ব্যয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় মূলত কাজে গতি কম। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন খুব শীঘ্রই মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন হয়ে যাবে। অনুমোদন হলেই দ্রুত গতিতে কাজ শেষ হয়ে যাবে।’
ছাত্র ছাঁটাইয়ের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘প্রতিবছরই ছাত্র কমে। এটা স্বাভাবিক নিয়মেই কমেছে। তবে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় আমরা নতুন ছাত্র কম নিচ্ছি।’
জনবল সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জেলায় প্রায় ৫৫ শতাংশ জনবল সংকট রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৭০ শতাংশই লোকবল নেই। আমরা এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছি আশা করছি তারা খুব শীঘ্রই লোকবল নিয়োগ দিবেন।’
এ বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি অবগত নই। আমি খোঁজ নিয়ে বিষয়টি দেখছি কেন এমনটা হচ্ছে। তবে জনবল সংকটের বিষয়ে তারা আমাকে জানিয়েছেন। আমরা এ বিষয়ে কথা বলেছি।’
সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় ও সুষ্ঠু বিকাশ নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে সিলেট শিশু পরিবার (বালক)-এ এখন বিরাজ করছে অব্যবস্থাপনা, সংকট ও অনিশ্চয়তা। দ্রুত নতুন ডরমেটরি নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হলে এসব শিশুর ভবিষ্যৎ আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।




