লোডশেডিংয়ে স্থবির জনজীবন
প্রকাশিত হয়েছে : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৩:০৭:১৪ অপরাহ্ন
উদ্বিগ্ন পরীক্ষার্থীরা, ব্যবসা বাণিজ্যে ধস

স্টাফ রিপোর্টার : ঘন্টায় ঘন্টায় লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত সিলেট| চাহিদার তুলনায় ˆদনিক গড়ে মিলছে ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ| একটু তাপমাত্রা বাড়লেই কমছে সরবরাহ| শহর থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে|
এরই মধ্যে আগামীকাল থেকে শুরু হতে যাচ্ছে এসএসসি পরীক্ষা| এমন সময়ে মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকমহল| সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ করতে গিয়ে ব্যবসা বাণিজ্যে নামছে ধস| ভয়াবহ লোকসানের মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা| জ্বালানি সংকটের কারণে মিলছেনা ডিজেল-পেট্রোল| ফলে বন্ধ রয়েছে জেনারেটর| এর প্রভাব পড়েছে বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে| একটি ফটোকপির জন্য দোকানে কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত গ্রাহকদেরকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে|
শহর এলাকায় গড়ে ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ পেলেও থেকে গ্রামাঞ্চলে ভয়াবহ লোডশেডিং| গ্রামীণ জনপদে গড়ে চাহিদার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎও পাচ্ছেন না সাধারণ গ্রাহক| ফলে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুদের নাজুক পরিস্থিতিতে জনজীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে| বিশেষ করে অসুস্থ, বয়স্ক ও শিশুরা পড়েছেন বিপাকে| চরম ¯^াস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন তারা|
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সিলেটের তথ্যমতে, রোববার সিলেট বিভাগে পিডিবির বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২১০ মেগাওয়াট| এর বিপরীতে সরবরাহ মিলেছে ১৪৭ মেগাওয়াট| ফলে ৩০ শতাংশ অর্থাৎ লোডশেডিং হয়েছে ৬৩ মেগাওয়াট|
সিলেট জেলায় ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলেছে ১১২ মেগাওয়াট| ফলে ৩০ শতাংশ অর্থাৎ ৪৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে|
এমন পরিস্থিতি থেকে সহসা মুক্তির সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্টরা| তারা বলছেন, তীব্র জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতির কারণে শুধু সিলেট নয়, দেশব্যাপী লোডশেডিং চলছে| বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি না হলে লোডশেডিং থেকে মুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ| জাতীয় গ্রিড থেকে নিয়ন্ত্রণ হয় সিলেটের লোডশেডিং| ফলে কোথায় কখন কয়ঘন্টা লোডশেডিং হয় সেটা সিলেট থেকেও জানা যায়না| রোববার পিডিবিতে ঘাটতি ছিল ৩০-৩৫ শতাংশ| তবে এই সময়ে পল্লী বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৪৫ শতাংশের মতো|
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে| এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে| তাছাড়া যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সিলেটে তিনটি কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে| যার কারণে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিয়েছে|
এদিকে হঠাৎ করে ঘনঘন লোডশেডিং নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরাও| তাদের অভিযোগ, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশনার কারণে ব্যবসা আগেই সীমিত হয়ে গেছে| তার ওপর দিনভর বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন যেমন বিপর্যস্ত, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব| এতে লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে|
সিলেটের বন্দরবাজার এলাকার হাসান মার্কেটের ব্যবসায়ী বদরুল আলম বলেন, ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং হচ্ছে| একদিকে সন্ধ্যার ৭টার ভেতরে দোকানপাট লাগানো নির্দেশনা রয়েছে| এই পরিস্থিতি ক্রেতারাও মার্কেটে আসছেন না|
নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা যুক্তরাজ্য প্রবাসী আনওয়ার হোসেন বলেন, আমি একটা টাওয়ারের ফø্যাটে পরিবার নিয়ে বাস করছি| টাওয়ারে অন্তত শতাধিক ফ্ল্যাটে পরিবারসহ অনেকে বসবাস করছেন| আগে বিদ্যুৎ গেলে সার্বক্ষণিক জেনারেটর চালু থাকতো| কিন্তু এখন চাহিদমতো জ্বালানি না পাওয়ায় জেনারেটরও বন্ধ থাকছে| এতে পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছি|
এমন পরিস্থিতি সিলেট নগরীর সকল বিলাসবহুল থেকে শুরু করে সাধারণ মানের ফ্ল্যাটের| পাম্প থেকে জ্বালানি কিনতে হলে প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয়| কিন্তু ফø্যাটের কথা শুনলে অনেকে পাম্পই চাহিদামতো তেল দিতে আগ্রহী হয়নি| একটি টাওয়ারে যেখানে ˆদনিক চাহিদা ১০০ লিটার| সেখানে পাম্প থেকে মিলছে ১০ থেকে ১২ লিটার| ফলে ঘন্টার পর ঘন্টা অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের|
এদিকে নগরীর অনেক মসজিদে রয়েছে জেনারেটর ব্যবস্থা| পাম্প থেকে মসজিদের চাহিদামতো জ্বালানি তেল না পাওয়ায় লোডশেডিং চলাকালে চালানো যাচ্ছেনা জেনারেটর| এ নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়ছেন সাধারণ মুসল্লীরা| রোববার জোহরের নামাজের সময় জেনারেটর না ছাড়ার কারণে নগরীর কুদরত উল্লাহ মসজিদের কয়েকজন মুসল্লীকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়| তখন মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানান, কয়েকটি পাম্প ঘুরে জ্বালানি না পাওয়ায় জেনারেটর চালানো যাচ্ছেনা| এতে ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত হলেও সরকারকে এ বিষয়ে নজর দেয়ার দাবি জানান মুসল্লীগণ|
নগরীর সুবিদবাজার এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ শরীফ আহমদ বলেন, ঘন্টায় ঘন্টায় লোডশেডিং হচ্ছে| বাসা-বাড়িতে শিশুদের নিয়ে খুব কষ্টে সময় কাটাতে হচ্ছে| এরই মধ্যে বাসায় আইপিএস আছে কিন্তু চার্জটুকু হওয়ার সময় মিলছেনা|
সিলেট নগরীর চেয়ে গ্রামীণ পর্যায়ে অবস্থা আরও ভয়াবহ| কোনো কোনো এলাকায় পুরো রাতেও মিলছেনা বিদ্যুৎ| দিনেও বিদ্যুৎ ২ ঘন্টা পর আসে ফের আধাঘন্টার মধ্যেই চলে যায়|
শান্তিগঞ্জ উপজেলার ধনপুর গ্রামের বাসিন্দা ইসলাম উদ্দিন বলেন, আমাদের এলাকায় এখন বিদ্যুৎ যায়না বরং মাঝে মাঝে আসে| বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে|
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেট বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন জানান, লোডশেডিং শুধু সিলেট নয়, সারাদেশেই হচ্ছে| জাতীয় গ্রীডে চাহিদামতো বিদ্যুৎ না পাওয়ায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা কিছুটা বেড়েছে| এসএসসি পরীক্ষার জন্য সন্ধ্যার পর লোডশেডিং বন্ধের কোন নির্দেশনা পাইনি| তবে কেন্দ্র থেকে লোডশেডিংয়ের জন্য শিডিউল প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে|
তিনি বলেন, রোববার সন্ধ্যায় বিভাগে চাহিদা ছিলো ২১০ মেগাওয়াট বিপরীতে সরবরাহ পেয়েছি ১৪৭ মেগাওয়াট| ফলে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং করতে হয়েছে| জেলায় ১৬০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পেয়েছি ১১২ ফলে জেলাতেও ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ পেয়েছি| জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন না বাড়লে এ পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়|
সিলেটের পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পরেশ চন্দ্র মন্ডল বলেন, রোববার সিলেট বিভাগে পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৫৭৬ মেগাওয়াট| সরবরাহ মিলেছে ৩৬১ মেগাওয়াট| ঘাটতি হয়েছে ২১৫ মেগাওয়াট| এতো বড় ঘাটতির কারণে ঘনঘন লোডশেডিং হচ্ছে| জাতীয়ভাবে সরবরাহ বৃদ্ধি না হলে স্থানীয়ভাবে লোডশেডিং কমানোর কোন সুযোগ নেই|




