দেশে বজ্রপাতের ভৌগলিক বিস্তৃতি
প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ জুন ২০২৬, ৩:৫৯:৩৯ অপরাহ্ন
১ দশকে সাড়ে ৩ হাজার মৃত্যু, সর্বোচ্চ সিলেটে
বুধবার মৌ’বাজারে ১৪টি গরু-মহিষের মৃত্যু
জালালাবাদ রিপোর্ট : দেশে বজ্রাপাতের ভৌগলিক বিস্তৃতি ঘটেছে। গত কয়েক বছরে বজ্রপাত দেশের প্রায় সব জেলাতেই প্রভাব ফেলেছে। এতে এক দশকে দেশে বজ্রপাতে সাড়ে ৩ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রাণ হারাচ্ছে অন্য প্রাণীকূলও।
সর্বশেষ গতকাল বুধবার মৌলভীবাজার জুড়ীতে বজ্রাঘাতে একসঙ্গে ১৩টি গরু ও একটি মহিষসহ মোট ১৪টি গবাদিপশু মারা গেছে। দুপুরে এ ঘটনা ঘটে উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের কুচাই চা বাগান এলাকায়। এর আগে গত ২৭ এপ্রিল দেশে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বজ্রপাতে, এরমাঝে সিলেট বিভাগেরই ৫ জন।
দেশে সাধারণত মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বজ্রঝড়-বজ্রপাত হয় এবং এই দুর্যোগ সবচেয়ে বেশি হয় দেশের উত্তর-পূর্ব দিকের অঞ্চল সিলেটে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে সিলেটেই।
পত্রপত্রিকা খুললেই বজ্রপাতে মৃত্যুর খবর দেখা যায়। কিন্তু বজ্রপাতে মৃত্যুর হার ঠিক কত, আগে তা হিসাব করা হতো না। তবে ২০১৫ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ ঘোষণা করা হয়। তারপর থেকে অন্যান্য দুর্যোগে প্রাণহানির তথ্যের পাশাপাশি এই তথ্যও সংরক্ষণ করা হয়।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মাঝে বাংলাদেশে বজ্রপাতে মারা গেছে মোট তিন হাজার ৬৫৮ জন।
বজ্রপাতে মৃত্যুর সেই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত এক দশকে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে ওঠানামা করেছে এবং একটি সময় পর্যন্ত এর প্রবণতা ছিল ঊর্ধ্বমুখী।
এর মাঝে ২০১৫ সালে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২২৬ জন। পরের বছর ২০১৬ সালে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯১ জনে। ২০১৭ সালে কিছুটা কমে ৩৮৮ জন হলেও ২০১৮ সালে আরও কমে ৩৫৯ জনে নেমে আসে।
এরপর ২০১৯ সালে আবার বৃদ্ধি পেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০১ জনে এবং ২০২০ সালে সর্বোচ্চ ৪২৭ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ, এই সময়টিতে বজ্রপাতজনিত মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।
তবে ২০২১ সাল থেকে ধীরে ধীরে বজ্রপাতে মৃত্যু কমার প্রবণতা দেখা যায়। ওই বছর ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন এবং ২০২৩ সালে ৩২২ জনের মৃত্যু হয়।
২০২৪ সালে এটি আরও কমে ২৭১ জনে নেমে আসে এবং ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে দাঁড়ায় ১৭৩ জনে। চলতি বছরেও এখন পর্যন্ত বজ্রপাতে কমপক্ষে ৩৫ জন মানুষ মারা গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মৃত্যু কম হলেও বজ্রপাতের ভৌগলিক বিস্তৃতি ঘটেছে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বাংলাদেশের সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়। জেলার ভেতরে জামালগঞ্জ উপজেলাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।
গত এক দশকে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে এই উপজেলাতেই। এর বাইরে নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, ফরিদপুর, মাদারীপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, বরিশালের খেপুপাড়াসহ আরও কিছু এলাকায় তুলনামূলক বেশি বজ্রপাত হয়।
মূলত, ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যের কারণে সিলেটে বজ্রপাত বেশি ঘটে।
সর্বোচ্চ মৃত্যু সিলেটে, কোন কোন অঞ্চল ঝুঁকিপূর্ণ :
এর ব্যাখ্যায় আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, জলীয় বাষ্প সমৃদ্ধ এলাকার আশেপাশেই বজ্রপাত বেশি হয়। এক্ষেত্রে সিলেট অঞ্চলে বড় বড় হাওড় রয়েছে, যা থেকে প্রচুর জলীয়বাষ্প তৈরি হয়। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয়বাষ্প সমৃদ্ধ বাতাস দক্ষিণ-পশ্চিম দিক দিয়ে সিলেট অঞ্চলে প্রবেশ করে। এই আর্দ্র বাতাস সিলেটের উত্তর-পূর্ব দিকের পাহাড়ের সঙ্গে সংঘর্ষে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে দ্রুত উপরের দিকে উঠে যায়।
এই উর্ধ্বগামী আর্দ্র বাতাস ঠান্ডা হয়ে ঘনীভূত হলে মেঘ তৈরি হয়, বিশেষ করে কিউমুলোনিম্বাস বা বজ্রমেঘ। এই প্রক্রিয়াই বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
এছাড়া, উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা শুষ্ক ও গরম বাতাসের সঙ্গে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাসের সংঘর্ষও বজ্রপাতের একটি বড় কারণ।
এই দুই ধরনের বাতাসের মিলনস্থল হিসেবে সিলেটসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দেশের কিছু উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ি অঞ্চল এবং হিমালয়ের পাদদেশ ঘিরে যে আবহাওয়াগত ব্যবস্থা তৈরি হয়, তার প্রভাবও বাংলাদেশে পড়ে।
এসব অঞ্চল থেকে তৈরি হওয়া বজ্রমেঘ পশ্চিমবঙ্গ হয়ে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় প্রবেশ করে এবং স্থানীয় জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মিশে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে, হাওরের জলীয় বাষ্প, পাহাড়ের বাধা, এবং ভিন্ন ধরনের বায়ুপ্রবাহের সংঘর্ষ-এই তিনটি প্রধান কারণে সিলেট ও আশপাশের এলাকায় বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
আবহাওয়া অফিসের তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে বজ্রপাত দেশের প্রায় সব জেলাতেই প্রভাব ফেলেছে। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, বজ্রপাতের ভৌগোলিক বিস্তৃতি কমেনি, বরং কিছুটা বেড়েছে; তবে সাম্প্রতিক সময়ে আহতের সংখ্যা কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
২০১৫ সালে দেশের ৪৫টি ও ২০১৬ সালে ৫৭টি জেলায় বজ্রপাত হয়েছিলো। ২০১৭ সালে জেলার সংখ্যা বেড়ে ৬০টিতে দাঁড়ালেও ২০১৮ সালে তা কিছুটা কমে ৫০-এ নেমে আসে।
এর পরের বছর দেশের ৫৬টি জেলায় বজ্রপাতের প্রভাব দেখা গেছে এবং সে বছর চার শতাধিক নিহতের পাশাপাশি মোট ১০৮ জন নিহতও হয়েছে। আর ২০২০ সালে তো দেশের ৫৯টি জেলায় সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছিলো এবং আহত হয়েছিলো ৮৮ জন।
এছাড়া, ২০২১ সালে ৫৭টি জেলায় ১২৪ জন, ২০২২ সালে ৫৮টি জেলায় ৮৭ জন, ২০২৩ সালে ৫৬টি জেলায় ৬১ জন, ২০২৪ সালে ৬৪টি জেলায় ৫৩ জন আহত হয়েছিলো।
কোন মাসে বজ্রপাত বেশি হয়?
বাংলাদেশের ৩৮ শতাংশ বজ্রসহ ঝড় হয় মার্চ, এপ্রিল ও মে (বৈশাখ) মাসে হয়। আর জুন, জুলাই, অগাস্ট ও সেপ্টেম্বরে (বর্ষাকাল) হয় ৫১ শতাংশ। কিন্তু “তাণ্ডব, ক্ষয়ক্ষতি, প্রাণহানি আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বজ্রপাত বেশি হয় বৈশাখ মাসের বজ্রসহ ঝড়ে। বর্ষাকালের চেয়ে বৈশাখ মাসের ঝড় ধ্বংসাত্মক, গুরুত্বপূর্ণ।
বৈশাখ মাসে ঝড় রূদ্রমূর্তি ধারণ করে বলেই বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে স্থানীয়ভাবে একে কালবৈশাখী বলা হয়। কিন্তু পুস্তকের ভাষায় এটি বজ্রঝড়। অর্থাৎ, মার্চ-মে মাসের ঝড়কে কালবৈশাখী ঝড় বলা হলেও আর জুন-সেপ্টেম্বরে ঝড় হলে তা কালবৈশাখী না, বজ্রসহ ঝড়।
বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে সাধারণত শেষ বিকেলে এবং সন্ধ্যার দিকে কালবৈশাখী হয়। কিন্তু পূর্বাঞ্চলে সন্ধ্যার পরে হয়। তবে কালবৈশাখী কোথায়, কতক্ষণ হবে সেটি আগে থেকেই জানিয়ে দেয়ার মতো বৈজ্ঞানিক কোন উপায় এখনো নেই। আবার এটি হঠাৎ করে ধেয়েও আসে না।
মূলত, ব্যাপক গরমে ঈশান কোণে জমা হওয়া কালোমেঘ বা বজ্রমেঘ এ ঝড়ের আভাস দেয়।




