ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হতে কঠোর হচ্ছে শর্ত
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৩:০২ অপরাহ্ন
জামানত পাঁচ গুণ, নির্বাচনী ব্যয়সীমা দ্বিগুণ

জালালাবাদ ডেস্ক: স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা কমাতে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার শর্ত কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংশোধিত বিধিমালায় চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত পাঁচ গুণ এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য প্রার্থীর জামানতও পাঁচ গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়সীমা দ্বিগুণ করা হচ্ছে।
তবে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে বিদ্যমান বিধানের মতোই নির্ধারিত অন্যান্য যোগ্যতা পূরণ করলে যে কেউ ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন।
সংশোধিত ইউপি নির্বাচন বিধিমালা ইতোমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে নির্বাচন কমিশনে এসেছে। আগামী সপ্তাহে এসআরও নম্বর দেওয়ার জন্য এটি আবারও আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে।
স্থানীয় সরকারের অপর চার প্রতিষ্ঠানÑউপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের নির্বাচন বিধিমালায়ও সংশোধন আনা হচ্ছে। এসব বিধিমালাও আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
পাঁচ গুণ বাড়ছে জামানত
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে। সাধারণ ওয়ার্ডের সদস্য এবং সংরক্ষিত নারী সদস্য প্রার্থীর জামানত ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে জামানত বাজেয়াপ্তের শর্তও কঠোর করা হচ্ছে। নির্বাচনে মোট প্রদত্ত ভোটের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ না পেলে প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। বর্তমানে প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ বা ১২ দশমিক ৫ শতাংশের কম ভোট পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।
দ্বিগুণ হচ্ছে নির্বাচনী ব্যয়সীমা
সংশোধিত বিধিমালায় চেয়ারম্যান প্রার্থীর সর্বোচ্চ নির্বাচনী ব্যয়সীমা ৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে। সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য প্রার্থীদের ব্যয়সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হচ্ছে।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো নির্দলীয় ও প্রতীকবিহীন হওয়ায় বিশেষ করে ইউপি নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। একই প্রবণতা অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও দেখা দিতে পারে। এতে ব্যালটে প্রার্থীসংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি ভোটকেন্দ্র পরিচালনা, প্রার্থী ও এজেন্টদের ব্যবস্থাপনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হলে নির্বাচনী ব্যয়ও বাড়বে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই প্রার্থীসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিধিমালায় জামানতসহ বিভিন্ন শর্ত কঠোর করা হচ্ছে।
যোগ্য প্রার্থীদের সুযোগ কমার শঙ্কা
জামানত পাঁচ গুণ বাড়ানোর ফলে নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল কিন্তু যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণœ হতে পারে বলেও মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আবদুল আলীম বলেন, জামানতের পরিমাণ এবং জামানত রক্ষার শর্ত কঠোর হলে প্রার্থীসংখ্যা কমবে, নির্বাচন পরিচালনার ব্যয় কমবে এবং নির্বাচন ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে। তবে এর ফলে অনেক যোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তির প্রার্থী হওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। জামানত হারানোর আশঙ্কায় অনেকে নির্বাচন থেকে দূরে থাকবেন। এতে যেকোনো যোগ্য ব্যক্তির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে জামানত বাড়ানোর একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, বর্তমানে অনেক প্রার্থী নিজের জয় নিশ্চিত করতে ‘ডামি’ প্রার্থী দাঁড় করান। এসব ডামি প্রার্থীর নামে অতিরিক্ত এজেন্ট নিয়োগ করে ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। জামানতের পরিমাণ বাড়ানো হলে এ ধরনের ডামি প্রার্থী দাঁড় করানো এবং এজেন্ট কেনাবেচার প্রবণতা কমতে পারে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী ব্যয়সীমা বাড়ানোর উদ্যোগকে সমর্থন করেন আবদুল আলীম। তবে নির্ধারিত সীমার মধ্যে প্রার্থীরা নির্বাচনী ব্যয় করছেন কি না, তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
‘২৫ হাজার টাকা খুব বেশি নয়’
তবে জামানত বাড়ানোর কারণে যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা নাকচ করেছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
তিনি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। এ অবস্থায় ২৫ হাজার টাকা জামানত একজন প্রার্থীর জন্য খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। তা ছাড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানত আগে থেকেই ২৫ হাজার টাকা নির্ধারিত রয়েছে। এর সঙ্গে সমন্বয় করেই ইউপি নির্বাচনে জামানত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নির্বাচনী ব্যয়সীমাও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার জানান, ইউপি নির্বাচন বিধিমালার সংশোধনী আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে ইসিতে এসেছে। স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সংশোধিত বিধিমালাও দ্রুত ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
হলফনামায় বাড়ছে তথ্যের পরিধি
সংশোধিত বিধিমালায় প্রার্থীদের নির্বাচনী হলফনামায় আরও কিছু তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হচ্ছে। হলফনামায় নতুন তথ্য সংযোজনের পাশাপাশি অসত্য তথ্য প্রদান করলে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
একক প্রার্থী থাকলে আগের মতোই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণার বিধান বহাল রাখা হয়েছে।
নির্বাচনী অপরাধে বাড়ছে শাস্তি
নির্বাচন-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনরত কোনো ব্যক্তিকে হুমকি, ভয় দেখানো বা আঘাত করা এবং ভোটারকে ভোট দিতে বাধা দেওয়ার মতো অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদ-ের বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে রিটার্নিং কর্মকর্তা বা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে জরিমানা করার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী অপরাধের শাস্তি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্বাচনী অপরাধে ন্যূনতম ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদ- এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদ- হতে পারে।
অনিয়ম হলে ভোট বন্ধের ক্ষমতা ইসির
ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে নির্বাচন বন্ধ বা বাতিল করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি কোনো প্রার্থীর এজেন্ট না থাকলেও সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে নির্বাচন বৈধ হিসেবে গণ্য হবেÑএমন বিধানও যুক্ত করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ইউপি নির্বাচনে ব্যবহৃত প্রতীকেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।





