বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি কি স্বৈরতান্ত্রিক অনুশীলন?
প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ জুন ২০২৬, ৯:৩৪:৫৩ অপরাহ্ন
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে, দ্বিতীয় দফায় জ¦ালানী তেলের দাম বাড়ানো অপ্রয়োজনীয় ছিলো। আর বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। সংস্থাটির মতে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতিতে, বাড়বে মূল্যস্ফীতি। রাজস্ব আহরণে ঘাটতি, ব্যাংক খাতের বিশৃংখলাসহ নানা কারণে এখনও অর্থনীতি চাপে রয়েছে। অর্থবছরের শেষ দিকে বিদ্যুৎ ও জ¦ালানী তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এতে শিল্প ও জ¦ালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
সিপিডি’র ফেলো ডঃ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রত্যক্ষ যারা এটা ভোগ করেন, অবশ্যই তাদের জন্য বাড়তি বোঝা হবে। ইতোপূর্বে বিদ্যুতের বাড়তি দাম প্রত্যাহারের দাবি জানান স্টিল মিল মালিকেরা। তারা বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়েই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা শিল্পখাতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বলেছে, সরকারের বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী এবং দেশের অর্থনীতি, শিল্প ও কৃষি খাতের ওপর এটা, নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। জামায়াতের সেক্রেটারী জেনারেল বলেন, বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে। এমনিতেই নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মানুষ চরম সংকটের মধ্যে রয়েছেন। এ অবস্থায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি জনদুর্ভোগ আরো বাড়িয়ে তুলবে। তিনি আরো বলেন, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অপচয় এবং বিভিন্ন প্রকল্পে অস্বচ্ছ ব্যয়ের কারণে জনগণকে বার বার মূল্যবৃদ্ধির বোঝা বহন করতে হচ্ছে। সরকারের উচিত বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি, অপচয় ও অনিয়ম বন্ধ করে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার প্রদান। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করা।
এর আগে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সংবাদ সম্মেলন করে বিদ্যুতের নতুন মূল্য ঘোষণা করে যা জুন থেকে কার্যকর হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে বিদুতের দাম ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সম্প্রতি মিডিয়ায় ‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিঃ কার দায়, কে মেটাচ্ছে?’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ওঠে এসেছে। বলা হয়েছে, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির এই তড়িঘড়ি উদ্যোগ প্রমাণ করে, সরকার বদলালেও বিদ্যুৎ খাত পরিচালনায় মৌলিক দর্শন অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান অস্বচ্ছ চুক্তি, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, ক্যাপাসিটি চার্জ, দুর্বল জবাবদিহিতা এবং নীতিগত সুবিধাভোগীদের প্রভাব নিয়ে আলোচনা থাকলেও বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে এই কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন না ঘটিয়ে, পুরোনো ফ্যাসিবাদী পথেই বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। সরকার বিদ্যুতের অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলো সমাধান না করে আবারও সেই লুণ্ঠনমূলক ব্যয় সাধারণ গ্রাহকদেরও চাপিয়ে দেওয়ার পুরোনো নীতিই অনুসরণ করছে। এতে আরো বলা হয়েছে, জ¦ালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, তাই মূল্য সমন্বয় ছাড়া উপায় নেই।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বাড়তি খরচের কতোটুকু বৈশি^ক বাস্তবতার ফল, আর কতোটা বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা, অদক্ষতা ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর জন্য গড়ে ওঠা কাঠামোর কুফল? সেটা না দেখেই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি মূলত: সেই ব্যর্থতার খরচ জনগণের ওপর স্থানান্তরের একটি প্রক্রিয়া মাত্র। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সমস্যার মূল শুধু জ¦ালানির আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি নয়, বরং অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা, অলস বিদ্যুৎ কেন্দ্র, একপাক্ষিক বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, উচ্চ সক্ষমতা চার্জ, দুর্বল পরিকল্পনা এবং অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণও বটে।
সর্বোপরি, বিগত স্বৈরাচারী সরকার বিদ্যুৎ খাতে সর্বাধিক লুটপাট ও পাচারকার্য করেছে। এই খাত থেকে অর্থ লুট করে স্বৈরাচারী সরকারের মন্ত্রী ফারুক খানের ভাই আজিজ খান সিংগাপুরের শীর্ষ ধনী হয়েছেন। হাসিনা ও তার স্বজনদের অর্থ লুট ও পাচার হয়েছে এই খাত থেকেই সবচেয়ে বেশী, এমন অভিমত সংশ্লিষ্ট মহলের। এজন্য স্বৈরাচারী হাসিনা কখনোই দেশে একটি স্থায়ী বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ার কোন চেষ্টাই করেনি। নবায়নযোগ্য জ¦ালানী খাতে করেনি পর্যাপ্ত অর্থ বিনিয়োগ। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকারও হাসিনার দেখানো পথ ধরেই হাঁটছেন, এমন অভিমত সচেতন মহলের। এর প্রমাণ বিদ্যুতের বর্তমান অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। বিষয়টি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।




