সিলেট হাইটেক পার্কে বিনিয়োগে ভাটা
প্রকাশিত হয়েছে : ১১ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৫:৫৭ অপরাহ্ন

তামিম মজিদ
৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সিলেট হাইটেক পার্কে পড়ে আছে স্উুচ্চ ভবন ও দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো। ১৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল প্রাথমিক বিনিয়োগ ও ৪০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এই হাইটেক পার্ক স্থাপন করা হলেও সেই লক্ষ্য থেকে এখনও বহুদূরে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট থাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠানে নতুন সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না বহুদিন ধরে। নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের ভয়ে বিনিয়োগে সাহস করছে না প্লট ও স্পেস বরাদ্দ পাওয়া শিল্প গ্রুপ ও উদ্যোক্তারা। ফলে বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে বহুল প্রত্যাশিত সিলেট হাইটেক পার্কে ।
২০২২ সালে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম অনেক বেড়ে যায়। আমদানি করতে গিয়ে কমে যায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুত। এরপর দফায় দফায় গ্যাসের দাম বেড়েছে। কিন্তু সংকট আর যায়নি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকার দেশে গ্যাস উত্তোলনের ওপর জোর দিয়েছে। কিন্তু তাতে সময় লাগবে। সিটি গ্রুপ ও ডিবিএল গ্রুপসহ বহু বড় বড় শিল্প গ্রুপের নতুন কারখানা অলস পড়ে আছে। ফলে সিটি গ্রুপসহ কয়েকটি গ্রুপ খাদের কিনারে। ৩৬টি ব্যাংক এগিয়ে এসেছে সিটি গ্রুপকে সংকট থেকে টেনে তুলতে।
তথ্য বলছে, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বর্ণি এলাকায় ১৭১.৭ একর জমিতে নির্মিত হয়েছে সিলেট হাইটেক পার্ক। ২০২৩ সালে পার্কটি চালু করলেও নিরবিচ্ছিন গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ায় বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে এই প্রকল্পে। ৯টি প্রতিষ্ঠান ৪৪.৮৭ একর জমি বরাদ্দ পেলেও শুধুমাত্র একটি শিল্প গ্রুপ ছাড়া কেউই বিনিয়োগ করেনি এই হাইটেক পার্কে। এছাড়া ৫টি প্রতিষ্ঠান ১৯ হাজার ৬২ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ পেয়েছে। তবে কেউই ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেনি। এখানে বিনিয়োগে অনাগ্রহের মূল কারণ নিরবিচ্ছিন গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্য বলছে, নতুন কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার মাধ্যমে আর্ন্তজাতিক বাজারে প্রভাব বাড়ানো এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্য নিয়ে সিলেট হাইটেক পার্কের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর। অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন হয় ২০২৩ সালে । কথা ছিল, এই পার্ক হবে সিলেট অঞ্চলের তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত। হাজার হাজার মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার ঠিকানা। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়নি। পার্কটি চালুর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখানে কাঙ্খিত বিনিয়োগ আসেনি। গড়ে ওঠেনি শিল্প কারখানা। ফলে কর্মসংস্থানও হয়নি স্থানীয় মানুষের।
যদিও নানা অনিয়মের কারণে বিগত অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার প্রকল্পটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর হাইটেক পার্কটি সচল করার উদ্যোগ নেয়। বর্তমানে পাকর্টি পুরোদমে চালু করতে কাজ করছে সরকার।
জানা গেছে, হাইটেক পার্কে রয়েছে আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার, প্রশাসনিক ভবন, ৩৩ কেভিএ লাইনের ১০ মেগাওয়াট বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহের ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস স্টেশন, ইউটিলিটি ভবন, আনসার ব্যারাক, অভ্যন্তরীণ সড়ক, সেতু, গেস্ট হাউস ও কালভার্ট কাম স্লুইসগেট। হাইটেক পার্কের সুউচ্চ ভবন, প্রশস্ত রাস্তা, আর পরিকল্পিত প্লট সব মিলিয়ে চোখ ধাঁধানো পরিবেশ। কিন্তু ভেতরে গেলে মেলে শুধু নিস্তব্ধতা। কোনো যন্ত্রের শব্দ নেই, কর্মীদের পদচারণা নেই।
পার্কে গিয়ে দেখা যায়, নদীতে বিলীন হয়েছে সীমানা প্রাচীরের মাটি। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে অনেক স্থানে দেয়াল ধসে গেছে। উম্মুক্ত ও অরক্ষিত প্রায় এক কিলোমিটার সীমানা। অভ্যন্তরীণ সড়কের স্থানে স্থানে কার্পেটিং ওঠে গেছে। শেষ হয়নি অনেক কালভার্টের কাজও।
হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, সিলেট হাইটেক পার্কে ৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৪৪.৮৭ একর ও ৫টি প্রতিষ্ঠানকে ১৯ হাজার ৬২ বর্গফুট স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে র্যাংগস ইলেকট্রনিকস লিমিটেড ৩২ একর, হেলথ ল্যান্ডমার্ক হোল্ডিং লিমিটেড ১.৫ একর, রহমানিয়া সুপার মার্কেট ১ একর, টুগেদার আইটি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১ একর, ইনোটেক হোল্ডিং লিমিটেড ৩.৪২ একর, ইএলবি লিমিটেড ১ একর, আইরিশ ইলেকট্রনিক লিমিটেড ১.৮ একর, বঙ্গো টেকনোলজি লিমিটেড ১.৪ একর, এডিএন টেলিকম লিমিটেড ১.৭৫ একর জমি বরাদ্দ পেয়েছে। এর মধ্যে র্যাংগস ইলেকট্রনিকস লিমিটেড কারখানা স্থাপন করে উৎপাদন শুরু করেছে। বাকিগুলোর মধ্যে এডিএন টেলিকম লিমিটেড কারখানা স্থাপনের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আর হেলথ ল্যান্ডমার্ক হোল্ডিং লিমিটেড, রহমানিয়া সুপার মার্কেট ও টুগেদার আইটি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড প্রাথমিক নির্মাণ কাজ শুরু করলেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ রেখেছে। ইনোটেক হোল্ডিং লিমিটেড, বঙ্গো টেকনোলজি লিমিটেড, আইরিশ ইলেকট্রনিক লিমিটেড ও ইএলবি লিমিটেড কারখানা স্থাপনের কাজই শুরু করেনি।
আর ভবনে স্পেস বা জায়গা বরাদ্দ পেয়েছে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড ৩৮২৮ বর্গফুট, মেসার্স আব্দুল বাছির এন্টারপ্রাইজ ২২৬০ বর্গফুট, বাহন ইকোমোবাইল লিমিটেড বর্গফুট ২৯২২ বর্গফুট, ই-লার্নিং এন্ড আর্নিং লিমিটেড ৬০৩৬ বর্গফুট এবং আপস্কিল বাংলাদেশ ৪০১৬ বর্গফুট। এই ৫টির মধ্যে শুধু আপস্কিল বাংলাদেশের ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কাঙ্খিত বিনিয়োগ না আসায় অর্ধেকেরও বেশি জমি এবং স্পেস খালি রয়েছে হাইটেক পার্কে। আরও ৭৬ একর জমি এবং ২ হাজার ৫১৪ বর্গফুট জায়গা এখনো খালি রয়েছে। গ্যাসং সংকট ও বিদ্যুৎ সংযোগের অভাবে বিনিয়োগ টানতে পারছে না বলে জানা গেছে। এই হাইটেক পার্কে নতুন করে প্লট বরাদ্দ নিতে অনাগ্রহী উদ্যোক্তারা।
সিলেট হাইটেক পার্ক কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য মতে, এখানে প্রাথমিক বিনিয়োগ ১৫ হাজার কোটি ধরা হলেও এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৩শত কোটি টাকা। কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা ২০ হাজার ধরা হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৪শ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
তথ্য বলছে, বিনিয়োগকারীরা জমি বরাদ্দ নিয়েছেন, কিন্তু কারখানা বা প্রযুক্তি উদ্যোগ শুরু করেননি। কারণ হিসেবে বারবার উঠে আসছে অবকাঠামো সংকটের কথা বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। এতদিন পরও সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের এই পার্কের অবস্থা কার্যত নিষ্প্রাণ। তবে সংকট সত্ত্বেও এই পার্কে আশার আলো জাগাচ্ছে র্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড। এই পার্কে একমাত্র বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান র্যাংগস। র্যাংগস ইলেকট্রনিক্স প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার ৩০ ভাগ জনবল নিয়ে কারখানায় উৎপাদন শুরু করেছে। তাদের এই জনবলও নিয়মিত এবং প্রশিক্ষিত নয়, তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হচ্ছে।
র্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেডের ডিজিএম প্রকৌশলী মো. মোরশেদুল আলম বলেন, নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বিনিয়োগ করেছে র্যাংগস ইলেকট্রনিক্স। পুরোদমে উৎপাদনে যেতে না পারলেও গড়ে তিন শতাধিক জনবল এখানে কাজ করছেন। এখানে মূল সংকট হচ্ছে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও নিরাপত্তার অভাব। এছাড়া সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিনিয়োগে অনাগ্রহ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, সিলেট হাইটেক পার্কের এখনও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে এখানে উৎপাদিত ইলেকট্রনিক্স পণ্য দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সহজেই পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের সাতটি রাজ্যের বাজারে আধিপত্য তৈরি করতে পারে। তাতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে তৈরি হবে বিপুল কর্মসংস্থান এবং প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ জনবল।
র্যাংগস ইলেকট্রনিক্সের হাইটেক শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোরশেদ আলম বলেন, এই প্রকল্পে এখন পর্যন্ত হতাশা ছাড়া কিছু নেই। আর র্যাংগসের এই পরিণতি দেখে অন্য বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না। সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ফাহিম আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে বিনিয়োগের পরিবেশ পেলে প্রবাসীরা অবশ্যই এগিয়ে আসবেন। কিন্তু এক্ষেত্রে অহেতুক জটিলতা তৈরি করে রাখা হয়।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট হাইটেক পার্কের সহকারী পরিচালক এসএম আল মামুন জালালাবাদকে বলেন, আমরা বলি একভাবে, আপনারা লিখেন আরেকভাবে। এজন্য ফোনে আপনার প্রশ্নের কোনো উত্তর দেবো না। আপনার কিছু জানার থাকলে লিখিত আকারে দেন, তখন বিষয়টি দেখবো। পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত আকারে প্রশ্ন পাঠালে তিনি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রজেক্ট সর্ম্পকিত হাইটেক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো একটি প্রতিবেদন পাঠান। সেই প্রতিবেদনেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টিও ফুটে উঠেছে। সেখানে দ্রুত গ্যাস সংযোগ প্রদান, নিরিবিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বাস স্টপেজ নির্মাণের সুপারিশ করা হয়।
সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে আমরা বৈদেশিক শ্রমবাজারে আধিপত্য বৃদ্ধি করতে চাই। এজন্য দরকার উপযুক্ত ট্রেনিং সেন্টার। নতুন ট্রেনিং সেন্টার বানাতে সময় লাগবে। এখানে একটি প্রায় মৃত প্রকল্প পড়ে আছে। ভাষা ও কার্যদক্ষতায় প্রশিক্ষিত তরুণ জনবল তৈরি করতে এই অবকাঠামোগুলোকে আমরা কাজে লাগাতে চাই।






