রায়নগরে ট্রিপল মার্ডার ছোরা উদ্ধার, কারাগারে বাবুল
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ৮:৫১:৪৭ অপরাহ্ন
ফলোআপ— দেশে ফিরলেন ২ মেয়ে, বাকীরা আসবে কাল

স্টাফ রিপোর্টার : সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসায় প্রবীণ ব্যবসায়ী মো. আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছোরা উদ্ধার করেছে পুলিশ। আটক বাবুল মিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে রায়নগরের একটি খালি জায়গা থেকে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়। পরে সন্ধ্যায় আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার করা ছোরাটি বাবুলের দেওয়া বর্ণনার সঙ্গে মিলে গেছে। ছোরাটির ধাতব অংশে শুকনো রক্তের দাগ রয়েছে। ঘটনাস্থলের রক্তের নমুনার সঙ্গে ছোরায় থাকা রক্তের নমুনা মিলিয়ে দেখতে এটি ফরেনসিক পরীক্ষায় পাঠানো হবে। বাসার বেসিন, হাত ধোয়ার স্থান, একটি ব্যাগ এবং বারান্দাতেও রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার এসএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর ও প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডের পর ছোরাটি রায়নগরের একটি খালি জায়গায় ফেলে দেওয়ার কথা জানান। বুধবার সন্ধ্যায় খুঁজে না পেলেও বৃহস্পতিবার সকালে পুনরায় তল্লাশি চালিয়ে এটি উদ্ধার করা হয়।
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে বাবুলের প্রেমের সম্পর্কের তথ্য পাওয়া গেছে। পূর্বপরিচিত হওয়ায় বুধবার বাবুল ওই বাসায় যান। দরজা খুলে তাহমিনা তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেন। পরে তাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বাবুল তাহমিনাকে ছুরিকাঘাত করেন। এ সময় সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাঁর সঙ্গে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। তিনজনকে হত্যার পর বাবুল বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, ঘটনার পর বাবুল নিজের বাসায় ফিরে যান। পরে বিশেষ টিম অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই বৃহস্পতিবার হত্যায় ব্যবহৃত ছোরাটি উদ্ধার করা হয়।
কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির জানান, সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থানীয়দের সহায়তায় সন্দেহভাজন বাবুলকে শনাক্ত করা হয়। ঘটনার পর তিনি এলাকা ছেড়ে না গিয়ে রায়নগর রাজবাড়ির আক্তার মিয়ার কলোনিতে অবস্থান করছিলেন। সাদাপোশাকে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। আটকের সময় তাঁর পরনে লাল টি-শার্ট ছিল এবং হাতে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন বলেও জানান তিনি।
তবে পুলিশ বলছে, শুধু প্রেমের সম্পর্কই হত্যাকাণ্ডের একমাত্র কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ঘটনার পর বাসার কয়েকটি আলমারি ও ওয়ারড্রোব খোলা পাওয়া যায়। ঘটনাস্থল থেকে তিন পাতার একটি দলিলসদৃশ কাগজও উদ্ধার হয়েছে। এগুলোর সঙ্গে সম্পত্তি, পারিবারিক বিরোধ বা অন্য কোনো কারণের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে সিসিটিভিতে গুরুত্বপূর্ণ ফুটেজ না থাকায় আলামত, জিজ্ঞাসাবাদ ও পারিপার্শ্বিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তদন্ত চলছে।
প্রবাসে চার সন্তান, দেশে ফিরেছেন দুই মেয়ে:
নিহত আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগম দম্পতির চার সন্তানই প্রবাসে থাকেন। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এবং দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। পারিবারিক সূত্র জানায়, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দুই মেয়ে বৃহস্পতিবার দেশে পৌঁছান। স্বজনদের বহনকারী ফ্লাইটটি সকাল সাড়ে ৯টায় অবতরণের কথা থাকলেও বিলম্বের কারণে দুপুর দেড়টায় সিলেটে পৌঁছান তারা। পরবর্তীতে সিলেট বিমানবন্দর থেকে তারা সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে পৌছান। ময়নাতদন্ত শেষে সেখান থেকে মো. আব্দুস সাত্তার ও সুরাইরা বেগমের লাশ নিয়ে রায়নগরের নিজস্ব বাসভবনে যান। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) মো. আব্দুস সাত্তার ও সুরাইরা বেগমের লাশ দাফন করার কথা রয়েছে বলে জানা গেছে। অপরদিকে, নিহতের ছেলে সাবেক ছাত্রদল নেতা আরিফ ইফতেখার ও অপর মেয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুক্রবার দেশে আসার কথা রয়েছে। এরপর দাফন হবে।
এদিকে মা-বাবার নিথর মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দুই মেয়ে। একদিকে মা-বাবাকে হারানোর শোক, অন্যদিকে এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের বাস্তবতা-কিছুতেই যেন মেনে নিতে পারছিলেন না তারা। বারবার মরদেহের পাশে বসে বাবা-মায়ের কফিন জড়িয়ে ধরে কান্না করতে দেখা যায় তাদের। কান্নায় বিলাপ করতে করতে তারা স্বজনদের কাছে বারবার জানতে চান, কীভাবে তাদের মা-বাবাকে এভাবে হত্যা করা হলো। তাদের আহাজারিতে সেখানে উপস্থিত স্বজন ও প্রতিবেশীদের চোখেও পানি চলে আসে। এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় রায়নগরের ওই বাড়িতে। দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে মা-বাবার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছিল আনন্দের; কিন্তু সেই দেখা হলো নিথর মরদেহের পাশে-যা উপস্থিত সবাইকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
কারাগারে ঘাতক বাবুল, বাসায় পুলিশ মোতায়েন :
হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতার বাবুল মিয়াকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওসি খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির। আদালতের নির্দেশে সন্ধ্যায় তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর ‘নিকুঞ্জ ভিলা’য় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বাসাটির সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
নগরজুড়ে আতঙ্ক:
নৃশংস ট্রিপল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রায়নগরসহ পুরো সিলেট নগরজুড়ে আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে প্রবাসীদের স্বজনদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত প্রবাসী পরিবারের সদস্যরা নিজেদের বাড়িঘর ও বয়স্ক স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
অনেকেই বলছেন, প্রবাসে থাকা সন্তানদের রেখে দেশে একা বা স্বল্পসংখ্যক স্বজন নিয়ে বসবাসকারী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পাশাপাশি নগরীর আবাসিক এলাকাগুলোতে পুলিশি টহল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদারের দাবি উঠেছে।
প্রসঙ্গত- বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসা থেকে আব্দুস সাত্তার (৮২), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও গৃহকর্মী তাহমিনা (২৫)-এর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে স্থানীয় একজন পুলিশকে খবর দিলে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। পরে ওইদিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বাবুল মিয়াকে আটক করে পুলিশ। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার সকালে হত্যায় ব্যবহৃত ছোরাটি উদ্ধার করা হয়। আব্দুস সাত্তার বিয়ানীবাজারের আখাখাজনা এলাকার বাসিন্দা এবং রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন এবং একসময় কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।






