রায়নগরে ট্রিপল মার্ডার মেয়ের মামলার এজাহারে নেই গ্রেপ্তার বাবুলের নাম
প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ৮:৪৬:৪৫ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : সিলেট নগরীর রায়নগর রাজবাড়ি আবাসিক এলাকার আলোচিত ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম হত্যাকাণ্ডে নতুন মোড় দেখা দিয়েছে। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার বাবুল মিয়ার নামই নেই নিহত দম্পতির মেয়ে সেলিনা সুলতানার দায়ের করা এজাহারে। বরং এজাহারে দীর্ঘদিনের জমি ও মামলা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনি দিয়ে তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের তিনদিন পর শুক্রবার রাতে বাদী হয়ে এসএমপির কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেন নিহত সাত্তার দম্পতির মেয়ে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সেলিনা সুলতানা। মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মো. মঈনুল জাকির।
এজাহারে বাবুল মিয়ার নাম না থাকায় এবং পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে বাদীর অভিযোগে বড়ধরনের পার্থক্য থাকায় ঘটনাটি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। অন্যদিকে নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, জমি ও মামলা সংক্রান্ত বিরোধের জেরেই পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
এজাহারে সেলিনা সুলতানা উল্লেখ করেন, ১৯৯৭ সালে তিনি ও তাঁর বাবা পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতি সিলেটের কাছ থেকে রিকাবীবাজারের সরষপুর এলাকায় আনুমানিক ১২ শতক জমি লিজ নিয়ে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছিলেন। ২০০৬ সালে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম তাঁদের লিজ নেওয়া জমিসহ সমিতির প্রায় ৮০ শতক জমি ইম্পালস বিল্ডার্সের নামে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিল করেন এবং নামজারি করে মালিকানা দাবি করেন। এ নিয়ে ২০১৬ সালে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বত্ব মামলা করেন আব্দুস সাত্তার। পরে মামলাটি স্বত্ব-২১১/২০২৩ নম্বরে রূপান্তরিত হয়ে যুগ্ম জেলা জজ অতিরিক্ত আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেলিনার দাবি, মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাঁকে ও তাঁর বাবাকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালে সিরাজুল ইসলাম তাঁর বাবা এম এ সাত্তার, মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির বর্তমান চেয়ারম্যান জমিংথাংগা লুসাইসহ কয়েকজন লিজগ্রহীতার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন। মামলাটি অতিরিক্ত জেলা জজ ৫ম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি সিরাজুল ইসলাম আমিন হোসেনসহ কয়েকজনকে নিয়ে আব্দুস সাত্তারের বাসায় গিয়ে স্বত্ব মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেন। এনিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। পরে এঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৮ মে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সামনে মামলাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সিরাজুল ইসলাম নিহত সাত্তারের পক্ষের লোক মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে মারধর করে রক্তাক্ত জখম করেন বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় তৌহিদুল ইসলাম থানায় অভিযোগ করেন। পরে প্রতিকার না পেয়ে ৬ আগস্ট ২০২৫ আদালতে কোতোয়ালি সিআর ১০৫৭/২০২৫ নম্বর মামলা করেন। মামলাটি ডিবি সিলেট তদন্ত করছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেলিনা আরও অভিযোগ করেন, সর্বশেষ গত ২৮ জুলাই মুখ্য জেলা জজ ২য় আদালতে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূমি-সংক্রান্ত স্বত্ব ৭৩/২৩ মামলার শুনানির সময় তাঁর বাবার নিয়োজিত আইনজীবীকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয়। ৩০ জুলাই তাঁর বাবা আদালতে গেলে তাকেও মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে সেলিনা দাবি করেন, স্বত্ব মামলা থেকে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিলটি রক্ষা করার জন্য পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে গত ১২ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় তাঁর বাবা আব্দুস সাত্তার, মা সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে বাসা থেকে মামলা ও ভূমি সংক্রান্ত কাগজপত্র, জিডির কপি ও দলিলাদি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
এজাহারে নেই বাবুলের নাম, প্রশ্ন জনমনে:
নিহতদের মেয়ের দায়ের করা এজাহারে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার বাবুল মিয়ার নাম না থাকায় ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন এবং তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু বাদীর এজাহারে বাবুলকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। ফলে পুলিশের তদন্তে উঠে আসা ‘প্রেমঘটিত’ হত্যার ব্যাখ্যা এবং বাদীর এজাহারে বর্ণিত জমি ও মামলা সংক্রান্ত বিরোধ- দুটি ভিন্ন সম্ভাব্য কারণ সামনে এসেছে। এতে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
পূর্ববিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের ওপর অভিযোগ আনা হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ। তবে এটি এখন পর্যন্ত কেবল জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্ন; এজাহারে করা অভিযোগের সত্যতা কিংবা কোনো পক্ষের সম্পৃক্ততা তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
এদিকে কোতোয়ালি থানার ওসি খান মো. মঈনুল জাকির বলেছেন, এজাহারে বাবুলের নাম না থাকা এবং হত্যাকাণ্ডে তাঁর জড়িত থাকার বিষয়- দুটিই গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হবে।
থানায় এজাহার দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সেলিনা সুলতানা বলেন, ‘আমি আর আমার ভাই আসছি। আমি বিশ্বাস করি না তিনজনকে একা একটা ছেলে হত্যা করেছে। এর পেছনে বড় কোনো হাত আছে। আমাদের মা-বাবা যেভাবে খুন হয়েছেন, পরবর্তীতে যেন আর কোনো মা-বাবার এ রকম মৃত্যু না হয়। ছেলের কাঁধে যেন আর কোনো মা-বাবার লাশ না ওঠে।
গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টিও নাকচ করেন সেলিনা। তাঁর দাবি, কাজের মেয়েটিকে বাঁচাতে গিয়ে তাঁর মা মারা গেছেন। তাহমিনা তাঁদের কাছে আমানত ছিল এবং তাঁর কাছে কোনো মোবাইল ফোনও ছিল না বলে দাবি করেন তিনি। সেলিনার ভাষ্য, কেসটা ঘুরানোর জন্য মেয়েটাকে দেখানো হচ্ছে। এটা সত্য কোনো ঘটনা না।
পুলিশের বক্তব্য:
অন্যদিকে পুলিশ বলছে, বাবুল মিয়া পেশায় রংমিস্ত্রি এবং কিছুদিন আগে ওই বাসায় রঙের কাজ করেছিলেন। সে সময় গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে তাহমিনাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্র ধরে হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। পুলিশের দাবি, ঘটনার দিন বাবুল ওই বাসায় গিয়ে তাহমিনার সঙ্গে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে তাঁকে ছুরিকাঘাত করেন। তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে সুরাইয়া বেগম এবং পরে আব্দুস সাত্তারকেও হত্যা করা হয়। ঘটনার দিন বিকেলে রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার একটি কলোনি থেকে বাবুল মিয়াকে আটক করে পুলিশ। পরে ৫৪ ধারায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে বিচারকের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন এবং তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে নিহত দম্পতির ছেলে আরিফ ইফতেখার বলেন, ‘আমরা ওয়েট করি, দেখি রিমান্ডে নেওয়া হোক, তদন্ত হোক।’
এজাহারে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আপনারা সবাই জানেন, তিন দিন ধরে সিলেটে আলোচনা হচ্ছে। তদন্ত হোক। এবিষয়ে পরে কথা বলব আপনার সঙ্গে।
প্রসঙ্গত-
গত বুধবার সকালে রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলা থেকে ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। নিহত আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সদস্য ছিলেন। তাঁর চার সন্তানের মধ্যে দুই সন্তান যুক্তরাজ্য ও দুই সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। মা-বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে ৪ জনই দেশে ফিরে দাফনে অংশ নেন।
এখন এই আলোচিত ট্রিপল মার্ডারের তদন্তে সামনে এসেছে দুই ধরনের বয়ান- পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার বাবুলের কথিত স্বীকারোক্তি ও ‘প্রেমঘটিত’ হত্যার ব্যাখ্যা এবং নিহতদের মেয়ের এজাহারে বর্ণিত দীর্ঘদিনের জমি ও মামলা সংক্রান্ত বিরোধ। এজাহারে বাবুলের নাম না থাকা, আবার পুলিশের তদন্তে তাঁর সম্পৃক্ততার দাবি- এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি সত্য এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনে আদৌ আরও কেউ জড়িত কি না, তদন্তে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এব্যাপারে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর ও প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, বাদী অভিযোগ দায়ের করেছেন। সেটার তদন্ত করা হবে। তিনি কাকে আসামী করবেন সেটা বাদীর বিষয়। পুলিশ গ্রেপ্তার বাবুল এবং বাদীর এজাহারে উল্লিখিত অভিযোগসমুহ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে তদন্ত করবে।






