আইন ভাঙার প্রবণতা বাড়ছে
প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ৭:২৩:৫১ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট: অভিযোগ উঠলে মামলা, তদন্ত ও বিচারের অপেক্ষা না করে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষোভ-প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এ প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে সরকারের কঠোর হুশিয়ারির মধ্যেও কমছে না দলবদ্ধ শক্তি প্রয়োগের ঘটনা। এতে প্রশ্নের মুখে পড়ছে আইনের শাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। জনমনে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ।
দেখা গেছে, কোনো ঘটনায় অপরাধের অভিযোগকে কেন্দ্র করে অভিযুক্তের বাড়িতে হামলা, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিরোধে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া, জমি দখল করতে গিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট কিংবা প্রশাসনিক অভিযানের বিরোধিতা করতে গিয়ে প্রতিবাদের নামে সরকারি সম্পদ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। অভিযোগ, বিরোধ বা ক্ষোভের নিষ্পত্তিতে আইনি প্রক্রিয়ার বদলে দলবদ্ধ শক্তি প্রয়োগের প্রবণতাও তৈরি হয়েছে। অপরাধের অভিযোগ উঠলে পুলিশ বা আদালতের কাছে যাওয়ার বদলে ঘটনাস্থলেই ‘বিচার’ করে দেওয়ার প্রবণতাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েকটি কারণে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। কারণগুলো হলোÑ আইন ও বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থার ঘাটতি, অপরাধ করে পার পাওয়ার ধারণা, পুলিশের সক্ষমতা ও জনআস্থার সংকট, রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণ, সামাজিক সহনশীলতা কমে যাওয়া ও তাৎক্ষণিক শাস্তির সংস্কৃতি, নিরাপত্তাহীনতা ও অপরাধ নিয়ে ক্ষোভ এবং আগের ঘটনার দৃষ্টান্ত ও দায়মুক্তির ধারণা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভালো লক্ষণ নয়। এতে নিরপরাধ মানুষ আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে সমাজে একটি বিপজ্জনক ধারণা তৈরি হতে পারেÑ আইন ভাঙলেও দলবদ্ধ হলে পার পাওয়া যায়। এতে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর হাতে বলপ্রয়োগের সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি বলেন, দলবদ্ধ সহিংসতা বা মব, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দ্রুত মামলা ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় আমলে না নিয়ে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। এ ছাড়া পুলিশের দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখানো বা দৃশ্যমান উপস্থিতির সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, কেউ অন্যায় বা অপরাধ করলে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ওই ব্যক্তির বিচারের বিধান রয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে। সে অনুযায়ী মাঠপুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করার জন্যও মাঠপুলিশকে বলা হয়েছে। যেই আইন ভাঙবে তার বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবেÑ এ ব্যাপারে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে।
মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন-এমএসএফের প্রতিবেদন বলছে, সেপ্টেম্বর মাসে ‘মব’ বা দলবদ্ধ সহিংসতার অন্তত ৬৫টি ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং ৭৪ জন আহত হয়েছেন। আগস্ট মাসের তুলনায় নিহতের সংখ্যা কমলেও এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগজনক বলে মনে করছে সংগঠনটি। এমএসএফ বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে দেশে মব সহিংসতায় অন্তত ২৩৩ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে আগস্টে সর্বোচ্চ ৩৫ জন, জুনে ৩৩, মে মাসে ৩২ এবং জুলাইয়ে ৩১ জন নিহত হন। সংগঠনটির তথ্য বলছে, মব বা দলবদ্ধ সহিংসতায় জানুয়ারিতে ২১, ফেব্রুয়ারিতে ১৮, মার্চে ১৯ এবং এপ্রিলে ২১ জন নিহত হন।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ২৭৫টি মামলা হয়। এরপর বিএনপি সরকারের সময় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই এই ছয় মাসে মামলা হয় ৩১৭টি। আইন না মানার প্রবণতা থেকেই আইন প্রয়োগে পুলিশকে বাধা দিতেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা।




