পুরনো ব্যবস্থাপত্রে বাংলাদেশ আর চলবে না : জামায়াত আমীর
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ জুলাই ২০২৫, ১০:১৪:৩৭ অপরাহ্ন

জালালাবাদ রিপোর্ট : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, যারা পচা ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশকে আবার ফেরত নিতে চান। তাদেরকে আমরা বলি, জুলাই যুদ্ধ করে যারা জীবন দিয়েছে আগে তাদের জীবনটা ফেরত এনে দেন। যদি শক্তি থাকে ফেরত এনে দেন। আপনারা পারবেন না।শনিবার (১৯ জুলাই) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দলটির জাতীয় সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
জামায়াত আমীর বলেন, ‘স্বৈরাচারের কঠিন অন্ধকার যুগের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে যারা তিলে তিলে দুনিয়া থেকে নির্যাতিত হয়ে বিদায় নিয়েছেন, অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিদায় নিয়েছেন, যারা লড়াই করে আহত হয়েছেন, পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। যাদের ত্যাগ ও কোরবানির বিনিময়ে স্বৈরাচার বিদায় নিয়েছে, আমরা তাদের সকলের কাছে গভীরভাবে ঋণী। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অস্তিত্ব যতদিন থাকবে আল্লাহ যেন তাদের ঋণ পরিশোধ করার শক্তিটাও ততদিন আমাদেরকে দান করেন।’
সমাবেশের আসার পথে খুলনার এক উপজেলা আমীর মাওলানা আবু সাঈদ, পাবনার বয়োঃজ্যেষ্ঠ একজন মুরব্বী মুস্তাফিজুর রহমান, সমাবেশে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণকারী শাহ আলমকে মহান আল্লাহ জান্নাত নসিব করুন,’ বলেন তিনি।
জামায়াত আমীর বলেন, ‘এতগুলো মানুষ এমনি এমনি জীবন দেয় নাই। জীবন দিয়েছে জাতির মুক্তির জন্যে। যদি পুরনো সবকিছুই টিকে থাকবে তাহলে কেন তারা জীবন দিয়েছিল? যারা ওই পচা ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশকে আবার ফিরিয়ে নিতে নিতে চান, তাদেরকে আমরা বলি, জুলাই যুদ্ধ করে যারা জীবন দিয়েছেন আগে তাদের জীবনটা ফেরত এনে দেন। যদি শক্তি থাকে ফেরত এনে দেন। আপনারা পারবেন না। যেহেতু পারবেন না। কাজেই নতুন ব্যবস্থায় নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে ইনশাআল্লাহ।’
তিনি বলেন, ‘শহীদ আবু সাঈদরা যদি বুক পেতে না দাঁড়াতো, এ জাতির মুক্তির জন্য যদি বুকে গুলি লুফে না নিত; হয়তোবা আজকের এই বাংলাদেশটা আমরা দেখতাম না। ইতোমধ্যে হয়তো আরো অনেক মানুষের জীবন ফ্যাসিবাদীদের হাতে চলে যেত। চব্বিশে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধটা যদি না হতো তাহলে আজকে যারা বিভিন্ন ধরনের কথা এবং দাবি-দাওয়া পেশ করছেন তারা তখন কোথায় থাকতেন?’
জামায়াত আমীর বলেন, ‘যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালার এই নেয়ামত পাওয়া, তাদেরকে যেন অবজ্ঞা-অবহেলা না করি। অন্য দলকে যেন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য না করি। অরাজনৈতিক ভাষায় আমরা যেন কথা না বলি। যদি এগুলো আমরা পরিহার করতে না পারি তাহলে বুঝতে হবে ফ্যাসিবাদের রোগ আমাদের মধ্যে নতুন করে বাসা বেঁধেছে। রাজনৈতিক শিষ্টাচার রক্ষা করে জাতীয় জাতীয় ঐক্যের বীজতলাটা আমরা সবাই মিলে একসাথে তৈরি করবো ইনশাআল্লাহ।’তিনি বলেন, ‘আগামীর বাংলাদেশটা কেমন হবে? আমি বলি আরেকটা লড়াই হবে ইনশাল্লাহ। একটা লড়াই হয়েছে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। আরেকটা লড়াই হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইনশাআল্লাহ। এই দুর্নীতির মূলোৎপাটন করার জন্য যা দরকার, আমরা তারুণ্য এবং যৌবনের শক্তিকে একত্রিত করে সেই লড়াইয়েও যুক্ত হব ইনশাআল্লাহ।’
এ সময় জামায়াতের আমীর অসুস্থ হয়ে মঞ্চে পড়ে যান। একটু সুস্থ হলে তিনি বলেন, ‘সবাইকে নিয়ে আমরা কথা দিচ্ছি বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী যদি আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানী ও জনগণের ভালোবাসা নিয়ে সরকার গঠন করে…। বলে তিনি পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এরপর তিনি বসে বক্তব্য প্রদানকালে বলেন, ‘আল্লাহ যত সময় হায়াত দিয়েছেন, তত সময় মানুষের জন্য লড়াই করবো ইনশাআল্লাহ। এ লড়াই বন্ধ হবে না। বাংলার মানুষের মুক্তি অর্জন হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। জামায়াতে ইসলামী যদি আল্লাহর ইচ্ছা ও জনগণের ভালোবাসায় বাংলাদেশের মানুষের সেবা করার সুযোগ পায়, তাহলে মালিক হবে না সেবক হবে, ইনশাআল্লাহ।’
তিনি বলেন, ‘আজীবন সকলের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেছি, জেল-জুলুমের পরোয়া করি নাই। আমার আফসোস ২৪ সালে জাতিকে মুক্তি দিতে গিয়ে যারা জীবন দিয়ে শহীদ হলো, আমি তাদের একজন হতে পারলাম না। আপনাদের কাছে দোয়া চাই, ইনসাফের ভিত্তিতে একটি দেশ গড়ে তোলার জন্যে আগামীতে যে লড়াই হবে। আমার আল্লাহ যেন সেই লড়াইয়ে আমাকে একজন শহীদ হিসেবে কবুল করেন।’
তিনি বলেন, আমাদের প্রিয় শহীদ নেতৃবৃন্দ, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু করে, শাপলা গণহত্যা, সারাদেশের গণহত্যা, ২৪-এর গণহত্যা যারা করেছে তাদের সকলের বিচার বাংলাদেশের মাটিতে নিশ্চিত করতে হবে। এদের বিচারের দৃশ্যমান প্রক্রিয়া শুরু না করা পর্যন্ত পুরনো ব্যবস্থাপত্রে বাংলাদেশ আর চলবে না।’
জামায়াত আমীরের প্রতিশ্রুতি :
জামায়াত আমির প্রতিশ্রুতি দেন যে, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যদি আগামীতে সরকার গঠন করে তাহলে কোনো এমপি ও মন্ত্রী আগামীতে সরকারি প্লট গ্রহণ করবে না। কোনো এমপি বা মন্ত্রী ট্যাক্সবিহীন কোনো গাড়ি চড়বে না। তারা নিজেদের হাতে কোনো টাকা চালাচালি করবে না।’
‘কোনো এমপি বা মন্ত্রী যদি তার নির্দিষ্ট কোনো কাজের জন্য বরাদ্দ পেয়ে থাকেন কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে দেশের ১৮ কোটি মানুষের কাছে তারা তার প্রতিবেদন তুলে ধরতে বাধ্য হবেন। চাঁদা আমরা নিব না, দুর্নীতি আমরা করবো না। চাঁদা আমরা নিতে দেব না, দুর্নীতি আমরা সহ্য করবো না।’
জামায়াতের ৭ দফার প্রতি সমর্থন ইসলামী আন্দোলনের সমর্থন – মহাসচিব :
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত ৭ দফা দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।শনিবার জামায়াতের জাতীয় সমাবেশে উপস্থিত হয়ে এ ঘোষণা দেন ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমদ।তিনি বলেন, ‘জামায়াতের দাওয়াত আমরা গ্রহণ করেছি। আমাদের আমীর সফরে থাকার কারণে তিনি উপস্থিত হতে পারেননি। আমি এসেছি। আমরা ভবিষ্যতে একটি নতুন বাংলাদেশ গঠনের কাজ করে যাচ্ছি।সমাবেশে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী উপস্থিত হন। ঢাকামুখী এ ঢল ছড়িয়ে পড়ে পুরো উদ্যানে। জামায়াতের পক্ষ থেকে ডানপন্থি ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলসমূহকে বিশেষ আমন্ত্রণ জানানো হয়।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ছাড়াও খেলাফত মজলিস, গণঅধিকার পরিষদ, এনসিপিসহ একাধিক দল এতে প্রতিনিধিত্ব করে।
নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চায় খেলাফত মজলিস :
আগামী জাতীয় নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ তথা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চেয়েছেন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাদের।শনিবার জামায়াতের জাতীয় সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।
আব্দুল কাদের বলেন, আমরা চাই আগামী নির্বাচনে সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ব্যবস্থা করা হবে। জোর করে বা জবরদস্তি করে কেউ যেন নির্বাচন বানচাল না করতে পারে, যেনতেনভাবে নির্বাচন না করতে পারে। এটা না হলে এই জাতির মুক্তি আসবে না। প্রধান উপদেষ্টা কথা দিয়েছেন তিনি সেরা নির্বাচন উপহার দেবেন, সেটা যেন হয়। ফ্যাসিবাদ ও তাদের দোসরদের বিচার দৃশ্যমান দেখতে চান জানিয়ে তিনি বলেন, আজকের সমাবেশ প্রমাণ করেছে, এ দেশে ইসলামপন্থিরা বেঁচে আছে, বেঁচে থাকতে চায়। ২৪’ এর পর যে আশা ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে তার বাস্তবায়ন চায়। আমরা চাই, এ দেশ নতুন করে বাঁচুক, শান্তিতে ও ইনসাফ সহকারে বাঁচুক, এর কোনো বিকল্প নেই। ‘আমরা চাই, এ দেশে ফ্যাসিবাদ ও তাদের দোসরদের বিচার দৃশ্যমান হোক’, বলেন আব্দুল কাদের।
বিপদ কেটে গেলে মানুষ অহংকারী হয় তাই দেখতে পাচ্ছি -ভিপি নুর :
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর বলেছেন,, আল্লাহতালা মানুষকে ধন সম্পদ এবং ক্ষমতা দিয়ে পরীক্ষা করেন। গত ১৬ বছরে আমাদের কাছ থেকে আল্লাহতালা আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছেন। আমরা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। জুলাইয়ে আল্লাহ বাংলাদেশের মানুষের উপরে চেপে থাকা দৈত্য দানবের মত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করেছি। কিন্তু হাদিসে আছে, বিপদ কেটে গেলে মানুষ উৎফুল্য হয়, অহংকারী হয়। তাই আমরা দেখতে পাচ্ছি। এই গণঅভ্যুত্থানে আমাদের অংশীজনেরা মজলুমরা আজকে উৎফুল হয়ে জালিম হয়ে উঠছে। শনিবার জামায়াতের জাতীয় সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, মনে করিয়ে দিতে চাই, আমরা যদি সীমালঙ্ঘন করি শেখ হাসিনার মত আল্লাহ পাকও কিন্তু আমাদেরকে ছাড় দিবেন না। আজকের যেই ছাত্র জনতার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রক্ত এবং প্রাণের বিনিময়ে আমরা ঐতিহাসিক পরিবর্তন পেয়েছি এই পরিবর্তনকে টেকসই করার জন্য শাসনতান্ত্রিক এবং সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তনের আওয়াজ উঠেছে। শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন না করে নির্বাচনের দিকে হাঁটবেন না। নির্বাচনের আগে সব রাজনৈতিক দল যেন নির্বিঘেœ প্রচার করতে পারে নিরপেক্ষ একটি প্রশাসনিক এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা থাকে সেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। জুলাই ঘোষণাপত্র এবং যে জুলাই সনদ জুলাই মাসে বাস্তবায়ন করার কথা, সরকার যদি দিতে ব্যর্থ হয়; জুলাই অংশীদাররা ঐক্যমতের ভিত্তিতে আবার আন্দোলন করার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন নুর।
শুধু ক্ষমতার পালাবদলের জন্য ২৪ এর অভ্যুত্থান হয় নাই – আখতার হোসেন :
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেছেন, শুধু ক্ষমতার পালাবদলের জন্য ২৪ এর অভ্যুত্থান হয় নাই। ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করে নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য ২৪ এর অভ্যুত্থানে আমরা অংশ নিয়েছিলাম। বাংলাদেশে শুধু নির্বাচন দিয়ে এদেশের গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব নয়। ১৪, ১৮, ২৪ এ নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হয়নি। এদেশের গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দিতে হলে নির্বাচনের পূর্বেই মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নে উচ্চকক্ষে ভোটের অনুপাতে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন আয়োজন রাজধানীতে জাতীয় সমাবেশ। পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে উচ্চকক্ষ চাই না, এই বক্তব্য যারা দেয় তারা জাতির সাথে প্রতারণা করছে।
শনিবার জামায়াতের জাতীয় সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব বলেন।তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ এবং তার দোসররা গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত করেছে। সেটাকে যদি বিচারের আওতায় না নিয়ে আসা হয়, ২৪ এর সাথে বেইমানি করা হবে। অতএব বাংলাদেশে ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো ফ্যাসিবাদ এবং স্বৈরাচার জন্ম নিতে না পারে ঠিক এই কারণে আওয়ামী লীগ এবং তার দোসরদেরকে অবিলম্বে বিচারের আওতায় দাঁড় করাতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের অফিস হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার বাইরে রেখে অন্তর্র্বতীকালীন সরকার আর এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। জুলাই সনদ এবং জুলাই ঘোষণাপত্র নিছক কোনো ইতিহাসের দলিল না হয়ে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির সনদ সেখানে লিপিবদ্ধ থাকতে হবে। মৌলিক সংস্কারের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন করে, সেটাকে সুরক্ষা দিয়ে বাস্তবায়নের জন্য লিগ্যাল অর্ডারের মধ্য দিয়ে করে বাস্তবায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের মানুষ নতুন দিনের প্রত্যাশা করে। নতুন দিনে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদ বিরোধী সকল পক্ষ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সার্বভৌমত্বকে রক্ষায় একযোগে কাজ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এনসিপি সদস্য সচিব আখতার হোসেন।
জামায়াতে ইসলামী একটি আদর্শিক প্ল্যাটফর্ম – গোবিন্দ চন্দ্র প্রমানিক :
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব ডক্টর গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক আওয়ামী লীগ ও বিএনপি – উভয় প্রধান রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই হিন্দু সম্প্রদায়কে বঞ্চনা ও প্রতারণার অভিযোগ এনেছেন। তিনি জামায়াতে ইসলামীকে একটি আদর্শিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উল্লেখ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা ও পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের দাবি জানান। শনিবার জামায়াতের জাতীয় সমাবেশে এ দাবি জানান।
ডক্টর প্রামাণিক তার বক্তব্যে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব অস্বীকার করার অভিযোগ তুলে বলেন, আমরা দীর্ঘদিন যাবৎ আওয়ামী লীগের কাছে রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে ছিলাম। ১৯৫৪ সালে যেদিন আওয়ামী লীগ গঠন হয়েছে সেইদিনই তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব অস্বীকার করে। প্রতিনিধিত্বকে ধ্বংস করার জন্য উদ্দেশ্য নিয়েই আওয়ামী লীগ গঠন হয়েছে, হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি তারা প্রতারণা করেছে।
একইভাবে তিনি বিএনপির বিরুদ্ধেও হিন্দু সম্প্রদায়কে অবহেলা ও ক্ষতির অভিযোগ করেন বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ফেনীর একটি উপজেলায় ২০০ জন হিন্দু নারীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এবং সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামে একজন আদিবাসী কিশোরীকে চারজন বিএনপি কর্মীর দ্বারা ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এদের কোনো বিচার হয়নি। তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, যেমন চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, ও টেন্ডারবাজির জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ডক্টর প্রামাণিক জামায়াতে ইসলামীকে শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, বরং একটি ‘ইউনিভার্সাল ইউনিভার্সিটি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আপনারা এখানে আসেন শিক্ষা লাভ করেন। নীতি শিক্ষা দেন, আদর্শ শিক্ষা নেন এবং কিভাবে ধর্ম অনুযায়ী দেশ পরিচালনা নিজের জীবন পরিচালনা করা যায় এবং দেশ পরিচালনা করা যায় আপনারা সেই শিক্ষা লাভ করেন।’
তিনি সমাবেশে উপস্থিত জনতাকে আশ্বস্ত করেন যে জামায়াতে ইসলামীর সাথে অংশগ্রহণের কারণে তাদের জীবন ধন্য হবে, এমনকি যদি রাজনৈতিক ক্ষমতা নাও থাকে। ভবিষ্যৎ নির্বাচনের বিষয়ে ডক্টর প্রামাণিক ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধের উপর জোর দিয়ে বলেন, আমরা বলতে চাই একবার ফ্যাসিবাদ বিদায় হয়েছে, আবার কোনোদিন এই ফ্যাসিবাদ চাই না। এখানে জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবারের সদস্যরা যদি আবারো এই দেশে পিআর সিস্টেম ছাড়া যদি নির্বাচন হয় আবার ফ্যাসিবাদ আসবে আবার আপনাদেরকে এই ফ্যাসিবাদ সরানোর জন্য জীবন দিতে হবে রক্ত দিতে হবে। তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য এক দফা পৃথক নির্বাচন এবং পিআর পদ্ধতি ছাড়া কোনো নির্বাচন না করার দাবি জানান।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সুশীলের ভূমিকায় দেখতে চান না সারজিস :
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সুশীল সরকারের ভূমিকায় নয়, বরং অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার হিসেবে দেখতে চান বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। শনিবার জামায়াতের জাতীয় সমাবেশে তিনি এ মন্তব্য করেন।
এনসিপির এ নেতা বলেন, অভ্যুত্থানের এক জুলাই পেরিয়ে আমরা আরেক জুলাইয়ে এসেছি। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে মুজিববাদীদের ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়নি। গোপালগঞ্জে এখনো মুজিববাদীরা আস্তানা গেড়ে রয়েছে। শুধু আইনিভাবে এই মুজিববাদের মোকাবিলা করা যাবে না। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে এই মুজিববাদের কোমর ভেঙে দিতে হবে। আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু এই মুজিববাদের প্রশ্নে অভ্যুত্থানের সব সৈনিককে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
সারজিস বলেন, বাংলাদেশে আবারো মুজিববাদী-ভারতপন্থি শক্তি সক্রিয় হচ্ছে। এ দেশে আর কোনো পন্থির জায়গা হবে না। দেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের কোনো জায়গা হবে না।
তিনি আরও বলেন, হাজারের অধিক ছাত্রজনতা জীবন দিয়েছে। গত ৫ আগস্ট যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, সে স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আমরা সুশীল সরকারের ভূমিকা চাই না। আমরা তাদের অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকারের ভূমিকায় দেখতে চাই। বাংলাদেশে খুনি হাসিনার বিচার হতেই হবে। দেশের বিচার বিভাগকে কোনো দলের বিচার বিভাগ হিসেবে দেখতে চাই না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ক্ষমতার তোষামোদ বাহিনী হিসেবে দেখতে চাই না। আমাদের নতুন সংবিধান ও গণপরিষদ নির্বাচন লাগবে। নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক বলেন, ফ্যাসিস্টবিরোধী আমাদের যে শক্তি, এদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ থাকতে গিয়ে অন্ধভাবে কারো দালালি করা যাবে না। রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকবে কিন্তু তার সৌন্দর্য নষ্ট করা যাবে না। তবেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।
আমার ছেলে হত্যার বিচার এখনো পাইনি – আবরার ফাহাদের বাবা :
ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হাতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও পূর্ণ বিচার এখনো হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তার বাবা বরকত উল্লাহ। শনিবার জামায়াতের জাতীয় সমাবেশে তিনি এ অভিযোগ করেন।
বরকত উল্লাহ বলেন, ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে আমার ছেলে আবরার ফাহাদকে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে রাতভর নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। তার একমাত্র অপরাধ ছিল- সে দেশের পক্ষে কথা বলেছিল। ভারতীয় আধিপত্য, আগ্রাসন এবং তৎকালীন সরকারের সঙ্গে ভারতের কিছু অবৈধ চুক্তির বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিল। তিনি বলেন, আবরার লিখেছিল- ভারত গোপন চুক্তিতে ফেনী নদীর পানি নিচ্ছে, আমরা ইলিশ পাচ্ছি না, অথচ আমাদের ইলিশ কম দামে ভারতে পাঠানো হচ্ছে। এ কথা বলার অপরাধেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার সেসময় একতরফা নীতিতে বৈষম্য তৈরি করেছিল।
বরকত উল্লাহ বলেন, আজ ছয় বছর পেরিয়ে গেছে, আমি এখনো ছেলের হত্যার বিচার পাইনি। আমি ন্যায়বিচার চাই- এটাই একজন বাবার আহ্বান। আবরারের বাবা আরও বলেন, এখনো দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে র্যাগিং হয়। এখন তো ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার এসেছে, তাহলে কেন এসব বন্ধ হবে না?
তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই-আগস্টে যেসব তরুণ শহীদ হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের তালিকা করেছে, এটা ভালো। কিন্তু ছাত্রলীগের হাতে র্যাগিংয়ের শিকার হয়ে যারা মারা গেছে, তাদের কোনো তালিকা নেই। আমি অনুরোধ করব- এ ধরনের মৃত্যুরও একটি রাষ্ট্রীয় তালিকা তৈরি হোক।
বরকত উল্লাহর কথায় উঠে আসে দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, আমার ছেলে নিজের দেশকে ভালোবেসেছিল, সেটাই ছিল তার অপরাধ। আমি বারবার বিচার চাইছি, এখনো সেই প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ। আমি দেশের বিবেকবান মানুষদের কাছে অনুরোধ জানাই- আবরারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করুন।
বিচার না হলে আমাদের ভাইদের ফিরিয়ে দিন – শহীদ আবু সাঈদের ভাই :
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় সমাবেশে এক আবেগঘন বক্তব্য রাখেন শহীদ আবু সাঈদের ভাই রমজান আলী। তার বক্তব্যে তিনি ১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত ভাইয়ের শাহাদাতের বিচার দাবি করে বলেন, বিচার না পেলে আমার ভাইদের ফিরিয়ে দিন। শনিবার জামায়াতের জাতীয় সমাবেশে তিনি এ বলেন।
রমজান আলী বলেন, আমি আজকে এই সমাবেশে উপস্থিত হয়েছি শুধু একটি দাবি নিয়ে। সেটা ১৬ জুলাই যখন শহীদ আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে যে জীবন দিয়েছিল, যেই কারণে সেই কারণের বাস্তবতা কি আমরা আজকে পেয়েছি নাকি? যদি সেই শহীদ ভাইয়ের বিচার আমরা না পাই, তাহলে আমাদের এই শহীদ ভাইদেরকে আমরা ফেরত চাই।
শহীদ ভাইদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত অধিকার ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়ে রমজান আলী বলেন, আজকে দীর্ঘ এক বছর পেরিয়ে গেল কিন্তু আজ পর্যন্ত আমরা এই বাংলার মাটিতে একটি শহীদ ভাইয়ের বিচার পাইনি। আমাদের শহীদ ভাইদের বিচারের দরকার আছে কি নাই? আমি মনে করি নির্বাচনের আগে আমাদের এই শহীদ ভাইদের বিচার করতে হবে। এর আগে বাংলাদেশে আর কোনো নির্বাচনের দরকার নেই। ফ্যাসিবাদ সরকারের দোসররা জায়গায় জায়গায় ঘাঁটি গেড়ে আছে, তারা পায়তারা চালাচ্ছে।
তিনি বলেন, যদি শহীদ ভাইদের বিচার হয় এবং ফ্যাসিবাদী শক্তি বিচারের আওতায় আসে, তাহলেই বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে এবং মানুষের ভোটের অধিকার ফিরে আসবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এড. এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এড. মতিউর রহমান আকন্দ, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিমের যৌথ পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মজলুম জননেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম, নায়েবে আমীর সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, নায়েবে আমীর সাবেক এমপি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোঃ তাহের, সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর মাওলানা মহিউদ্দিন রব্বানী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও সাবেক এমপি ড. হামিদুর রহমান আযাদ, নেজামে ইসলামের মহাসচিব মুসা বিন ইযহার, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোঃ সেলিম উদ্দিন প্রমুখ, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল নূরুল ইসলাম সাদ্দাম, শহীদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ, কয়েকজন পঙ্গু জুলাই যোদ্ধা।
সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন- নায়েবে আমীর সাবেক এমপি মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মাওলানা আবদুল হালিম, এড. মোয়াযযম হোসাইন হেলাল, মাওলানা মুহাম্মাদ শাহজাহান ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, আবদুর রব, অধ্যক্ষ মোঃ শাহাবুদ্দিন, অধ্যক্ষ মোঃ ইজ্জত উল্লাহ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন প্রমুখ।






