আলোচনায় ‘সীমান্তে কাঁটাতার’
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ মে ২০২৬, ৩:০২:১৭ অপরাহ্ন
‘বিভেদের দেয়াল’ তৈরীর চেষ্টা বলছে দলগুলো
জালালাবাদ রিপোর্ট : বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের আন্তর্জাতিক সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার। এই বেড়া নির্মাণের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বাংলাদেশের সরকার, প্রধান বিরোধী দল জামায়াতসহ রাজনৈতিক দলগুলোও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। দলগুলো বলছে, কাঁটাতারের মাধ্যমে ‘বিভেদের দেওয়াল’ তৈরী করছে ভারত।
এই কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফকে ৪৫ দিনের মধ্যে জমি বুঝিয়ে দেওয়া হবে বলে বৈঠক শেষে জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্যমতে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের দুই হাজার ২১৬ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে।
মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার গত ১৫ বছর রাজ্য ক্ষমতায় ছিল, তখন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই তুলে আসছিলেন। নির্বাচনে তৃণমূলকে হারিয়ে সরকার গঠনের পর প্রথমেই সীমান্তে বেড়া দেওয়া নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিলেন তারা।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়।
সেই সময়ে বাংলাদেশের একাধিক সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সাথে বাংলাদেশের বিজিবি কিংবা ওই সব এলাকার বাসিন্দাদের সাথে বিভিন্ন ধরনের উত্তেজনাও দেখা যায়। আবার ভারতের পাশ থেকে বাংলাদেশে পুশইনের অনেক ঘটনাও সংবাদ মাধ্যমে এসেছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া সংক্রান্ত তৎপরতা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে ক্ষমতাসীন বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, এর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এসব দলের নেতাদের কেউ কেউ।
কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে ‘ভয় দেখানো যাবে না’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা।
যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়া পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিজস্ব বিষয়। তবে সীমান্তে অনুপ্রবেশ রোধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিজিবি সার্বক্ষণিক সতর্ক রয়েছে বলেও জানান তিনি।
কোনো অঙ্গরাজ্য নয়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ আছে বাংলাদেশের, এই মন্তব্যও করেছেন তিনি।
এদিকে, বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলছে, এই বেড়া নির্মাণের মাধ্যমে ‘বিভেদের দেওয়াল’ তৈরি করছে ভারত, যে কারণে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই উদ্যোগে নজর রাখছে তারা।
বাংলাদেশ ভারতের সীমান্ত কত?
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য চার হাজার ৯৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ তাদের তথ্যে বলা আছে, এই সীমান্তের ৮৬৪ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণ বাকি রয়েছে।
এর মধ্যে আবার ১৭৪ কিলোমিটারেরও বেশি অংশ রয়েছে যেখানে জমি অধিগ্রহণ ও ভূমিধস সমস্যা এবং কিছু এলাকায় জলাভূমি রয়েছে।
বাংলাদেশের সাথে ভারতের যে চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি সীমানা রয়েছে তার মধ্যে বড় অংশই পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দেশটির লোকসভার শীতকালীন অধিবেশনে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের সাথে ভারতের যে সীমান্ত রয়েছে, তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত রয়েছে দুই হাজার ২১৬ কিলোমিটার, তার মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৬৫৩ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ শেষ করেছে দেশটি। পশ্চিমবঙ্গে ৫৬৩ কিলোমিটার সীমান্ত কাঁটাতার দেওয়া বাকি রয়েছে।
বিএসএফের সাবেক মহাপরিচালক পি কে মিশ্রর মতে, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে গ্রামবাসীদের জমি অধিগ্রহণের চ্যালেঞ্জটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।
পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া ত্রিপুরার সাথে ৮৬৫ কিলোমিটার, মেঘালয় রাজ্যের সাথে ৪৪৩ কিলোমিটার, মিজোরামের সাথে ৩১৮ কিলোমিটার এবং আসাম রাজ্যের সাথে রয়েছে ২৬৩ কিলোমিটারের সীমানা।
রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়া :
বাংলাদেশে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরে ভারত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল বটে। কিন্তু ভারত সরকার সে সময় থেকেই বাংলাদেশে নির্বাচনের দিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছিল।
ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করলে কূটনীতিক বিশ্লেষকরা মনে করেছিলেন, দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল সেটি অন্তত লাঘব হবে।
তবে বাংলাদেশে নতুন সরকার আসার পাশাপাশি ভারতের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারেও।
গত শনিবার শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সোমবার প্রথম বৈঠকেই বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকাগুলোতে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তাদের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি আসেনি, তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অবস্থান জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, কাঁটাতার দিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশকে এখন ডর দেখানোর মতো কোন জায়গা নাই। বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতার ভয় পায় না। বাংলাদেশের সরকারও কাঁটা তার ভয় পায় না। তিনি আরো বলেন, সীমান্তে ভারতেরও দেখাতে হবে মানবিক অ্যাপ্রোচ, ডিলিং উইথ সিকিউরিটি। এখানে যদি গুলি মেরে মানুষ হত্যা করা হয় বা তারে ঝুলাইয়া ফেলে রাখবেন, যেগুলো আমরা দেখছি হাসিনার সময়, ওই নমুনায় বর্ডার আর কোনোদিন ইনশাআল্লাহ আসবে না।
প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বলছে, ভারতের এই কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ নতুন না, তবে এটি যদি বাংলাদেশের মর্যাদাহানির কারণ হয় তাহলে সেটি নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেবে তারা।
দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বিবিসিকে বলেছেন, কাঁটাতারের বেড়া যদি তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য দেয় সেই অধিকার তাদের আছে। তবে বেড়া দেওয়ার উদ্দেশ্য যদি হয় আরেকটা রাষ্ট্রের মর্যাদাহানি বা অন্যের ভূমি দখল, তাহলে সেটি হবে বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত, আরেকটি রাষ্ট্রের ওপর হস্তক্ষেপ।
তিনি বলেন, বিরোধী দল এই বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রেখেছে। ভারতের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তায় যদি কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটে, তাহলে বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে নীরব থাকবে না জামায়াতে ইসলামী।
জাতীয় নাগরিক পার্টি মনে করছে, পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকারের সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার সিদ্ধান্তটি যতটা না নিরাপত্তার, তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বিবিসিকে বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোও এটা নিয়ে কথা বলছে। কিন্তু বিজেপি শুরু থেকে এটা নিয়ে তোয়াক্কা করছে না। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে তারা আমাদের এখানে বিভেদের দেওয়াল তুলতেছে।




