বড়লেখা সীমান্ত কী হয়ে উঠছে জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি
প্রকাশিত হয়েছে : ১৬ মে ২০২৬, ৯:৩৪:৪৬ অপরাহ্ন

বড়লেখা প্রতিনিধি: বড়লেখা সীমান্তে মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের রেডএলার্ট জারিকৃত নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য গ্রেফতার ও ভারতীয় এক দম্পতি আটক এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে (৪ ফেব্রুয়ারি) বিজিবির অভিযানে বিপুল পরিমাণ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় প্রশ্ন ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, বড়লেখার দুর্গম সীমান্ত কী হয়ে উঠছে মারাত্মক ঝুঁিকপূর্ণ ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
সীমান্ত মানেই শুধু কাঁটাতারের বেড়া নয়; এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে নানা অজানা গল্প। কখনও পলাতক আসামির গোপন পালানোর চেষ্টা, কখনও পরিচয় বদলে দেশে ফেরার প্রচেষ্টা, আবার কখনও রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জ করা ছায়াময় চলাচল।
একদিকে উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে চাকরিচ্যুত এক সাবেক সেনাসদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অন্যদিকে ভারতীয় পরিচয়পত্রধারী এক দম্পতিকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশকালে আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। মাত্র ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে দুটি ঘটনা ভিন্ন হলেও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো একই ধরণের সীমান্ত ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের দুর্গম বোবারথল ষাটঘরি সীমান্ত এলাকায় প্রায় ১২ ঘণ্টাব্যাপী অভিযান চালিয়ে মো. রাহেদ হোসেন মাহেদ (২৩) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত সেনাসদস্য এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠন ‘মাকতাবাহ আল হিম্মাহ আদদাওয়াতুল ইসলামিয়াহ’-এর সক্রিয় সদস্য বলে দাবি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রাহেদ সিলেট জেলার বিশ্বনাথ উপজেলার দশঘর গ্রামের নূর মিয়া ও মোছা. সাফিয়া খানমের ছেলে।
পুলিশ জানায়, রাহেদ ওই সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সে ঢাকার শাহবাগ থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলার তদন্তে প্রাপ্ত আসামি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতেই বড়লেখা পুলিশ তাকে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটে হস্তান্তর করেছে।
এর ঠিক পরদিন শুক্রবার (১৫ মে) সকালে দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের গান্ধাইল সীমান্ত এলাকা থেকে ভারতীয় পরিচয়পত্রধারী কামরুল আহমেদ (৩২) ও স্ত্রী হুসনা বেগম লস্কর (২৪) নামে এক দম্পতিকে আটক করে বিজিবি। তাদের কাছ থেকে ভারতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। বিজিবির দাবি তারা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছিল।
কামরুল জানিয়েছে একসময় সে বাংলাদেশের নাগরিক ছিল। ২০১৪ সালে দালালের মাধ্যমে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে যায়। পরে ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং আসামের হাইলাকান্দির এক নারীকে বিয়ে করে। দীর্ঘদিন পর হঠাৎ কেন তিনি গোপনে বাংলাদেশে ফিরতে চাইলেন এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। এটি কি নিছক আত্মীয়স্বজনের টানে ফেরা? নাকি এর অন্তরালে রয়েছে আরও গভীর কোনো উদ্দেশ্য?
এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ৩ ফেব্রুয়ারি বিজিবি একই সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভারতে প্রস্তুতকৃত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ২৪টি পাওয়ারজেল নাইনটি বিস্ফোরক, ২৩টি ডেটোনেটর, ১৫ মিটার ডিটোনেটর কর্ড এবং ৩টি পাইপ গান উদ্ধার করে। বিশেষজ্ঞদের মতে ৩০০ ফিট মাটির নিচে থেকেও উদ্ধারকৃত যেকোনো একটি ডিটোনেটরের বিষ্ফোরণ ঘটালে মুহূর্তে যেকোন ভবন গুড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এছাড়াও একই সীমান্ত দিয়ে প্র্য়াই নামছে মাদক, অস্ত্র, গরু-মহিষ ও ভারতীয় অবৈধপণ্যের বড় বড় চালান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বড়লেখার দুর্গম সীমান্ত এলাকাজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের মাধ্যমে অবৈধ পারাপার, চোরাচালান এবং নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সীমান্তের বাসিন্দারা জানান, বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালালেও সীমান্তের মুল অপরাধচক্র এখনো গোপনে সক্রিয় রয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত ব্যবহার করে উগ্রবাদী সম্পৃক্ত ব্যক্তি বা বিদেশি পরিচয়ধারীদের গোপন যাতায়াত কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। তাদের মতে, আন্তঃদেশীয় অপরাধী চক্র, দালাল নেটওয়ার্ক এবং উগ্রবাদী যোগাযোগ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকলে ভবিষ্যতে আরও বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বড়লেখা সীমান্তে নজরদারি জোরদার, আধুনিক প্রযুক্তি ও ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং বিজিবি, পুলিশ প্রশাসন ও জাতীয় সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এখন অত্যন্ত জরুরি।
বড়লেখা থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান খান বলেন, বৃহস্পতিবার সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার চাকরিচ্যুত সেনা সদস্য মো. রাহেদ হোসেন মাহেদ উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি বোবারথল সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাকে সিটিটিসি ইউনিটে হস্তান্তর করা হয়। তিনি আরও বলেন, ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকালে বিজিবি দুই ভারতীয় নাগরিককে (স্বামী-স্ত্রী) আটকের পর থানায় সোপর্দ করে। বর্ডারক্রস আইনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে শনিবার আদালতে সোপর্দ করেছে পুলিশ।
বড়লেখা সীমান্তে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ঘটে যাওয়া এই দুটি ঘটনা এবং তিন মাস আগে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিষ্ফোরক ও অস্ত্র উদ্ধার হয়তো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তবে একই এলাকার সীমান্ত ব্যবহার এবং গোপন যাতায়াতের ধরণ সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।





