ফের বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম, বাড়বে জীবনযাত্রার ব্যয়
প্রকাশিত হয়েছে : ০১ জুন ২০২৬, ৮:৫১:২৪ অপরাহ্ন

জালালাবাদ রিপোর্ট : বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে মাত্র দেড় মাসের মাথায় দেশে জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফায় বাড়িয়েছে সরকার| অকটেন, কেরোসিন ও পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে| যা গতকাল সোমবার (১ জুন) থেকে কার্যকর হয়েছে| এর আগে গত রোববার (৩১ মে) মধ্য রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে| প্রজ্ঞাপনে দেশের ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের নতুন বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি জানানো হয়|
যদিও নির্বাচিত হওয়ার পর গত মার্চে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হবে না| সরকারের অন্য মন্ত্রীরাও একই সুরে কথা বলেছিলেন| কিন্তু সেই যাত্রায়ও কথা রাখেনি সরকার| দেড় মাসের মাথায় গত ১৮ এপ্রিল প্রথম দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার| ফলে ক্ষমতা গ্রহণের সাড়ে ৩ মাসের মাথায় দুই দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়াল সরকার|
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে পিষ্ট দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা| এরই মাঝে সরকারের গণবিরোধী এধরনের সিদ্ধান্তে সংকটে ফেলবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবন| তারা বলছেন, তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে আরেক দফা খাদ্যশস্য, শাকসবজি, কাঁচামাল, মৌসুমি ফল, প্রক্রিয়াজাত খাবারসহ সব ধরনের কৃষিপণ্য পরিবহনে ব্যয় বাড়বে| শুধু কৃষিপণ্য নয়, ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাবে আমদানি-রফতানিসহ দেশের শিল্প খাতের পণ্য পরিবহনও আগের চেয়েও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে|
ব্যবসায়ী ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে পরিবহন ভাড়া অ¯^াভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ঘটবে, যা সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়ে দেবে| ফলে একদিকে যেমন কৃষক ও উৎপাদকরা পণ্য বাজারজাতে লোকসানের মুখে পড়বেন, অন্যদিকে আমদানি-রফতানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস পাবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের সরবরাহ শিকল ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে|
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নতুন মূল্য অনুযায়ী, অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ১৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১৩৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়েছে| একই সঙ্গে কেরোসিনের দাম ১৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে| অন্যদিকে ডিজেলের দাম আগের মতোই লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা রাখা হয়েছে|
এর আগে গত ১৮ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছিল| সে সময় ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা, অকটেনের দাম ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা করা হয়| অপরদিকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি (টিইসি) খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে ১ টাকা ২৫ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে| এমনিতেই দীর্ঘ সময় ধরে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ বিরাজ করছে বাংলাদেশে| জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি ডাবল ডিজিটের ঘরে পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা| এতে দেশে দারিদ্র্যতা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা|
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির যাঁতাকলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা পিষ্ট| নিত্যপ্রয়োনীয় জিনিসপত্রের দামের চাপে ধারাবাহিকভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশে উঠেছে| যা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে সরকার| এমন পরিস্থিতিতে আসছে প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে সাড়ে ৬ শতাংশ নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে সরকার| কিন্তু সরকার এমন পরিকল্পনার কথা শোনালেও ঠিক বিপরী পথে হাঁটছে| এতে নাখোশ হচ্ছে জনসাধারণ|
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব বহুমাত্রিক, যা যানবাহন ও কৃষি খাত থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ˆদনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়| তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি বাজারে এর অপ্রতুলতা থাকায় কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ যেমন বাড়বে, তেমনি বিপণন ও বাজারজাত পর্যায়েও ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে ত্বরাšি^ত করবে|
তথ্য বলছে, গত ১৮ এপ্রিল জøালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বাড়ে ৩৫% পর্যন্ত| তখন পরিবহন খরচ বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন পণ্যের দামেও প্রভাব পড়ে| ওই সময় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরই প্রতি কেজি মিনিকেট চালে ৫-৭ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে| একইভাবে ডালের দাম কেজিতে ১০ টাকা এবং ডিমের দাম প্রতি পিসে ২ থেকে আড়াই টাকা পর্যন্ত বেড়েছে| ভোজ্যতেল ও চিনির বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়| তারপরই সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হয়|
এছাড়া ওই সময় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বেনাপোল স্থলবন্দরে ট্রাক ভাড়া গন্তব্যভেদে ৭-৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ে| যশোর-ঢাকা রুটে ট্রাক ভাড়া ২২-২৩ হাজার থেকে ৩০-৩২ হাজার টাকায় উন্নীত হয়| অন্যদিকে যশোর থেকে চট্টগ্রাম রুটে ট্রাক ভাড়া ৩০-৩৫ হাজার থেকে ৪০-৪৫ হাজার টাকায় উন্নীত হয়| বর্তমানে তেলের দাম ভাড়ায় সারাদেশেই আরেক দফায় বাড়বে পণ্য ও যাত্রীবাহী পরিবহনের ভাড়া, এমনটাই বরছেন সংশ্লিষ্টরা|




