আজ বিশ্বকাপ ফাইনাল : আর্জেন্টিনার মুকুট নাকি স্পেনের নবদিগন্ত?
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ জুলাই ২০২৬, ৪:২৩:৫০ অপরাহ্ন
স্পোর্টস রিপোর্টার : চার বছর অপেক্ষার পর বিশ্বকাপ ফাইনাল আসে মাত্র একটি দিনের জন্য, কিন্তু সেই দিনের গল্প বেঁচে থাকে যুগের পর যুগ। কোনো ফাইনাল জন্ম দেয় নতুন কিংবদন্তির, কোনোটি ভেঙে দেয় দীর্ঘদিনের আক্ষেপ, আবার কোনোটি অশ্রু, উল্লাস ও নাটকীয়তার অনন্য মিশেলে ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে যায়। প্রায় এক শতাব্দীর বিশ্বকাপ ইতিহাসে এমনই স্মরণীয় সব লড়াইয়ের মধ্য থেকে সর্বকালের সেরা ফাইনালই যেন হতে যাচ্ছে আজ।
রাত ১টায় আমেরিকার মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা-স্পেনের মধ্যে যে বিশ্বকাপ ফাইনাল হতে চলেছে, সেটা যে শুধুই বিশ্বফুটবলে নিজেদের দেশের মাহাত্ম প্রতিষ্ঠা করা, এরকমটা নয়। বরং এই ফাইনালটা হবে আজ পর্যন্ত ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ইভেন্ট। কারণ, ফাইনালের টিকিট ঘিরে যে পরিমাণ দাম ঘোরাফেরা করছে, তাতে স্টেডিয়ামে বসে ফুটবল দেখা, সাধারণের আয়ত্বের বাইরে চলে গেছে। সেমিফাইনাল পর্যন্ত তাও মেরে কেটে একটা টিকিট ৩ লাখ টাকায় পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু ফাইনালে সবচেয়ে কম দামের টিকিটটাই রিসেলে হাঁকছে ১০ লক্ষ টাকা।
রোমাঞ্চের পসরা সাজিয়ে রাখা এই ফাইনালে কে এগিয়ে? স্পেন না আর্জেন্টিনা? লিওনেল মেসি বনাম লামিন ইয়ামালের লড়াইয়ে বাজিমাত করবেন কে? যদিও মেসির সাথে তুলনা চলেনা ইয়ামালের। মেসি ফুটবলের এক অনন্ত সৌন্দর্যের নাম। যেখানে কখনো এক মুহূর্তের জাদু বদলে দেয় পুরো ইতিহাস। সবুজ মাঠে অনেক প্রতিভার আগমন ঘটেছে। কিন্তু খুব কমজনই পেরেছেন খেলাটির সঙ্গে নিজের নামকে একাকার করে দিতে। লিওনেল মেসি সেই বিরল মহাতারকা। যিনি শুধু গোল করেননি, শুধু শিরোপা জেতাননি। তিনি ফুটবলকে উপহার দিয়েছেন এক নতুন অনুভূতি, এক নতুন মুগ্ধতা।
ফাইনালের আগে কি চাপে থাকবেন মেসিরা? এই প্রশ্ন উঠতেই জবাব দিলেন মেসি। তাঁর মুখে পুরনো দিনের কথা।
মেসি আর্জেন্টিনার হলেও তাঁকে মেসি বানিয়েছে স্পেন। বলা ভাল স্পেনের ক্লাব বার্সেলোনা। সেখানকার লা মাসিয়া অ্যাকাডেমি থেকে তাঁর উত্থান। সেই একই অ্যাকাডেমি থেকে উঠেছেন ইয়ামাল। শুধু তিনি নন, স্পেনের এই দলের বেশ কয়েক জন ফুটবলার সেই অ্যাকাডেমির দান। ফলে তাঁদের খেলার ধরন যে মেসি জানবেন তা স্বাভাবিক।
ফাইনালে নামার আগে সেই কথাই শোনা গেছে মেসির মুখে। তাঁর মতে, স্পেন কেমন খেলবে সেই ধারণা তাঁর রয়েছে। মেসি বলেন, স্পেন খুব ভাল একটা দল। বেশ কয়েক জন ভাল ফুটবলার রয়েছে। কিন্তু ওদের আমার খুব ভাল করে জানা আছে। ওদের ফুটবল দর্শন এত বছর ধরে দেখছি। আমি জানি ওরা কেমন খেলবে।
কাতারের লুসাইল স্টেডিয়াম থেকে নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়াম-লিওনেল মেসির নেতৃত্বে নামা আর্জেন্টিনার দুই দলের পার্থক্য শুধু চার বছরের।
চার বছরে স্কালোনির সেই স্কোয়াড বড় হয়েছে, বয়স ও অভিজ্ঞতা-দুটোতেই। চার বছরে দুই দলের স্কোয়াডে পরিবর্তন এসেছে মোট ৯টি জায়গায়। কিন্তু বেশির ভাগ পরিবর্তনই এসেছে বেঞ্চে, একাদশের আশপাশে বলার মতো পরিবর্তন এসেছে মাত্র দুটি। ফুটবলকে বিদায় জানানো দি মারিয়া আর অফ ফর্মের কারণে বাদ পড়া পাওলো দিবালা। এই দুজনকে বাদ দিলে দুই বিশ্বকাপের একাদশে পার্থক্য খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর।
গত বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালের সঙ্গে যদি এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল ম্যাচের একাদশ মেলানো হয়, সেখানে পরিবর্তন চোখে পড়বে মাত্র একটি-দি মারিয়ার জায়গায় এসেছেন জুলিয়ানো সিমিওনে। চার বছর পর এসেও একই দলের ওপর ভরসা রাখা, সেই দলকে নিয়ে পারফর্ম করা কিন্তু সহজ কথা নয়। স্কালোনি সেটাই করে দেখিয়েছেন। তৈরি হওয়া সমস্যার খুঁজেছেন নতুন সমাধান।
দি মারিয়া চলে যাওয়ার পর আর্জেন্টিনার বাঁ প্রান্ত অনেকটাই অকার্যকর হয়ে আছে। তাগলিয়াফিকোর সঙ্গে দি মারিয়ার যে রসায়ন ছিল গত বিশ্বকাপে, সেটা তো নেই-ই। সঙ্গে বয়সের কারণে তাগলিয়াফিকোর সেই ধারও নেই। ফলে স্কালোনিকে খেলতে হয়েছে মাঝমাঠ ব্যবহার করে, আক্রমণও সাজাতে হয়েছে সেভাবে।
এখানেই দিবালার মতো একজন ক্রিয়েটিভ মিডফিল্ডারকে হয়তো মিস করেছেন তিনি। কারণ, মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের প্রেসিং সয়ে মাঠের ভেতরের ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করার মতো একজন খেলোয়াড়ের বড্ড অভাব ছিল দলে। চার বছরে শাণিত হওয়া এনজো ফার্নান্দেজকে এই জায়গাতে ব্যবহার করেছেন তিনি। ফার্নান্দেজ-দি পল-ম্যাক আলিস্টার ভূমিকা পাল্টালেও নিজেদের কাজ তাঁরা ঠিকঠাক করে যাচ্ছেন।
মাঝমাঠে নতুন সংযোজন হিসেবে দলে এসেছেন জুলিয়ানো সিমিওনে, নিকো গঞ্জালেজ, নিকো পাজের মতো তরুণ তারকা। কিন্তু গত বিশ্বকাপে যেভাবে তরুণদের ওপর সম্পূর্ণ ভরসা রেখেছিলেন, সেভাবে এবার কারও ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না। একেবারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে না গেলে মাঠে নামাচ্ছেন না কাউকেই। ফলে দলের খুঁতগুলো সহজেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচ বাদে প্রতিটি ম্যাচেই গোল হজম করতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। কেপ ভার্দে বাদে প্রতিটি নকআউট পর্বের ম্যাচই জিততে হয়েছে পিছিয়ে পড়ার পর। অভিজ্ঞতা আর চাপ সামলানোর অসাধারণ ক্ষমতার ওপর ভর করেই ফাইনাল পর্যন্ত এসেছে স্কালোনির দল।
ওদিকে, স্পেন এবার নজর কেড়েছে দাপুটে ফুটবল আর শৃঙ্খলাবদ্ধ পারফরম্যান্সে। শুরুতে কিছুটা হোঁচট খেলেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে স্পেন। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে বলের দখল, পরিকল্পিত আক্রমণ এবং দৃঢ় রক্ষণে নিজেদের অন্যতম সেরা দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা।
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। তরুণ ও অভিজ্ঞ ফুটবলারের সমন্বয়ে গড়া দলটি সেই প্রত্যাশার প্রতিফলনও দেখিয়েছে মাঠে। মাঝমাঠে রদ্রির নেতৃত্ব, দুই উইংয়ে লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের গতি এবং রক্ষণভাগের সংগঠিত পারফরম্যান্স স্পেনকে করেছে আরও পরিণত।
এখন দেখার পালা আর্জেন্টিনার শৈল্পিক ফুটবল না স্পেনের শৃঙ্খলাবদ্ধ পারফরম্যান্সের জয় হয়। আর এটি দেখতে অপেক্ষা করতে হবে আজ রাত ১টা পর্যন্ত।






