চাহিদার চেয়ে প্রত্যাশা ঘাটতি, পোশাক শিল্পে ভাটা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭:১৯:১০ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট: বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শিল্প পোশাক শিল্প। বিশে^র নামীদামী কোম্পানীগুলো বাংলাদেশ থেকে বিশ্বমানের পোশাক তৈরি করে নিয়ে থাকে। দুনিয়াজুড়ে বিখ্যাত সব সুপারশপে স্থান পায় মেইড ইন বাংলাদেশ স্টিকারের পোশাক। কিন্তু ইদানীয় সেই চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছে না বাংলাদেশ। বায়ারদের প্রত্যাশার তুলনায় প্রাপ্তি মিলাতে পারছেনা তারা। ফলে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় এই শিল্পে লেগেছে ভাটার টান।
বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু সেই বাড়তি বাজারের সুবিধা নিতে পারছে না বাংলাদেশ, বরং সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও পণ্যের বৈচিত্র্যের ঘাটতির সুযোগে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ডার চলে যাচ্ছে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোয়। ফলে বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্য সম্প্রসারণ হলেও ক্রমেই কমছে বাংলাদেশের বাজার অংশ। বড় বাজারগুলোয়ও রপ্তানিতে দেখা দিয়েছে চাপ। শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা দীর্ঘায়িত হলে শুধু নতুন অর্ডার নয়, দীর্ঘদিনের ক্রেতা ও বাজারও হারাতে পারে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্য ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়ে ৫৭৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ। একই সময়ে বৈশ্বিক পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অংশ ২০২৪ সালের ৭ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশে নেমে এসেছে। বিপরীতে ভিয়েতনামের বাজার অংশ ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার অংশ ১ দশমিক ৮০ শতাংশ থেকে ২ শতাংশের ওপরে উঠেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। শিল্প খাতে উৎপাদন কমে গেলে রপ্তানি আয় হ্রাস পায়, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং সরকারের রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে গেলে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা আবাসিক মিশনের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, শিল্প-কারখানা বন্ধ থাকলে অথবা উৎপাদন কম হলে এর প্রভাব পড়ে রপ্তানিতে। ক্রেতাদের চাহিদা মতো সরবরাহ করতে না পারলে ক্রেতা ছুটে যাবে এটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, ঘটনাচক্রে একবার দুইবার সমস্যা হলে ক্রেতারা সম্পর্কের জন্য মেনে নিবে। কিন্তু এই সমস্যা লাগাতার চলতে থাকেলে ক্রেতারা অন্যত্র চলে যাবে এটাই বাস্তব। তাদেরকে ধরে রাখা যাবে না। যেখানে তারা সুবিধা পাবে, সেখানেই চলে যাবে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সুবিধা নিশ্চিত করতে পারায় তারা দ্রুত উৎপাদন ও সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে সক্ষম হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের শিল্প খাতে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট বিদেশি ক্রেতাদের বিকল্প বাজার খুঁজতে উৎসাহিত করতে পারে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে শুধু বর্তমান অর্ডারই নয়, ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশও হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে একটি অর্ডার অন্য দেশে চলে গেলে তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং কর্মসংস্থান উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আবার সব কারখানায় উৎপাদন কমেছে। এর ফলে অনেক অর্ডার বাতিল হবে, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমনকি বেশ কিছু অর্ডার ইতোমধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় চলে গেছে বলে তাকে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের বড় সমস্যা হচ্ছে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদহার, শ্রম ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যয় এবং বিনিয়োগের ধীরগতি শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে।
বিশেষ করে জ্বালানি সংকট পোশাক খাতের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমইএ) জানিয়েছে, অপর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে কিছু কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন শুধু কম দাম চান না। তারা দ্রুত ডেলিভারি, মানসম্মত পণ্য, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রমমান, প্রযুক্তি এবং পণ্যের বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ম্যান-মেড ফাইবার (এমএমএফ), স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল পোশাকসহ উচ্চমূল্যের পণ্যে বাংলাদেশ এখনও ভিয়েতনামসহ কয়েকটি প্রতিযোগী দেশের তুলনায় পিছিয়ে।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, পোশাক খাতকে শুধু কম মজুরির ওপর নির্ভরশীল না রেখে প্রযুক্তিনির্ভর ও উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে যেতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোও প্রয়োজন।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা এখনও আছে। কিন্তু সেই চাহিদার অর্ডার পেতে হলে আগের তুলনায় বেশি প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে; অন্যদিকে ভারতও ইউরোপসহ বিভিন্ন বাজারে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু রপ্তানি বাড়ানো নয়, বাজারের অংশ ধরে রাখা। উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, পণ্যের বৈচিত্র্েযর ঘাটতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দ্রুত সমাধান করা না গেলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আরও বেশি অর্ডার প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে চলে যেতে পারে।






