ঋণ নেওয়ার খরচ কমেছে, তবুও ঋণ বিতরণে ভাটা
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬:১২:৩৪ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশে ঋণের টাকা আগের চেয়ে সস্তা হচ্ছে, অর্থাৎ সুদের হার নিম্নমুখী। তবে ঋণের খরচ কমে আসার এই প্রবণতা কোনো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বার্তা দিচ্ছে না, বরং এটি অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া এক গভীর স্থবিরতারই প্রতিফলন।
ব্যাংকগুলোতে অলস বা অতিরিক্ত তারল্য জমা হওয়ার পাশাপাশি ঋণের চাহিদা তলানিতে নামায়—আমানত ও ঋণের সুদের হার ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকও নীতি সুদহার (পলিসি রেট) কমিয়ে সহজ মুদ্রানীতির দিকে হেঁটেছে, যা মানি মার্কেটের সুদের হারের ওপর আরও নিম্নমুখী চাপ তৈরি করেছে।
আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো এমন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সম্প্রতি তাদের আমানত ও ঋণের সুদের হার ১ থেকে ২ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত কমিয়েছে। আর এমন সময়ে তা হয়েছে, যখন গত জুনে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে, যা গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংকে আমানতের গড় সুদের হার ৭ থেকে ৮ শতাংশ, এবং ঋণের সুদের হার ১০ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে ঋণের চাহিদা প্রায় না থাকায়—ব্যাংকগুলো সরকারি সিকিউরিটিজে (ট্রেজারি বিল ও বন্ড) বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ফলে এসব বিল ও বন্ডের সুদ বা রিটার্নও কমে একক অঙ্কে নেমে এসেছে।
২০২৬ সালের জুন নাগাদ ব্যাংকিং খাতে মোট অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ বার্ষিক ভিত্তিতে ৩৯.৪০ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও একই ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা যাচ্ছে। পর্যাপ্ত ডলারের প্রবাহ থাকলেও আমদানির চাহিদা কম থাকায় টাকার মান বেড়ে যাওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে। দেশীয় মুদ্রা অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে যাতে রপ্তানিকারক ও প্রবাসী আয় প্রেরণকারীরা ক্ষতির মুখে না পড়েন, সেজন্য গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে আবারও ডলার কেনা শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই দিন ব্যাংকগুলো থেকে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ৫০ মিলিয়ন ডলার কেনে বাংলাদেশ ব্যাংক, যা বাজারের রেমিট্যান্সের ডলারের দর (১২২.৩০–১২২.৬০ টাকা) থেকে বেশি। এর ফলে বছর ব্যবধানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস বা মোট রিজার্ভ প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বেড়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর নাগাদ ৩৬.৩৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সুদের হার কমার এই চিত্রটি এমন এক ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, যেখানে মন্থর প্রবৃদ্ধি, ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতি এবং উচ্চ বেকারত্ব মিলিয়ে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা মন্দার মধ্য দিয়ে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা জাগাচ্ছে। আগস্টে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.২৬ শতাংশে নামলেও, তা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫ শতাংশের চেয়ে এখনও বেশ উপরে রয়েছে। গত বছরও পণ্যের দাম বাড়তি থাকায়—সেই উচ্চ ভিত্তির ওপর ভর করে মূল্যস্ফীতি বজায় থাকার অর্থ হলো সাধারণ ভোক্তাদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় এখন অস্বস্তিকরভাবে চড়া।
এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকে চাঙ্গা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ প্রণোদনা কর্মসূচির মাধ্যমে বাজারে তারল্য জোগান দিচ্ছে এবং মুদ্রানীতি আরও শিথিল করার পরিকল্পনা করছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা সতর্ক করে বলছেন, অর্থনীতির কাঠামোগত বাধাগুলো দূর না করে কেবল টাকা ঢাললে প্রকৃত চাহিদা তৈরি হবে না, বরং উল্টো তা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনতে গত জুলাই মাসে নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯.৫ শতাংশ নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এটি ছিল ২০২২ সাল থেকে বজায় রাখা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি থেকে সুনির্দিষ্ট সরে আসার ইঙ্গিত। উল্লেখ্য, ঐ সময় নীতি সুদহার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে ১০ শতাংশ করা হয়েছিল এবং ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় দুই বছর তা ওই উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখা হয়েছিল।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম মনে করেন, কম সুদের হার প্রকৃতপক্ষে অর্থনৈতিক অচলাবস্থারই এক লক্ষণ। তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থমকে রয়েছে।







