লালদীঘির অর্ধেকই খালি, হকাররা ফের ফুটপাতে
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪:০০:০৮ অপরাহ্ন

মুনশী ইকবাল:
লালদীঘি হকার্স মার্কেটের ভেতরে অর্ধেকেরও বেশি স্থান জুড়ে খাঁ খাঁ শূন্যতা, অথচ বাইরের ফুটপাত দখল করে বসে আছেন শত শত হকার। ছাদের নিচের আশ্রয় ছেড়ে কেন এই ফুটপাতের রোদ-বৃষ্টির লড়াই, তা নিয়ে প্রশ্ন ও ক্ষোভের শেষ নেই।
একদিকে কোটি টাকার রাজকীয় আয়োজন, অন্যদিকে শূন্য খাতার হাহাকার। নগরভবনের ঠিক পেছনে, লালদীঘির পাড়ে কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে হকারদের পুনর্বাসনের যে মহাপরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল, তা এখন এক গোলকধাঁধা। মার্কেট দাঁড়িয়ে গেলেও কার নামে বরাদ্দ কিংবা কারা সেখানে ব্যবসা করছেন-সেই হিসাবের খাতাটিও নেই নগর ভবনে। আর তাই কোটি টাকার এই প্রকল্প ফুটপাতকে মুক্তি দিতে পারছে না, উল্টো জন্ম দিচ্ছে একরাশ অব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।
মার্কেটের ভেতরের অনেক দোকান ও জায়গা ফাঁকা পড়ে থাকলেও হকাররা তা ছেড়ে ফের ফিরে গেছেন নগরীর ব্যস্ততম সড়ক ও ফুটপাতে। ফলে আগের মতো চরম যানজট ও জনদুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। বিশেষকরে জাতীয় নির্বাচনের পর অনেকটা অনাদর, অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এই বাজার।
তাছাড়া এই হকার্স মার্কেটে নেই কোনো তদারকিও। অন্যান্য বাজারে প্রশাসনের অভিযান থাকলেও এখানো কোনো অভিযান তেমন দেখা যায়না। এতে ক্রেতারা প্রতারিত হন। সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হন ক্রেতারা মাছের বাজারে। নিয়মিত পচা মাছ বিক্রি হয় এখানে। অনেক ক্রেতা পরদিন অভিযোগ জানাতে এসে দেখেন যেখান থেকে মাছ কিনেছিলেন সেখানে অন্য ব্যবসায়ী। মূলত ক্রেতাদের প্রতারিত করতে তারা স্থান বদলে বদলে এখানে বসে থাকেন। এসব নানান কারণে একসময় তরকারি ও মাছ বাজারে কিছু ক্রেতার আনাগোনা থাকলেও ইদানীং তারাও এই বাজার বিমুখ হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে কাপড়ের দোকানগুলো কোনোদিনই জমেনি। ফলে সময়ের পথ ধরে এই বাজার এখন ব্যর্থই বলা চলে। এতে ক্রেতা বিক্রেতা উভয়েই এই বাজারে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
অভিযোগ আছে সিসিক, পুলিশ ও প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির যোগসাজোশে হকাররা আবার ফুটপাতে চলে এসেছেন। তারা অভিযোগ করেছেন জনগণের এতো টাকার খরচ করার আগে এর বাস্তবতা নিয়েও ভাবা উচিত ছিল। কারণ হকাররা ফুটপাতে থাকলে যাদের অবৈধভাবে পেট ভরে হকার্সশেড থাকতে তারা বঞ্চিত থাকেন। শক্ত এই সিন্ডিকেট এতো সহজে তা যে করতে দেবেনা সেই চিন্তা মাথায় রাখা দরকার ছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে খোদ প্রশাসন সংশ্লিষ্ট অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যেখানে সিলেটের ব্যবসায়ীরা নিয়মিত টেক্স দিয়ে, ভাড়া দিয়ে, অনেক টাকা খরচ করে ব্যবসা করছেন এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন সেখানে তাদের স্বার্থ না দেখে ভাসমানদের স্বার্থের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয় তাদের পুনর্বাসনে কোটি কোটি টাকা খরচও করা হয়েছে। কিন্তু বেলাশেষে ফলাফল যে লাউ সেই কদু। কিন্তু এখানে যদি সিলেটের ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে নজর দেওয়া হতো তাহলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা লাভবান হতেন, সিলেটের অর্থনৈতিক পরিবেশ ভালো হতো, চাঁদাবাজি কমতো। এখন একদিকে ফুটপাতে গোপনে চাঁদাবাজি হচ্ছে আবার অন্যদিকে হকার্স মার্কেটে কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হচ্ছে।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে নগরীর ফুটপাত ও সড়ক হকারমুক্ত করতে উদ্যোগ নেয় সিলেট সিটি কর্পোরেশন ও প্রশাসন। সর্বশেষ হকারদের পুনর্বাসনের জন্য লালদীঘিরপার এলাকায় অস্থায়ী ও আধুনিক মার্কেট তৈরি করা হয়। কিন্তু সরেজমিন দেখা গেছে, মার্কেটের ভেতরের একটি বড় অংশ ফাঁকা বা অর্ধখালি রয়েছে। হকারদের একটি অংশ সেখানে ব্যবসা না করে বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার ও চৌহাট্টাসহ বিভিন্ন প্রধান সড়কের ফুটপাতে পসরা সাজিয়ে বসেছেন।
জুলাই আন্দোলনের পর হকাররা ধীরে ধীরে শেড ছেড়ে বাইরে আসতে শুরু করে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তারা এতোটা ডানা মেলতে পারেনি। কিন্তু ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সরকার আসার পর বেপরোয়া হয়ে ওঠে তারা। এখন দিনেদুপুরে প্রকাশ্যে তারা ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিজন জানিয়েছেন জাতীয় নির্বাচনের পর প্রভাবশালী রাজনৈতিক ছাত্রছায়ায় হকাররা ফুটপাত দখল করেছেন। আলাদা আলাদাভাবে নেতারা আলাদা এলাকা ভাগ করে প্রতিদিন চাঁদা তুলে থাকেন। রাতে তাদের সংশ্লিষ্ট লোক এসে ফুটপাত থেকে দোকান অনুপাতে চাঁদা নিয়ে থাকেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে জিন্দাবাজার পয়েন্ট থেকে উত্তরে চৌহাট্টা পর্যন্ত দোকানের চাঁদা নিয়ে থাকেন স্থানীয় এক ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা, আবার জিন্দাবাজার পয়েন্ট থেকে দক্ষিণে কোর্ট পয়েন্ট পর্যন্ত অংশ দেখভাল করেন আরেকজন। এভাবে প্রতিটি এলাকা ভাগ করে তারা ফুটপাতে দোকান বসাতে হকারদের বসিয়েছেন। এসব দখলকারীর বিরুদ্ধে যাতে কোনো শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া না হয় সেই ব্যবস্থাও তারা করে থাকেন। পুলিশ ও প্রশাসন তারাই ম্যানেজ করেন। ফলে মাঝেমধ্যে যদি হকার উচ্ছেদ অভিযান দেখা যায় তা মূলত আইওয়াশ। অভিযানে বের হলে আগেই হকারদের জানিয়ে দেওয়া হয় ফোনে। তখন তারা আশপাশের দোকান ও গলিতে কিছু সময়ের জন্য মালামাল লুকিয়ে রাখেন। এসব অভিযানে যাদের মালামাল জব্দ করা হয় এরা মূলত স্থানীয় হকার নন। এসব হকার বিভিন্ন জায়গা থেকে হয়তো সেদিন এসেছেন বা চলতি পথে ব্যবসা করেন। যাদের সাথে দৈনিক চাঁদা নেওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। যারা নিয়মিত বসেন তারা আগে থেকে জানার ফলে থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এতো কাহিনি করে কেন ব্যবসা করছেন জানতে চাইলে মার্কেটে পর্যাপ্ত ক্রেতা না আসার অজুহাত দেখাচ্ছেন হকাররা। তাদের দাবি, লালদীঘিরপার মার্কেটের ভেতরে ক্রেতারা সচরাচর যেতে চান না। ফুটপাতে মানুষ চলাচলের সময় সহজে চোখে পড়ে বলেই বিক্রি বেশি হয়। এছাড়া স্থায়ী অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি এবং ক্রেতাদের আগ্রহের অভাবের কারণে তারা পুনরায় রাস্তায় ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন বলে দাবি করেন।
তারা জানান, মার্কেটের ভেতরে ক্রেতাদের আনাগোনা একেবারেই কম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন হকার বলেন, কোটি টাকা খরচ করে আমাদের জন্য মার্কেট করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে বেচাকেনা নেই। সারা দিনে ৫শ টাকার মালও বিক্রি হয় না। পেট চালাতে হলে তো রাস্তায় নামতেই হবে। তাই বাধ্য হয়ে অনেকে আবার ফুটপাতে দোকান দিচ্ছেন।
পথচারী ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ, কোটি টাকার প্রকল্প করেও সিলেট শহরের যানজট ও ফুটপাত সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। বন্দরবাজার এলাকার এক পথচারী বলেন, ফুটপাত দিয়ে হাঁটার কোনো উপায় নেই। প্রশাসন কয়েকদিন পর পর উচ্ছেদ অভিযান চালায়, কিন্তু তারা যাওয়ার পরপরই আবার ফুটপাত দখল হয়ে যায়। লালদীঘি মার্কেটে যদি হকারদের ধরে রাখা না যায়, তবে এই উচ্ছেদের কোনো মূল্য নেই।
এই বিষয়ে সচেতন মহল মনে করছেন, কেবল হকার্স শেড বানালেই হবে না, ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য মার্কেটের আধুনিকায়ন ও তদারকির প্রয়োজন ছিল। একই সাথে, হকাররা যাতে কোনোভাবেই আবার ফুটপাতে বসতে না পারে, সে জন্য সিটি কর্পোরেশন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর ও স্থায়ী নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, ফুটপাত মুক্ত সিলেটের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।
দেখা গেছে হকাররা ফুটপাতে ফিরে আসায় পথচারীদের হাঁটার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে ব্যস্ততম সড়কগুলোতে প্রায়ই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা যায়, ফুটপাত দখলদারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও স্থায়ী সমাধান করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ক্রেতাদের সচেতনতা এবং সঠিক তদারকি না থাকলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবর শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং লালদীঘির পাড় হকার্স মার্কেটের যথাযত ব্যবহারে সিসিক প্রশাসকসহ কর্তৃপক্ষ আন্তরিক। এ ব্যাপারে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। অভিযানে কোনো ঘাটতি বা গাফিলতি দেখা গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর পাশাপাশি হকার্স মার্কেটে ব্যবসায়ী এবং ক্রেতারা যাতে সঠিকভাবে কেনাবেচা করতে পারেন তাও দেখা হবে।







