সিলেটে ৩ লাখ হেক্টর অনাবাদি জমি চাষে সেচের মহাপরিকল্পনা
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬:২৪:০৪ অপরাহ্ন
সোলারে যাচ্ছে ৫০০ ডিজেল পাম্প

এমজেএইচ জামিল : সিলেট বিভাগের প্রায় ৩ লাখ হেক্টর জমি বিভিন্ন মৌসুমে অনাবাদি পড়ে থাকে। কখনো অতিরিক্ত পানি, আবার কখনো সেচের পানির সংকট-দুই বিপরীত বাস্তবতায় কৃষির বড় সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতি বদলাতে সেচ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। ধাপে ধাপে ১৭ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় এনে আবাদ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে পৌঁছেছে সেচ সুবিধা। পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয় কমাতে বিভাগের ৫০০টি ডিজেলচালিত সেচপাম্প সৌরশক্তিতে রূপান্তরের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলেটের কৃষিতে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো পানি ব্যবস্থাপনার বৈপরীত্য। বর্ষায় অতিরিক্ত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওর ও নিম্নাঞ্চলের জমিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় সেচের পানির সংকট। ফলে বিপুল পরিমাণ জমি চাষের বাইরে থেকে যায়। এ সমস্যা মোকাবিলায় বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা, প্রয়োজনের সময় তা সেচে ব্যবহার এবং হাওর থেকে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে বিএডিসির ‘সিলেট বিভাগে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি’ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন এলাকার খাল, নালা ও পাহাড়ি ছড়া খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব জলপথের ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করা হবে। পরে সেই পানি শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচের কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। একই অবকাঠামো বর্ষায় হাওরের অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনেও ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, খাল-নালা ও পাহাড়ি ছড়া পুনঃখনন ও সংস্কারের মাধ্যমে বোরো মৌসুমে ৮ হাজার ১৫০ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনা সম্ভব হবে। এতে অতিরিক্ত প্রায় ২৪ হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু বোরো নয়, সংরক্ষণ করা পানি আমন ও রবি মৌসুমেও কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ একই পানি অবকাঠামোকে একাধিক মৌসুমে কাজে লাগিয়ে কৃষিজমির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
৫৪৩ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ সেচনালা:
সেচ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও পানিসাশ্রয়ী করতে ৫৪৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে ৩৬৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার সেচনালা নির্মাণ করা হবে। পুরোনো সেচ স্কিমের আওতায় আরও ১৭৬ কিলোমিটার নালা সম্প্রসারণ করা হবে।
এই অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে বোরো মৌসুমে আরও ৭ হাজার ৮৬৯ হেক্টর কৃষিজমি আধুনিক সেচের আওতায় আসবে। প্রকল্পের হিসাব বলছে, এর মাধ্যমে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ হাজার ৬০৮ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে প্রচলিত সেচব্যবস্থার পাশাপাশি পানির অপচয় কমিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
হাওরে পানি নিষ্কাশন ও সংরক্ষণ:
সিলেটের হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের ক্ষতি কমাতেও নেওয়া হচ্ছে পৃথক ব্যবস্থা। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি বর্ষার পানি ধরে রাখার উদ্যোগ থাকবে। শুষ্ক মৌসুমে সেই পানি ব্যবহার করা হবে সেচে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মধ্যমাকার সেচ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে আরও ১ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।
কৃষকের উৎপাদন-পরবর্তী সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টিও পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে। হাওর এলাকায় ধান মাড়াই, ঝাড়াই ও শুকানোর জন্য থ্রেসিং ফ্লোর এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে গোপাট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে শুধু জমিতে উৎপাদন বাড়ানো নয়, ফসল ঘরে তোলা ও বাজারজাতকরণেও কৃষকরা বাড়তি সুবিধা পাবেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ডিজেলনির্ভর সেচে লাগবে সৌরশক্তি:
সেচে ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনতে বিভাগের ৫০০টি ডিজেলচালিত পাম্প সৌরশক্তিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সৌর পাম্প চালু হলে একদিকে সেচের জ্বালানি ব্যয় কমবে, অন্যদিকে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি কিংবা সরবরাহ সংকটের প্রভাব থেকেও কৃষকরা তুলনামূলকভাবে সুরক্ষা পাবেন।
জাতীয় পর্যায়ে প্রস্তাবিত সৌর সেচ প্রকল্পের গড় সাশ্রয়ের হিসাব ধরে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলেটের ৫০০টি পাম্প সৌরচালিত করা গেলে বছরে প্রায় ২৬২ টন ডিজেল সাশ্রয় হতে পারে। একই সঙ্গে প্রায় ৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা জ্বালানি ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পাম্পের ক্ষমতা, ব্যবহারকাল ও পরিচালন পদ্ধতির ওপর প্রকৃত সাশ্রয়ের পরিমাণ নির্ভর করবে।
বিএডিসি সিলেট বিভাগের সেচ প্রকল্প পরিচালক প্রণজিত কুমার দেব দৈনিক জালালাবাদকে জানান, বিভাগের বিপুল পরিমাণ জমি বিভিন্ন মৌসুমে অনাবাদি থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সেচ সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ১৭ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এরই মধ্যে সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা পৌঁছেছে। বাকি জমিগুলোতেও ধাপে ধাপে সেচ সম্প্রসারণ করা হবে।
তিনি জানান, এ কার্যক্রমে শুধু সেচ অবকাঠামো নির্মাণ নয়, খাল-নালা ও ছড়া খনন, পানি সংরক্ষণ এবং সৌরশক্তিনির্ভর সেচব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে একদিকে অনাবাদি জমি আবাদে আসবে, অন্যদিকে কৃষকের সেচ ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সিলেটের কৃষিকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে গড়ে তুলতে শুধু জমি থাকলেই হবে না; প্রয়োজন পানি ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধান। বর্ষার পানি সংরক্ষণ, হাওরের পানি দ্রুত নিষ্কাশন, ভূগর্ভস্থ সেচনালা সম্প্রসারণ এবং সৌরশক্তির ব্যবহার—এই সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অনাবাদি জমির পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের আয় বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।






