ছাতকের অর্ধশত বছরের ঐতিহ্য : সারা বছরই নৌকা তৈরীতে জীবন চলে কারিগরদের
প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭:৩১:৩০ অপরাহ্ন

শাহ্ মো.আখতারুজ্জামান, ছাতক : সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলাটি বৃটিশ আমল থেকেই বালু-পাথরের ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি রয়েছে। এখানে এসব বালু-পাথর পরিবহনের জন্য জরুরী প্রধান বাহন হলো নৌকা। ছাতকের পাশাপাশি দোয়ারাবাজার উপজেলায়ও এসব নৌকা তৈরী একাধিক কারখানা রয়েছে। অর্ধশত বছরের ঐতিহ্যবাহী এসব কারখানায় সারা বছর জুড়ে নৌকা তৈরীতে জীবিকা নির্বাহ করে চলে অন্তত শতাধিক কারিগরের পরিবার।
সারা বছর কারখানা গুলোতে কাঠের নৌকা তৈরী হলেও বর্ষা মৌসুম এলেই কারিগরদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে শ্রমিদের কর্মজজ্ঞ। লোহার আলপিন ও হাতুড়ি ছন্দময় শব্দে মুখর পুরো এলাকা। কারিগরদের মধ্যে কেউ করাতে কাঠ চেরায় ব্যন্থ কোথাও আগুনের তাপে কাঠ বাঁকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও দক্ষ হাতে পেরেক বসিয়ে কাঠের টুকরো গুলোকে জোড়া লাগিয়ে তৈরি হচ্ছে একটি নৌকা।
সরজমিনে ঘুড়ে এমন কর্মব্যস্ততায় দেখা গেছে ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের কুচবাড়ি গ্রামের ইব্রাহিম চেয়ারম্যানের বাড়িতে। এক সময় ছাতকের বোল্ডার পাথর ও চুনাপাথর শিল্পকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই কারখানাটি এখন টিকে থাকার সংগ্রামে ব্যস্ত। নৌকা তৈরীর ব্যবসায় লাভ কমে যাওয়া, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি ও দক্ষ শ্রমিক সংকটের কারণে এখন কারখানার মালিক ও শ্রমিকদের অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
মূলত বর্ষা এলেই অথৈ জলরাশিতে হাওরাঞ্চল, বিল ও নদীতে পরিণত হয়। তখন নৌকাই হয়ে ওঠে মানুষের চলাচল, জীবিকা ও দৈনন্দিন জীবনের একমাত্র ভরসা। কাঠের তৈরী নৌকাগুলোই বছরের পর বছর তৈরি হচ্ছে কুচবাড়ির ইব্রাহিম চেয়ারম্যানের বাড়ির আলং। অর্ধ শতকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছেন ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার কয়েক শতাধিক কারিগর।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের গনেশপুর, চাইড়গাঁও ও ইছামতি ছাড়াও দোয়ারাবাজার উপজেলা নরসিংপুর ইউনিয়নের কুনিমুড়া গ্রামেসহ অন্তত ১০টি গ্রাম এখন পরিচিত ‘নৌকা তৈরির গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি রয়েছে। এখানে বংশ পরম্পরায় নৌকা তৈরির কাজ চলছে। বর্তমানে এসব নৌকা তৈরী কারখানায় যারা কাজ করেন তাদের প্রধান জীবিকা এই শিল্প।
২৮ হাজার টাকা খরচে একটি বারকি নৌকা তৈরিতে সময় লাগে মাত্র দুদিন। একদিনে ছোট একটি ফেরী নৌকা তৈরিতে খরচ হয় ১৫ হাজার টাকা। মাছ ধরার নৌকা তৈরিতে খরচ পড়ে ১০ হাজার টাকা। বিলের নৌকা তৈরিতে ব্যয় হয় ১৮ হাজার টাকা। আর মাত্র ৪দিনে ইঞ্জিন চালিত নৌকা তৈরিতে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয় বলে জানা গেছে। বর্তমানে লাভের পরিমাণ খুবই সীমিত হওয়ায় কোনো রকমে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে কারখানা মালিকদের। এক সময় ভারত থেকে খুবই স্বল্প মুল্যে আম, কুমা ও জাড়ইল কাঠ ক্রয় করে তৈরী করা হতো এসব নৌকা। বর্তমানে নৌকা তৈরীর জন্য এসব কাঠ সংগ্রহ করা হয় চট্রগ্রাম, যশোর, লালমনিরহাট, পাটগ্রাম, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে গাছ সংগ্রহ করা হয়। পরে সেই গাছ করাতকলে (সো-মিল) এনে নৌকার ধরন অনুযায়ী কাঠ চিরে প্রস্তুত করা হয়।
কারখানায় গিয়ে কথা হয় প্রধান কারিগর বিমল দাসের সাথে। তাঁর বাড়ি দোয়ারাবাজার উপজেলার পান্ডারগাঁও ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে। ১০ বছরেরও বেশী সময় ধরে তিনি বর্ষা মৌসুমে এই কারখানায় কাজ করছেন। তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক। বড় ছেলে বিপুল দাস তার বাবার সাথে তাজ করছে। ছোট ছেলে ও মেয়ে পড়াশোনা করছে। তিনি বলেন, বছরের চার মাস এখানে নৌকা তৈরি পর বাকি সময় নিজ এলাকায় কৃষিকাজ করে কোনো রকমে সংসার চালাতে হয়। বর্তমানে কষ্ট বাড়লেও আয় তেমন বাড়েনি।
কুচবাড়ি গ্রামে নৌকা কারখানার স্বত্বাধিকারী মো.জিয়াউর রহমানের কারখানায় তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের নৌকা। এর মধ্যে রয়েছে বারকি নৌকা, ফেরী নৌকা, মাছ ধরার নৌকা, বিলের নৌকা ও ইঞ্জিন চালিত নৌকা। বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমেই নৌকার চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। বছরের চার মাস কারখানার শ্রকিদের অনেকেই প্রায় বেকার হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, বাবা যখন ব্যবসা করতেন তখন ছাতকের চুনাপাথরের ব্যবসা ছিল অনেক বড়। ছোট বারকি নৌকায় পরিবাহন করে বড় নৌকায় নানা প্রকারের পাথর লোর্ডিং করা হয়। বিভিন্ন ক্রাশার মিল থেকে মালামাল পরিবহনে এসব নৌকার ব্যাপক ব্যবহার ছিল। ভারত থেকে নদী পথে চুনাপাথর আমদানী ও রপ্তানীর ব্যবসাও ছিল জমজমাট। তখন নৌকার চাহিদা ও লাভ দুটোই অনেক বেশি ছিল। কিন্তু এখন আগের সেই সুদিন আর নেই।
ছাতক লাইমস্টোন ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড সাপ্লাইয়ার্স গ্রুপের সদস্য এবং মেসার্স আমির ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আমির হোসেন বলেন, আমরা ব্যবসার প্রয়োজনে এ কারখানাসহ আরও কয়েকটি কারখানা থেকে প্রাত বছর নৌকা ক্রয় করি। আগে নৌকার দাম অনেক থাকলেও এখন কাঠ ও শ্রমিকের খরচ বেড়ে যাওয়ায় দামও বেড়েছে। বাপ্পি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো.ইছহাক আলী বলেন, চুনাপাথর সংগ্রহ ও পরিবহনের জন্য কাঠের নৌকার বিকল্প এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। তাই প্রতিবছরই আমাদের এসব নৌকা কিনতে হয়।
অর্ধশতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করে দীর্ঘ প্রায় অর্ধশত বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে ইব্রাহিম চেয়ারম্যান আলং নামের নৌকা তৈরীর কারখানা। নৌকার কাঠ, হাতুড়ির আঘাতে আর প্রতিটি কারিগরের ঘামে লুকিয়ে আছে ছাতক ও দেয়ারাবাজারের নদী, মানুষের জীবন সংগ্রাম এবং হারিয়ে যেতে বসা এক গৌরবময় ঐতিহ্যের গল্প।





