আরও জবাবদিহি ও নজরদারিতে আসছে মাঠ প্রশাসন
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ৮:৪২:২৩ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট: দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সরকারি সিদ্ধান্তের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে মাঠ প্রশাসনের ওপর নজরদারি ও জবাবদিহি বাড়াচ্ছে সরকার| জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডদের কর্মদক্ষতা, সততা, ¯^চ্ছতা এবং জনবান্ধব আচরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে| আসন্ন দুর্গাপূজার পরিস্থিতি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং পতিত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বারবার দেওয়া ইঙ্গিতের মধ্যে মাঠ প্রশাসনের সক্ষমতা যাচাইকে প্রাথমিক পরীক্ষা হিসেবে দেখছে সরকার| একই সঙ্গে পদোন্নতি ও বদলিতে মেধা-দক্ষতার মূল্যায়ন, তদবিরের প্রভাব কমানো এবং সরকারের সঙ্গে কাজ করতে অনাগ্রহী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| দীর্ঘদিন পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের বিষয়টিও নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে| জনপ্রশাসন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ধাপে ধাপে পদোন্নতি ও বদলির পাশাপাশি মাঠ প্রশাসন থেকে সচিবালয় পর্যন্ত ¯^চ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার| জনপ্রশাসন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক সূত্র এমনটাই জানিয়েছে|
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যেহেতু পতিত সরকারের প্রশাসন ‘টপ টু বটম’-এ জড়িয়ে আছে| তাদের নিয়েই এই সরকারকে কাজ করতে হচ্ছে| তাই যতটুকু সম্ভব সবকিছু আগায় নিতে হচ্ছে, যেখানে অনেকের অনীহা-অনাগ্রহ আছে; আছে হতাশা| এর মধ্যে মাঝে মাঝে যখন শুনে ডিসে¤^রে আসতেছি; তখন একটু আশা নিয়ে ভাবে দরকার কি চাঙ্গা হওয়ার; একটু ওয়েট করি দেখি যদি এসে পড়েন| তবে এটাও সত্যি যদি ডিসে¤^র পার হয়ে যায় তাহলে কর্মকর্তাদের কেউ কেউ আরও হতাশ হবেন| কারও সিদ্ধান্ত এমন হতে পারে আমার তো এখন কাজ করতেই হবে; আমাকে ওই এফর্টটা দিতে হবে| ফলে যখন সরকারের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কার্য সম্পাদনে ইচ্ছুক বাছাইকৃত কর্মকর্তারা তাদের এফর্টটা দেওয়ার চেষ্টা করবেন তখন হয়তো সরকারও আরও দৃশ্যমান শক্তিশালী হবে মাঠ প্রশাসনও শক্তিশালী হয়ে উঠবে|
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসনিক সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার ¯^চ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে| সেক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত এই ¯^চ্ছতার খোঁজে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার উদ্যোগ রয়েছে| সরকারের এই ¯^চ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রগুলো মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় তদবিরবিহীন বদলি ও পদায়ন নীতি, কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ| এটি বাস্তবায়নে ডিসি, ইউএনও কিংবা প্রেষণে লোভনীয় পদের জন্য কর্মকর্তাদের যে চিরাচরিত তদবিরের সংস্কৃতি ছিল, তা বন্ধ করতে সরকারের অবস্থান থাকবে কঠোর| ফলে ভবিষ্যতে মেধা, দক্ষতা এবং মাঠ পর্যায়ের কাজের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে পদায়ন ও বদলিতে ¯^চ্ছতা আনা হতে পারে| এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের আর্থিক ¯^চ্ছতা নিশ্চিতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে| এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি বছরের অর্জিত সম্পদের হিসাব বিবরণী ঘোষণা বাধ্যতামূলক করার জোরাল সুপারিশ এসেছে| এমনকি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রেখে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে জেলা প্রশাসকদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেন সরকারি সেবা নিশ্চিত করতে সাধারণ মানুষ কোনো ধরনের হয়রানি বা বিল¤ে^র শিকার না হয়|
এদিকে সবশেষ সংসদ অধিবেশন চলাকালীন প্রশাসনিক কার্যক্রমে দক্ষতা, ¯^চ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান| দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে প্রতিরোধ ও দমনমূলক ব্যবস্থা নিতে মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি| মাঠ প্রশাসনকে দেওয়া অন্য নির্দেশনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণপূর্বক প্রতিরোধমূলক ও দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে| অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা পরিহার করে দ্রুত, বাস্তবসম্মত ও জন¯^ার্থ-সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে| এ ছাড়া নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে সততা, মেধা ও দক্ষতাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে অনুসরণ করতে হবে|’
প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে মেধা, সততা ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, রাজনৈতিক বা অন্যান্য প্রভাবমুক্ত রেখে মেধা, সততা ও দক্ষতাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহারের নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে| তাই মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কেবল চাকরি হিসেবে নয়, বরং নির্দিষ্ট কর্মস্থলকে নিজের এলাকা মনে করে আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা লাগবে|
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ˆদনন্দিন কার্যক্রম, সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের আচরণ, আর্থিক লেনদেনের ওপর বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিশেষ উইংয়ের মাধ্যমে নিবিড় নজরদারি চালানো হচ্ছে| এরপর কর্মকর্তাদের গোপন আমলনামা ˆতরি করে তা নিয়মিত সরকারের শীর্ষ মহলে পৌঁছে দেওয়া হবে| এমনকি প্রাথমিক পর্যায়ে প্রত্যেক ডিসি ও ইউএনও সপ্তাহে অন্তত এক দিন নির্ধারিত সময়ে সাধারণ জনগণের মুখোমুখি হয়ে সরাসরি ‘গণশুনানি’ সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা, তা কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটর করা হচ্ছে| সরকারের উদ্দেশ্যে কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন মূল্যায়নে তাদের কর্মদক্ষতার পাশাপাশি সততা এবং জনবান্ধব আচরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া| এ ছাড়া সরকারি কার্যক্রমের বাস্তব চিত্র নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমš^য়ে তিন সদস্যের পরিবীক্ষণ টিম গঠন করা হয়েছে| মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের গঠিত এসব টিম ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে| পরিবীক্ষণ টিম ˆদবচয়নের ভিত্তিতে বিভিন্ন দপ্তর পরিদর্শন করে কার্যক্রমের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করবে, উত্তম চর্চা চিহ্নিত ও সম্প্রসারণের সুপারিশ এবং জনগণকে সেবা প্রদানের কার্যক্রম ত্বরাšি^ত করতে প্রয়োজনীয় সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে দাখিল করবে| এমনকি সরকারি কর্মসম্পাদনকে আরও ফলাফলভিত্তিক, কৌশলগত ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে গভর্নমেন্ট পারফরমেন্স মনিটরিং সিস্টেম (জিপিএমএস) চালু করা হয়েছে| এর মাধ্যমে সরকারি সেবার মানোন্নয়ন, প্রকল্প ও কর্মসূচির সময়মতো বাস্তবায়ন, সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার এবং সুশাসন ও জবাবদিহি আরও বৃদ্ধি পাবে বলে সরকার আশাবাদী|
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, মাঠ প্রশাসন পরিচালনায় সরকারের কঠোর উদ্যোগ সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত| এর মাধ্যমে প্রশাসনের জবাবদিহিতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেতে পারে| তবে এই কঠোরতা যেন কোনোভাবেই আমলাতন্ত্রের ¯^াভাবিক গতিকে থমকে না দেয় এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে ভীতি বা নিষি&ক্রয়তা ˆতরি না করে, সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে| তারা মনে করছেন, জবাবদিহিতা এবং কর্মকর্তাদের কাজের ¯^াধীনতার মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখার মাধ্যমেই কেবল একটি সম্পূর্ণ জনবান্ধব, ¯^চ্ছ ও আধুনিক মাঠ প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব, যা দেশকে সামগ্রিক অগ্রগতির চূড়ায় নিয়ে যেতে পারে| সরকারের একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বলছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের পর্যবেক্ষণের সময় শেষ; এবার মাঠ প্রশাসন থেকে উচ্চ পর্যায় থেকে সর্ব জায়গায় কঠোর নীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে|





