সরকারের ঋণ চাহিদায় চাপে বাজার
প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ৬:৪৪:৩৬ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক : সরকারের ঋণচাহিদা বাড়ায় ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার ব্যয় বাড়ছে। এর প্রভাবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার দ্রুত বাড়ছে। মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড বেড়েছে ০.৪২ শতাংশ পয়েন্ট। সুদহার বাড়তে থাকলে সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় আরো বাড়বে। এতে বাজেটের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ অক্টোবরের নিলামে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড ছিল ৮.১৩ শতাংশ। ২৬ অক্টোবরের নিলামে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮.৫৫ শতাংশে। চলতি মাসে অন্যান্য মেয়াদের বিল ও বন্ডের ইল্ডও বেড়েছে। ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড এখন ৯.৩৮ শতাংশ।
সুদহার বাড়ার অন্যতম কারণ সরকারের বাড়তি ঋণচাহিদা। চলতি অক্টোবরের ২৭ তারিখ পর্যন্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিলামের মাধ্যমে সরকার ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা তুলেছে। নতুন বেতনকাঠামোর বকেয়া পরিশোধে বুধবার (২৮ অক্টোবর) ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা তুলতে নিলাম ডাকা হয়েছে। এই নিলামে সরকারের লক্ষ্য পূরণ হলে অক্টোবর মাসে বিল ও বন্ডের নিলাম থেকে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। বর্তমান সরকারের সময়ে এক মাসে এটিই সর্বোচ্চ ঋণ নেওয়ার পরিমাণ হবে।
ব্যাংক খাতে অর্থের ঘাটতি না থাকলেও সরকারি ঋণের সুদহার বাড়ছে। গত আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। সাধারণত ব্যাংকে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলে ঋণের সুদহারে চাপ কম থাকার কথা। তবে সরকারের বড় অঙ্কের ঋণচাহিদা পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। সরকারের ধারাবাহিক ঋণ চাওয়ার কারণে ব্যাংকগুলো নিলামে বেশি সুদে দরপ্রস্তাব দিচ্ছে। অন্যদিকে, অর্থের প্রয়োজন মেটাতে সরকারও সেই উচ্চ সুদে ঋণ নিচ্ছে। ফলে ব্যাংক খাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকা সত্ত্বেও সরকারি ঋণের ব্যয় কমছে না।
এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা করা হয়। এবারের সুদ পরিশোধের বরাদ্দের প্রায় ৯০ শতাংশই ব্যয় হবে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ মেটাতে। বরাদ্দের পরিমাণ সরকারি কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও পেনশনের জন্য রাখা ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ মোট বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ ব্যয় হবে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধে।
সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের বড় অংশ আসে ট্রেজারি বিল ও বন্ড থেকে। এসব ঋণপত্রের ইল্ড বাড়লে নতুন ঋণের সুদও বেড়ে যায়। পাশাপাশি পুরোনো বিল ও বন্ডের মেয়াদ শেষ হলে সেগুলোর অর্থ পরিশোধে নতুন করে ঋণ নিতে হয়। তখন আগের তুলনায় বেশি সুদ দিতে হলে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনার ব্যয় আরো বেড়ে যায়। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিলামের মাধ্যমে সরকার প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা তুলেছে। তবে এ সময়ে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ নিলাম থেকে তোলা অর্থের বড় অংশই ব্যয় হয়েছে আগের ঋণ পরিশোধে।
এ পরিস্থিতিতে সুদহার বাড়তে থাকলে পুরোনো ঋণ পরিশোধের জন্য নতুন ঋণ নেওয়ার ব্যয়ও বাড়বে। ফলে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হবে। এর প্রভাবে গত অর্থবছরের মতো চলতি অর্থবছরেও ঋণের সুদ পরিশোধের বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগে বেশি মুনাফা পাওয়া গেলে ব্যাংকগুলোর বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার আগ্রহ কমতে পারে।
কারণ, বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি ও ঋণ আদায়ের অনিশ্চয়তা থাকলেও সরকারি ঋণপত্রে তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে মুনাফা পাওয়া যায়। এর প্রভাব বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধিতে এরই মধ্যে দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪.৪৭ শতাংশ। একই সময়ে সরকারের ঋণ বেড়েছে ৩৪ শতাংশের বেশি। সরকারের ঋণচাহিদা ও সুদহার বাড়তে থাকলে ব্যাংক থেকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরো চাপে পড়তে পারে। এতে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।






