শেষ হয়নি বাঁধের কাজ, শঙ্কিত কৃষক!
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ মার্চ ২০২৬, ৪:২৩:৪২ অপরাহ্ন
পাউবো’র দাবী ৭৯ ও হাওর বাঁচাও বলছে ৫০ ভাগ

এমজেএইচ জামিল :
এবারও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি সুনামগঞ্জের হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ। নির্ধারিত সময় ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি। এই সময়ের মধ্যে অর্ধেক কাজও শেষ হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবো ৭৯ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার দাবি করলেও হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা বলছেন এখনো অর্ধেক কাজও হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে আরও এক ১৫ দিন সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে পাউবো। তবে বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
এদিকে সময়মতো বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় আগাম বন্যায় ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কায় কৃষক। জেলার অনেক উপজেলার বিভিন্ন বাঁধে মাটির কাজই শেষ হয়নি। এরই মধ্যে বৃষ্টির আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বৃষ্টি হলে নির্মিত বাঁধ ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সঠিক সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ঢলে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে বোরো ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। যদিও বর্ধিত ১৫ দিনের মধ্যেই কাজ শেষ করবেন বলে জানিয়েছেন পাউবো কর্তারা।
জানা গেছে, এবার সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলার হাওর এলাকার ফসল রক্ষায় ৬০১ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবো। এই কাজে ৭১০টি প্রকল্পের জন্য মোট বরাদ্দ ১৪৬ কোটি টাকা। ১৫ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় বাঁধ নির্মাণ। ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজ শেষ হয়নি।
দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় সুনামগঞ্জে বৃষ্টির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। এ কারণে প্রবল বৃষ্টি এবং ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জে দেখা দেয় অকালবন্যা। মার্চের দিকে বেশী বৃষ্টি হলে আকস্মিক বন্যায় হাওরের বোরো ধান ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ফলে ধান রক্ষায় প্রতিবছর সুনামগঞ্জ জেলায় হাওরে নির্মাণ করা হয় ফসল রক্ষা বাঁধ।
স্থানীয় কৃষকদের সাথে আলাপকালে তারা বলেন, ২০১৭ সালে সময়মতো বাঁধ না হওয়ায় ও বাঁধের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি থাকায় আগাম বন্যায় সুনামগঞ্জের শতভাগ ফসল পানির নিচে তলিয়ে যায়। এর পর মানুষ দিনের পর দিন না খেয়ে থেকেছে, হাওরের সব মাছ মরে গেছে। এমনকি ঘাসের অভাবে গরু-ছাগলও মারা গেছে। ২০২০ সালেও আগাম বন্যায় বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যায়। আমরা চাই বাঁধের কাজ সময়মতো হোক। তা হলে আমরা ফসল গোলায় তুলতে পারব। পরিবার নিয়ে দু-মুঠো ভাত খেতে পারব। আমরা চাই না ২০১৭ অথবা ২০২০ সাল আবার আসুক।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরে মাত্র একটি ফসল কৃষক যেন গোলায় তুলতে পারে, সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি বছর ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু বাঁধ নির্মাণের নির্দিষ্ট সময় এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। এমনকি বাঁধের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন হাওরসংশ্লিষ্ট নেতাদের পাশাপাশি কৃষকরা। তারা বলছেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার কোনো মিল নেই। বাঁধের কাজে সংশ্লিষ্টদের অবহেলা ও গাফিলতির কারণে এবারও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। এতে ঝুঁকিতে পড়বে হাওরপারের মানুষের একমাত্র জীবিকা।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিজন সেন রায় দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার অনিয়ম, দুর্নীতি আর গাফিলতি বেশি হয়েছে। প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধের কাজের যে হিসাব দিচ্ছে তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।
তিনি বলেন, এবার সবচেয়ে বেশী অনিয়ম হয়েছে শান্তিগঞ্জ ও জামালগঞ্জ উপজেলায়। শাল্লা উপজেলাসহ কয়েকটি বাঁধের কাজ শুরুই হয়নি। এবারও যদি নির্দিষ্ট সময়ে বাঁধের কাজ শেষ না হয়, অবহেলা করা হয়— তা হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাওর ও নদী রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, এবছর শুরু থেকেই প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ ঢিমেতালে চলছিল। তারা যে তথ্য দিচ্ছে বাস্তবের সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। গত বছর যেসব বাঁধ অক্ষত ছিল, সেসব বাঁধে বরাদ্দ দেখিয়ে হরিলুট চলছে। এবার আগাম বন্যার সম্ভাবনা রয়েছে। তারা যে বাঁধ দিচ্ছে তা প্রথম দফাতেই পানিতে ভেসে যাবে। প্রশাসন ও পাউবো কাজ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। যদি এবার আগাম বন্যায় বাঁধ ভাঙে আর কৃষল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা হলে সব দায় তাদের।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, এবার শুরুতে নির্বাচনের জন্য কাজের গতি কিছুটা ধীর ছিল। তাই সঠিক সময়ে কাজ শেষ হয়নি। কাজের মেয়াদ আরও ১৫ দিন বাড়াতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বর্ধিত সময়ের মধ্যে সব কাজ শেষ হবে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন নেতৃবৃন্দের অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, উনারা যদি অনিয়ম ও বাকী থাকা বাঁধের স্থান নির্ধারণ করে দিতে পারেন তাহলে আমরা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবো। আমাদের টীম প্রতিদিনই সরেজমিনে পরিদর্শন করে বাঁধ নির্মানের অগ্রগতি রিপোর্ট সংগ্রহ করছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, সিলেট বিভাগের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি বোরো ধান উৎপাদন হয়ে থাকে। ১২ উপজেলার প্রকৃতি নির্ভর মৌসুমী এ ফসল স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত ফসল জাতীয় খাদ্য ভাণ্ডারে যুক্ত হয়। এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। সব ঠিক থাকলে এবছর ১৪ লক্ষ মেট্রিক টন ধান পাওয়া যাবে।





