এক যুগে বন্ধ ৮ দেশের শ্রম বাজার
প্রকাশিত হয়েছে : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৭:৩৩:০৩ অপরাহ্ন

জালালাবাদ রিপোর্ট : গত এক যুগে বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে পৃথিবীর ৮টি দেশের শ্রম বাজার| তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের দুর্নীত ও সিন্ডিকেটের কারণেই এসব শ্রম বাজার বন্ধ হয়ে গেছে বলে মনে করছেন জনশক্তি রপ্তানি বিশ্লেষকরা| তবে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে নতুন শ্রম বাজারের সন্ধানে রয়েছে সরকার| প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নতুন শ্রম বাজার চালু করতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন দেশে| সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী মালয়েশিয়া সফর করে বন্ধ থাকা শ্রম বাজার খুলতে উদ্যোগ নিয়েছেন|
জানা গেছে, বিদেশে কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ তৈরি করতে উদ্যোগ নিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ ওবৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়| এ লক্ষ্যে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার অন্তত ১৬টি দেশে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে| সংশ্লিষ্ট দেশগুলো থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেলে সেসব দেশে বাংলাদেশিকর্মী পাঠানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করছে মন্ত্রণালয়টি| বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর|
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট প্রবাসী কর্মীর ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশই কর্মরত মধ্যপ্রাচ্যে, যেখানে উপসাগরীয় ছয়টি দেশেই সিংহভাগ কর্মসংস্থান| এর মধ্যে সৌদি আরব একাই ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কর্মীর গন্তব্য| মোট রেমিট্যান্সেরও ৬০ শতাংশের বেশি আসে এসব দেশ থেকে| এ অবস্থায় নতুন বাজার খোঁজার উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা| মন্ত্রণালয় বলছে, নতুন দেশ থেকে সাড়া পাওয়া গেলে নির্দিষ্ট অঞ্চলের শ্রমবাজারের ওপর চাপ কমবে|
গত ৪ মার্চ প্রবাসীকল্যাণ ও ˆবদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে থাইল্যান্ড-বাংলাদেশ কর্মী পাঠানো সংক্রান্ত এমওইউ অ্যান্ড অ্যাগ্রিমেন্ট নিয়ে সার্বিক আলোচনা হয়| সভায় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এমওইউ অ্যান্ড অ্যাগ্রিমেন্টকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্য পজিটিভ হবে বলে মতামত দেন| জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে ওমান, বাহরাইন, লিবিয়া, সুদান, মিশর, রোমানিয়া, ব্রুনাই ও মালদ্বীপসহ বেশ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেছে| ২০২৪ সালে ১০ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গেলেও ৯৫ শতাংশ গেছে মাত্র পাঁচটি দেশে, যা বাজার সংকোচনের স্পষ্ট ইঙ্গিত| অন্যদিকে নারী কর্মী প্রেরণেও বড় ধস নেমেছে, ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় ৬৬ শতাংশ কমেছে|
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে মোট অভিবাসীর ৬৭ শতাংশ, অর্থাৎ সাত লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জন সৌদি আরব গেছেন| এরপর যথাক্রমে ১০ শতাংশ, এক লাখ সাত হাজার ৫৯৬ জন কাতারে; ৬ শতাংশ, ৭০ হাজার ১৭৭ জন সিঙ্গাপুরে; ৪ শতাংশ, ৪২ হাজার ২৪১ জন কুয়েতে ও ৪ শতাংশের কাছাকাছি, ৪০ হাজার ১৩৯ জন গেছেন মালদ্বীপে| এরপর ১৩ হাজার ৭৫২ জন গেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), ১২ হাজার ৩০১ জন গেছেন জর্দান, ১২ হাজার ২৫১ জন গেছেন ক¤ে^াডিয়ায়, ৯ হাজার ৩৬৫ জন গেছেন ইতালি ও ছয় হাজার ৬৫০ জন গেছেন কিরগিজস্তান| অর্থাৎ বেশির ভাগ কর্মীই অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে গেছেন|
তথ্য বলছে, নানা অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ এবং রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেটের কারণে ২০২৪ সালের মে মাস থেকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয়| অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, ভুয়া ভিসা ও শ্রমিকদের শোষণ নিয়ে মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের উদ্বেগের কারণে এই স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়| ইতোমধ্যে দুই দেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় আবারও চালু হচ্ছে এই বাজার| এতে বাড়বে কর্মসংস্থান, কমবে বেকারত্ব| প্রবাসী আয়ে অর্থনীতিতে পড়বে ইতিবাচক প্রভাব|
গত ৯ এপ্রিল কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ও উপদেষ্টার সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও মানবসম্পদ মন্ত্রীর ˆবঠক হয়| এরপর উভয় দেশের যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এবার দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী মুক্ত একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অনলাইন সিস্টেম এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কর্মী নিয়োগ করা হবে| আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মানদণ্ড অনুসরণ করে ‘জিরো কস্ট’ বা অভিবাসন ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে|
জানা যায়, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, মায়ানমার, ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে দীর্ঘদিন ধরে কর্মী নিচ্ছে জাপান| এ তালিকায় ২০১৯ থেকে যুক্ত হয় বাংলাদেশ| জাপানের কোম্পানিগুলো কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না| শ্রমিকসংকট চরম আকার ধারণ করায় তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লোক চাইছে| শর্ত হচ্ছে, কর্মীদের জাপানি ভাষা জানা থাকতে হবে| এর পাশাপাশি যে পেশায় কাজ করতে চান, সেই দক্ষতা থাকতে হবে| আপাতত কেয়ারগিভার, ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্যাকেজিং, ওয়েল্ডিং ও অটোমোবাইল মেকানিক খাতে বেশি লোক নিচ্ছে তারা| কিন্তু দক্ষতা না থাকায় সেই সুযোগ নিতে পারছে না বাংলাদেশ| গত সাত বছরে বেশ কিছু জাপানি ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে উঠলেও এখনো খুব বেশি সফলতা আসেনি| একই অবস্থা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও কোরিয়ায়|
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজার আবার সচল করতে সরকার কাজ করছে| দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত সময়ের মধ্যে খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| মন্ত্রী বলেন, শ্রমবাজারে শুধু মালয়েশিয়া কেন, আমরা সব দিকে আলোচনা করেছি| যারা ফিরে এসেছেন, তাদের ভিসা এক্সটেনশনের জন্য আলোচনা করছি| ভিসাসংক্রান্ত সমস্যা হলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা করে কূটনৈতিকভাবে আমরা ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর কাজ করছি| প্রতিদিনই আমরা বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি|
মালয়েশিয়া সফর ও আলোচনার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, জয়েন্ট ভেঞ্চার স্বাক্ষর করেছি, সেটি আমাদের ফেবারে আছে| অনুষ্ঠিত বৈঠক অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে| বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ব্রাদার হিসেবে সম্বোধন করেছেন|
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মো. শহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, শ্রমবাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিগত কয়েক মাসে আমরা প্রায় ১৭ দেশে এমওইউ পাঠিয়েছি| বিশেষ করে সার্বিয়া, রোমানিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া, মাল্টা, পর্তুগাল, স্পেন, মরিশাস, লেবানন, থাইল্যান্ড, ওমান, অস্ট্রিয়া, আলবেনিয়া, কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছে| থাইল্যান্ডের বিষয়ে তিনি বলেন, এমওইউ আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং নিয়ে এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়েছে| এখন থাইল্যান্ড সিদ্ধান্ত নেবে| তারা সই করলে, কর্মী পাঠানোর বিষয়ে অফিসিয়ালি ডিমান্ড চাওয়া হবে| এখন পর্যন্ত তাদের উত্তর পাওয়া যায়নি| আমরা এমওইউ এবং অ্যাগ্রিমেন্ট দুটোই পাঠিয়েছি| যুগ্ম সচিব বলেন, সব দেশ থেকেই আমরা পজিটিভ রেসপন্স আশা করছি| আমাদের সরকারও যোগাযোগ করছে| অনেক দেশের সঙ্গে এমওইউ আছে, ডিমান্ড লেটার পাওয়া যাচ্ছে না|
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, আমরা যদি দক্ষ কর্মী পাঠাতে পারি, তাহলে কিন্তু কম লোক দিয়েও রেমিট্যান্স বাড়বে| আমাদের যদি দক্ষ লোক থাকে, তাদের আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন থাকে, তাহলে যাদের কর্মী দরকার তারাই খুঁজে নেবে| বিএমইটির যেসব প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে সেগুলোর আধুনিকায়ন করে ভাষা শিক্ষায় জোর দিতে হবে|





