পরিবহনখাতে নৈরাজ্যের শঙ্কা
প্রকাশিত হয়েছে : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১২:৪১ অপরাহ্ন
বাস ভাড়া ৬৪ শতাংশ বাড়ানোর দাবি

জালালাবাদ রিপোর্ট : হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার| যদিও জ্বালানির দাম বাড়বে না বলে বার বার সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছিল| তবে শেষ পর্যন্ত শনিবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়|
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে দেশের পরিবহন খাতে চরম ˆনরাজ্যের শঙ্কায় যাত্রী সাধারণ| রোববার সকাল থেকেই রাস্তাঘাটে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে| পরিবহন মালিকরা সরাসরি কিছু না বললেও বাড়তি টাকায় তেল কিনে আগের ভাড়ায় গাড়ি চালাতে চান না তারা| বাস মালিকদের পক্ষ থেকে বাস ভাড়া ৬৪ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়েছে| এমন পরিস্থিতিতে গণপরিবহনের ভাড়া ‘সমš^য়ের’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার|
খোজঁ নিয়ে জানা গেছে, ২০২২ সালে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বাড়ার বিপরীতে ভাড়া বেড়েছিল ২২ দশমকি ২২ শতাংশ| কিন্তু এবার ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে মাত্র ১৫ টাকা বাড়লেও ভাড়া বাড়ানোর দাবি করা হচ্ছে ৬৪ শতাংশ|
মালিক সমিতির দেওয়া একটি খসড়া প্রস্তাবের ভিত্তিতে রোববার সন্ধ্যায় ভাড়া নির্ধারণ কমিটির একটি ˆবঠক অনুষ্ঠিত হয়| বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) আয়োজিত ˆবঠকে স্টেকহোল্ডারদের পাঠানো হয় উপস্থিত থাকার নোটিশ| শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ভাড়া সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি| তবে আজকের মধ্যে ভাড়া চুড়ান্ত হবে বলে ˆবঠক সূত্রে জানা গেছে|
বিআরটিএ’র এক কর্মকর্তা ও মালিক সমিতির এক নেতা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন, বাস ভাড়া বেড়ে কত হতে পারে তার একটি খসড়া প্রস্তাব ˆতরি করা হয়েছে পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে| সে প্রস্তাব অনুযায়ী, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ মহানগরীগুলোতে বাস ভাড়া ৬৪ শতাংশ বাড়ানোর আলাপ তোলা হবে| আর দূরপাল্লার বাসে ৩৭ শতাংশ ভাড়া বাড়াতে চান মালিকরা|
বিআরটিএর তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে মহানগরীতে বাসে প্রতি কিলোমিটারের জন্য যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে ২ টাকা ৪২ পয়সা| আর দূরপাল্লায় যাত্রীরা দিচ্ছেন ২ টাকা ৪৫ পয়সা করে| মালিক সমিতির প্রস্তাব অনুযায়ী ভাড়া বাড়লে মহানগরীতে প্রতি কিলোমিটারে বাস ভাড়া হবে ৩ টাকা ৯৬ পয়সা এবং দূরপাল্লায় হবে ৩ টাকা ৩৬ পয়সা|
দেশে সর্বশেষ বড় পরিসরে ভাড়া বেড়েছিল ২০২২ সালের ৬ আগস্ট| তার আগে মহানগরে বাসের ভাড়া ছিল কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ১৫ পয়সা| বাড়িয়ে করা হয় ২ টাকা ৫০ পয়সা| অর্থাৎ সে সময় কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া বাড়ে ৩৫ পয়সা| আর দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ১ টাকা ৮০ পয়সা থেকে করা হয় ২ টাকা ২০ পয়সা| তখন বেড়েছিল মহানগরে মিনিবাসের ভাড়াও| কিলোমিটারপ্রতি ৩৫ পয়সা বেড়ে ২ টাকা ৫ পয়সার জায়গায় করা হয় ২ টাকা ৪০ পয়সা| তবে মহানগরে বাস ও মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া থাকে আগেরটাই| ওই সময়ও ডিজেল লিটারপ্রতি বাড়ে ৩৪ টাকা, অকটেন ৪৬ টাকা ও পেট্রলের দাম বাড়ে লিটারে ৪৪ টাকা| দাম বাড়ার পরে ডিজেল ১১৪ টাকা, অকটেন ১৩৫ টাকা এবং পেট্রলের দাম হয় ১৩০ টাকা হয়| এরপর কয়েক দফায় জ্বালানির দাম কমে| কিন্তু কমেনি সেই হারে কমেনি বাস ভাড়া| তবুও তখনকার মতো এবার তেলের দাম এত বাড়েনি|
এবার ডিজেল ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা হয়েছে| অকটেন ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০ টাকা| আর পেট্রল ১১৬ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে লিটারপ্রতি|
দুইবারের মূল্য বৃদ্ধির পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২২ সালের জ্বলানির দামের তুলনায় এবার বৃদ্ধির পর তফাৎ খুব বেশি নেই| যদিও ভাড়া বাড়ানোর আবদারে ব্যাপক তফাৎ রয়েছে| তখন সর্ব্বোচ ভাড়া বেড়েছিল ২২ দশমিক ২২ শতাংশ| আর এবার ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর আলোচনা উঠছে|
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. জোবায়ের মাসুদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এই সময়ের মধ্যে বেড়েছে সবকিছুর খরচ| বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রাংশের দাম| শুধু তেলের দাম দেখেই তো হবে না| আছে আরও অনেক খরচ|’
জোবায়ের মাসুদের ভাষ্য, ‘তখন ৮২ টাকায় ১ ডলার পাওয়া যেত| এখন তা ১৩০ টাকা| আমাদের সবকিছু আমদানিনির্ভর| শুধু ডলারের কারণেই খরচ বেড়ে গেল ৫০ শতাংশ|’
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বাসের ভাড়া বাড়ানোর জন্যও দেওয়া হয় চিঠি| যদিও তখন অন্তর্বর্তীকালিন সরকার তাতে সায় দেয়নি|
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, যৌক্তিক হারে ভাড়া না বাড়ালে কঠিন হয়ে যাবে গাড়ি চালানো| সবকিছুর দাম বাড়ছে, বাস ভাড়া কেন বাড়বে না| আর যদি বাসের ভাড়া বাড়ানো না হয়, তাহলে যন্ত্রাংশের দাম কমাতে বলব|
সাধারণত বাসের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে জ্বালানির মূল্য, গাড়ির দাম, যদি ব্যাংকঋণ থাকে, তাহলে সুদের হার, যন্ত্রাংশের মূল্য এবং গাড়ির মানসহ বিবেচনা করা হয় ২২টি বিষয়| একইসঙ্গে বাসের অন্তত ৩০ শতাংশ আসন ধরা হয় খালি থাকবে; যেন সব আসনে যাত্রী না থাকলেও মালিকের লোকসান না হয়|
মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সর্বশেষ ভাড়া বাড়ানোর সময় শুধু জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল| অন্যান্য খাত গুরুত্ব পায়নি| এখন যন্ত্রাংশের দাম বাড়ছে|
যাত্রীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলছেন, ভাড়া কয়েক পয়সা কমলে এই সুফল যাত্রীরা পায় না| কিন্তু বাড়লে ঠিকই তা কার্যকর হয়| আর ভাড়া যেহেতু ৩ পয়সা, ৫ পয়সা করে কমেছিল এখন ১৫ পয়সা বাড়া উচিত| এর বেশি না| উল্টো দিকে মালিকরা যে তাদের নানা খরচের কথা বলে, তাহলে আমরা যাত্রীরাও তো বলতে পারে সেবার মানের কথা| ভাঙা বাসে উন্নত সেবার মানের ভাড়া দেওয়ার প্রশ্নই উঠে না|’




